ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও বিশেষ এক্সিটসহ নানা ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। আবারও দেশের ব্যাংক খাতের শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন আর্থিক খাতের নাজুক চিত্র সামনে এসেছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ঋণ পুনঃতফসিল বা নানা ধরনের ছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণের প্রকৃত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার, ঋণ আদায়ে কঠোরতা এবং ঋণ বিতরণে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি ঋণ। তার মানে ১০০ টাকার ঋণে খেলাপি ৩৩ টাকা ৭৮ পয়সা। এর সিংহভাগই আদায় অযোগ্য।
এর আগে চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে উঠেছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের এই লাগামহীন বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে। সব ব্যাংকের প্রকৃত তথ্য সামনে এলে এই অংক আরও বাড়বে। তাই বিশেষ ছাড় না দিয়ে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল না করে দ্রুত আদায়যোগ্য ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
খেলাপি ঋণ কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সমস্যাগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণই অন্যতম বড় সমস্যা। এটি কমাতে না পারলে ব্যাংকিং খাতকে টেকসইভাবে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন।
তিনি বলেন, বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং বিশেষ এক্সিট পলিসির আওতায় ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সম্ভাবনাময় কিন্তু সমস্যাগ্রস্ত ঋণগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে এনে আদায়যোগ্য করা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।
আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ কমানো শুধু ব্যাংকগুলোর জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিভিন্ন নীতিগত সুবিধা দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে অতীতের অনিয়ম ও ঋণের প্রকৃত মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবর্তনকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে ব্যাংক খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৭ কোটি টাকা; যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে অনিয়মের মাধ্যমে নাম-বেনামে বিতরণ করা অনেক ঋণ এখন নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ঋণ খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কারণেও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। যেসব ঋণ বারবার নবায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোও আদায় হচ্ছে না। অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণ চিহ্নিত হওয়ার ফলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্রও সামনে আসছে।
এসআই/এমএসএ
