বিজ্ঞাপন

৮ ব্যাংকের কৃষি ঋণে ভয়াবহ চিত্র : কোনোটির খেলাপি ৯৪ শতাংশ ছাড়াল

৮ ব্যাংকের কৃষি ঋণে ভয়াবহ চিত্র : কোনোটির খেলাপি ৯৪ শতাংশ ছাড়াল

কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়লেও তা আদায়ে বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত। বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকে কৃষি খাতে বকেয়া ঋণের বড় একটি অংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। কোনো ব্যাংকে মোট বকেয়া ঋণের ৯৪ শতাংশের বেশি খেলাপি, আবার কোনোটিতে এই হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে মোট কৃষি ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশই এখন খেলাপির খাতায়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে ব্যাংকিং খাতে কৃষি ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট কৃষি ঋণের ২৯ দশমিক ২২ শতাংশই খেলাপি।

আট ব্যাংকের কৃষি ঋণের খেলাপির চিত্র 

কৃষি ঋণে খেলাপির দিক থেকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো- ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক সংকটের প্রভাব কৃষি ঋণেও পড়েছে।

এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের কৃষি খাতে ১১০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বকেয়া ঋণের মধ্যে ১০৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা খেলাপি। অর্থাৎ ব্যাংকটির কৃষি ঋণের বকেয়া অর্থের ৯৪ দশমিক ৬৮ শতাংশই এখন খেলাপি।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের কৃষি খাতে বকেয়া ঋণ ২০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬০ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট বকেয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কৃষি খাতে ১৭৪ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮ কোটি টাকা খেলাপি। অর্থাৎ খেলাপির হার ৫৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের কৃষি খাতে ৭৮ কোটি টাকা বকেয়া ঋণের মধ্যে ৩৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা খেলাপি। ব্যাংকটির খেলাপির হার প্রায় ৪৯ শতাংশ।

dhakapost

এক্সিম ব্যাংকের কৃষি খাতে বকেয়া ঋণ ৪৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৮০ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৩৭ শতাংশ।

পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের বাইরে অন্য তিন ব্যাংকের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের কৃষি খাতে ৩৫৪ কোটি টাকা বকেয়া ঋণের মধ্যে ২২৬ কোটি টাকা খেলাপি। অর্থাৎ মোট বকেয়ার প্রায় ৬৪ শতাংশ খেলাপি।

টাকার অংকে কৃষি খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে। এই ব্যাংকটির কৃষি খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১১ হাজার ২২৩ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট বকেয়ার প্রায় ৫০ দশমিক ৭২ শতাংশ। 

আর রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কৃষি খাতে ৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা বকেয়া ঋণের মধ্যে ৯০৯ কোটি টাকা খেলাপি। ব্যাংকটির খেলাপির হার ২৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

কৃষি ঋণের এই অবস্থার সঙ্গে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক সংকটও জড়িত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সংকটাপন্ন পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক'’ গঠন করে এবং মালিকানা সরকারের হাতে নেয়। এসব ব্যাংকের সিংহভাগ ঋণই বিগত সরকারের সময় লুটপাট হয়।

কৃষি খাতের খেলাপি ঋণ বাড়ার বিষয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবেদুর রহমান সিকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, শুধু কৃষি নয়, সব ধরনের খেলাপি ঋণ আদায়েই চেষ্টা চলছে। এরইমধ্যে আমরা ১০ হাজারের বেশি মামলা দায়ের করেছি। আশা করছি এর সুফল আসবে।

dhakapost

কৃষকের সংকট, নাকি বিতরণে অনিয়ম? 

কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে কৃষকের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি ঋণ বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়মকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ’-এর নির্বাহী পরিচালক ও মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, সার, কীটনাশক ও ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যোগ হয়ে সাধারণ কৃষকদের সংকটে ফেলেছে। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকে কিস্তি শোধ করতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।

তবে কৃষি ঋণের টাকা প্রকৃত কৃষকের কাছে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ড. মিজানুর রহমান বলেন, কৃষকের নাম ভাঙিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে একটি সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী কৃষি ঋণ হাতিয়ে নিচ্ছে। এই অনিয়ম ঋণ ফেরত না দেওয়ার একটি অপসংস্কৃতি তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বড় খেলাপিদের সুবিধা না দিয়ে আমানতকারীদের স্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

এদিকে কৃষি ঋণের খেলাপি কেন বাড়ছে, তা জানতে মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, কোন অঞ্চলে আদায় কম এবং সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে কি না-তা যাচাই করতে হবে। তখনই বোঝা যাবে সমস্যাটি কৃষকের নাকি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। 

কৃষি ঋণ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে এ মুখপাত্র বলেন, ছোট অঙ্কের ঋণ হওয়ায় এগুলো অন্য খাতে নেওয়া বা বিদেশে পাচারের সুযোগ কম। তবে কিছু অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা রয়েছে, যা তদারকির মাধ্যমে নিয়মে আনা হবে।

অন্যদিকে খেলাপি কমানোর পরিকল্পনার কথা জানান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭ লাখ হিসাবের প্রায় ৬২৫ কোটি টাকার ঋণ মওকুফ করা হয়েছে, যা সরকার পরিশোধ করছে। এটি সমন্বয় হলে খেলাপি ঋণ কমে যাবে। এছাড়া ওয়ান-টাইম এক্সিট সুবিধার আওতায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন টাকা জমা নিয়ে বাকিটা মাফ করা হচ্ছে। 

কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরও জানান, পুরোনো ঋণ মওকুফ ও পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণ এরইমধ্যে ৩৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে তা ২০ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে খেলাপি বাড়লেও কৃষকদের নতুন ঋণ বিতরণ বন্ধ করা হয়নি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি ব্যাংকই দিয়েছে ৬০.৭৭ শতাংশ ঋণ। ঋণ বিতরণে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। তাদের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ৮১ কোটি টাকা।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা আরও ৫৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিতরণ বাড়ানোর পাশাপাশি আদায় তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে ব্যাংকিং খাতের এ সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

এসআই/জেডএস