১৯৯৪ সালে প্রণীত কোম্পানি আইন যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংশোধন ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম ও পদ্ধতি সহজ করতে বিশ্বের যেসব দেশে আইন ও বিধিবিধান ভালোভাবে কার্যকর হচ্ছে, সেসব দেশের উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৪ সালের পর কোম্পানি আইনে মাত্র দুটি ছোটখাটো সংস্কার হয়েছে। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনটিকে যুগোপযোগী করতে হবে। এ জন্য নতুন করে আদর্শ নির্ধারণে খুব বেশি কষ্ট করার প্রয়োজন নেই। সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অনেক দেশ আছে, যেখানে ব্যবস্থা ভালোভাবে কাজ করছে। সেসব দেশের উদাহরণ আমরা নিতে পারি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর এফবিসিসিআই বোর্ড রুমে আয়োজিত কোম্পানি আইন-১৯৯৪-এর খসড়া সংশোধনী সম্পর্কিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এ সভার আয়োজন করে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিনিধি এবং অডিট ফার্মের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম ও পদ্ধতি সহজ করার জন্য বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা নেওয়া হয়েছে। কোম্পানি আইন সংশোধনের ক্ষেত্রেও অন্যান্য দেশে সংশ্লিষ্ট আইন কীভাবে কাজ করছে, তা পর্যালোচনা করে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
খসড়া সংশোধনী নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীরা ৩০ দিন সময় চেয়েছেন উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজন হলে ৩০ দিন সময় নেওয়া যেতে পারে। এমনকি আরও সময় প্রয়োজন হলে ৬০ দিনও নেওয়া যেতে পারে। তবে ভালো প্রস্তাব নিয়ে আসাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আপনারা যদি বলেন ৬০ দিন সময় লাগবে, তাহলে ৬০ দিন নেন। এর আগে আমি করে কী করব? আপনারা প্রস্তুত না থাকলে যখন প্রস্তুত হবেন, তখন জানাবেন। প্রস্তুত হয়ে জানালে আমরা দ্রুত এগিয়ে যাব।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্যান্য দেশে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কীভাবে কার্যকর হচ্ছে, তা তুলনা করে দেখতে হবে। এরপর ব্যবসায়ীদের পরামর্শের ভিত্তিতেই এমন একটি কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করা হবে, যা ব্যবসার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে আগামী তিন বছরে বাস্তবায়নের জন্য সরকার বেশ কিছু প্যারামিটার নির্ধারণ করেছে। এসব কাজের চ্যালেঞ্জ এবং কতটা বিস্তৃতভাবে কাজ করতে হবে, সে বিষয়েও সরকারকে এগোতে হচ্ছে। কোম্পানি আইন সংশোধন সেই বিপুলসংখ্যক কাজের মধ্যে একটি মাত্র উপাদান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এটা কয়েকশ উপাদানের মধ্যে একটি এলিমেন্ট। কোম্পানি আইন সংশোধন তার মধ্যে মাত্র একটি। তাই ৩০ দিন সময় নিলে নিন। তবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ভালো প্রস্তাব নিয়ে আসুন।
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা দরকার।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বড় ধরনের রাজস্ব উদ্বৃত্ত কিংবা বাজেট বরাদ্দের মতো পর্যাপ্ত সম্পদ পায়নি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাও প্রতিদিন নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এটা আমাদের সবার জন্য একটা ট্রানজিশন টাইম। মাথা ঠান্ডা রেখে ভালো পরিকল্পনা নিয়ে এই সময়টা পার হতে হবে। বাস্তবভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করতে হবে।
বিভিন্ন সংস্কারের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হবে জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে যেসব পরিবর্তন আনা হবে, সেগুলোর প্রতিটিতেই ব্যবসায়ী মহলের পরামর্শ প্রয়োজন হবে। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়েই এসব পরিবর্তন আনতে চায়।
সভায় এফবিসিসিআইয়ের পক্ষে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন ব্যারিস্টার নিহাদ কবির। তিনি তার প্রস্তাবের মধ্যে যেসব কোম্পানির বার্ষিক আয় ৫০ কোটি টাকার বেশি সেগুলোতে কোম্পানি সচিব নিয়োগের প্রস্তাব রাখেন। আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট ও কোম্পানি সচিবের মতো সেবা পেশায় কর্মজীবীদের কোম্পানির হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ না রাখার পক্ষে মত দেন।
তিনি কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করার ক্ষেত্রে তারিখ ঘোষণার মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের জানানোর ন্যূনতম ২১ দিন পর এজিএম করার বিধান যুক্ত করার পক্ষে মত দেন। আর লিস্টেট কোম্পানি ছাড়া অন্যান্য পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে স্বাধীনতা রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়।
পরে সভায় উপস্থিত একজন ব্যবসায়ী এজিএমের তারিখ ঘোষণার ন্যূনতম ২১ দিন পর এজিএম করার বিষয়টি কমিয়ে ১৪ দিনে নিয়ে আসার পক্ষে মত দেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ১৪ দিনের এই প্রস্তাবে সম্মতি জানান।
এমএমএইচ/জেডএস
