আগস্টে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সামান্য সংকোচন হয়েছে। এ মাসে বাংলাদেশের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) ৭ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৪৯ দশমিক ৯-এ নেমেছে। জুলাইয়ে এ সূচক ছিল ৫৭ দশমিক ৮। পিএমআই ৫০-এর নিচে থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংকোচন এবং ৫০-এর ওপরে থাকলে সম্প্রসারণ বোঝায়।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), ঢাকা এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে বাংলাদেশের আগস্ট মাসের পিএমআই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তায় এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের (এসআইপিএমএম) কারিগরি সহায়তায় এমসিসিআই ও পিইবি এ সূচকটি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টে উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মকাণ্ড কমেছে। তবে কৃষি খাতের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে এবং নির্মাণ খাতও আবার সম্প্রসারণে ফিরেছে।
কৃষি খাতে টানা ১২ মাসের মতো সম্প্রসারণ হয়েছে। আগস্টে এ খাতের পিএমআই ১ দশমিক ৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫৬ দশমিক ৫-এ উঠেছে। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে ছিল। কর্মসংস্থানও বেড়েছে। কৃষি খাতে উপকরণের ব্যয় বাড়লেও আগের তুলনায় বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। তবে বকেয়া ক্রয়াদেশ এখনো সংকোচনে রয়েছে।
অন্যদিকে উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের পিএমআই ১৮ পয়েন্ট কমে ৪৭ দশমিক ৪-এ নেমেছে। নতুন ক্রয়াদেশ, নতুন রপ্তানি ক্রয়াদেশ, উৎপাদন, কাঁচামাল কেনার মজুত, আমদানি ও কর্মসংস্থান-সবগুলো সূচকই সংকোচনে ফিরেছে। এ খাতে উপকরণের দাম বাড়ার গতি আরও বেড়েছে। বকেয়া ক্রয়াদেশ সংকোচনে থাকলেও এর গতি কিছুটা কমেছে। সরবরাহকারীদের পণ্য সরবরাহের সময় অপরিবর্তিত ছিল।
নির্মাণ খাত আবার সম্প্রসারণে ফিরেছে। আগস্টে এ খাতের পিএমআই ৫২ দশমিক ৪-এ উঠেছে। নির্মাণ কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে ফিরলেও নতুন ব্যবসায় সংকোচনের গতি কিছুটা কমেছে। এ খাতে উপকরণের ব্যয় বাড়ার গতি বেড়েছে। অন্যদিকে বকেয়া ক্রয়াদেশ সংকোচনে চলে গেছে।
সেবা খাতেও আগস্টে সংকোচন হয়েছে। ২২ মাস পর প্রথমবারের মতো এ খাতের পিএমআই ৫০-এর নিচে নেমে ৪৯ দশমিক ২ হয়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় কমেছে ৬ দশমিক ৮ পয়েন্ট। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে থাকলেও বৃদ্ধির গতি কমেছে। কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উপকরণের ব্যয় বাড়লেও বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। বকেয়া ক্রয়াদেশের সংকোচনের গতিও কমেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সতর্ক আশাবাদ ছিল। অনেকেই বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতিকে সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং আগামী মাসগুলোতে আরও উন্নতির আশা প্রকাশ করেছেন। তবে ব্যবসার ব্যয় কমানো, আর্থিক সহায়তা বাড়ানো এবং আরও সহায়ক নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তাঁরা।
উৎপাদন খাতের ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি এবং তৈরি পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় ব্যবসা ধীর হয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা। জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর ওপরও তারা গুরুত্ব দিয়েছেন।
সেবা খাতের অংশগ্রহণকারীরা আরও আর্থিক সহায়তা, বিদ্যুৎ বিল ও পরিচালন ব্যয় কমানো এবং আয়করসহ অন্যান্য কর কমানোর দাবি জানিয়েছেন। কৃষি খাতের অংশগ্রহণকারীরা কৃষি উপকরণ, বিশেষ করে কীটনাশকের দাম কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ ব্যবসা পরিস্থিতি নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সতর্ক আশাবাদ থাকলেও সব খাতেই ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকে আশাবাদের মাত্রা কিছুটা কমেছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, আগস্টের পিএমআই ৪৯ দশমিক ৯ হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামগ্রিকভাবে নিরপেক্ষ সীমার কাছাকাছি ছিল। উৎপাদন ও সেবা খাতে সাময়িক চাপ থাকলেও কৃষি খাতের সম্প্রসারণ এবং নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, উৎপাদন খাতে মন্দার একটি কারণ ছিল মাসিক রপ্তানি কমে যাওয়া এবং এলএনজি অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত সাময়িক জ্বালানি সংকট। সামনে জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি, রপ্তানি চাহিদা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক পদক্ষেপ অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে পারে।
এমএমএইচ/বিআরইউ
