সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা ফেরত নেওয়ার আবেদন করলেও তা তুলতে আসছেন না অনেক গ্রাহক।
আবেদনকারীদের তুলনায় প্রতিদিনই কম সংখ্যক গ্রাহক টাকা উত্তোলন করছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকে নতুন করে অর্থের প্রবাহ এবং স্বাভাবিক লেনদেনও অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে ব্যাংকটি।
ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে ২৭ হাজার ৫৬ জন গ্রাহক মোট ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর ৮ হাজার ১২৫ জন গ্রাহক ৩১৯ কোটি টাকা, ৮ সেপ্টেম্বর ৮ হাজার ২৩৪ জন ৩৪০ কোটি টাকা এবং ৯ সেপ্টেম্বর ১০ হাজার ৬৯৭ জন গ্রাহক ৩৮১ কোটি টাকা উত্তোলন করেন।
এর আগে ১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তি আমানতকারীদের কাছ থেকে টাকা ফেরতের আবেদন নেওয়া হয়। মোট ৭৪ হাজার ২২১টি আবেদনের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের চাহিদা আসে। তবে আবেদন অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে সবাই টাকা উত্তোলন করছেন না।
ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ১ সেপ্টেম্বর ১৮ হাজার ৪৬ জন গ্রাহক ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। এসব গ্রাহকের মধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর ৮ হাজার ১২৫ জন ৩১৯ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। অর্থাৎ, প্রথম দিনের আবেদনকারীদের অর্ধেকেরও কম গ্রাহক নির্ধারিত দিনে টাকা তুলেছেন।
একইভাবে, ২ সেপ্টেম্বর ১৯ হাজার ৬১৩ জন গ্রাহক ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। এর বিপরীতে ৮ সেপ্টেম্বর ৮ হাজার ২৩৪ জন গ্রাহক ৩৪০ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রেও অর্ধেকের কম আবেদনকারী টাকা তুলেছেন।
এদিকে ৩ সেপ্টেম্বর ২১ হাজার ৮৬ জন গ্রাহক ৯৬৩ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন করেন। এর বিপরীতে গতকাল ৯ সেপ্টেম্বর ১০ হাজার ৬৯৭ জন গ্রাহক ৩৮১ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন।
আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ নির্ধারিত দিনে টাকা তুলতে না আসা বা আবেদন প্রত্যাহারের বিষয়টিকে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা বাড়ার ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকে অর্থের প্রবাহও অব্যাহত রয়েছে। ব্যক্তিগত হিসাবগুলোতে স্বাভাবিকভাবে লেনদেন কার্যক্রম চলছে এবং ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে অর্থও আসছে। ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর ক্যাশে ৯৩ কোটি এবং আরটিজিএস, বিফটিএন ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ৫১ কোটি টাকা এসেছে। সব মিলিয়ে ওই দিন ব্যাংকে ১৪১ কোটি টাকা জমা হয়েছে। এদিন মোট ১৬ হাজার ৬০০টি লেনদেন হয়েছে।
পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর ক্যাশে ৯০ কোটি এবং বিফটিএন, আরটিজিএস ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আরও ১০৫ কোটি টাকা এসেছে। অর্থাৎ, ওই দিন ব্যাংকে মোট ১৯৫ কোটি টাকা এসেছে। এদিন লেনদেন হয়েছে ১৬ হাজার ৫০টি।
এদিকে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে অনলাইনে টাকা স্থানান্তরের সুবিধাও চালু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ফলে গ্রাহকদের টাকা ফেরতের পাশাপাশি ব্যাংকে অর্থের প্রবাহ ও স্বাভাবিক লেনদেনও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
৫ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা
ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল আমানতের টাকা ফেরত দিতে তারল্য সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সোমবার সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা এবং মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। তবে মেয়াদি আমানতের পুরো মূল টাকা এককালীন তুলে নিলে সেটিকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হবে। সে ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, যারা এখনই টাকা তুলবেন না এবং আমানত চালু রাখবেন, তারা চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হারে মুনাফা পাবেন। ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে পরবর্তীতে মুনাফাসহ অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।
চরম অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির কারণে সংকটে পড়া এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানত ছিল। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবেই রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
এসআই/এমএন
