নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সংস্কার, প্রক্রিয়া সহজ করার নানা উদ্যোগ ও কমিশনের নেতৃত্বে দুই দফা পরিবর্তন হলেও কাটছে না দেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) দীর্ঘস্থায়ী খরা।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৫ মার্চ শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন বিএসইসি টেকনো ড্রাগসকে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়ার পর পেরিয়ে গেছে দুই বছরেরও বেশি সময়। এরপর আর কোনো নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি।
এই দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা মূলত বিগত তিন কমিশনের ভিন্নধর্মী নীতি ও কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের মেয়াদের শুরুর দিকে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির গতি ভালো থাকলেও শেষের দিকে তা কমে আসে। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দায়িত্ব নেওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কমিশন নতুন আইপিও অনুমোদনের চেয়ে নিয়ন্ত্রক কাঠামো সংস্কার, পুরোনো আবেদন পুনরায় যাচাই এবং কোম্পানির আর্থিক ও করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করায় জোর দেয়। তার মেয়াদেও কোনো নতুন আইপিও অনুমোদিত হয়নি। এরপর ২০২৬ সালের ৪ জুন বিএসইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়া মাসুদ খান জটিল আইপিও প্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারে আনার উদ্যোগ নেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেনি।
আরও পড়ুন
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত উদ্যোক্তাদের মূল্যায়নভীতি, শেয়ারের উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রক বিধিমালার ঘন ঘন পরিবর্তন এবং তালিকাভুক্তি-পরবর্তী কঠোর পরিপালনসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার কারণে ব্যবসায়ীরা আইপিও আবেদন জমা দিতে দ্বিধা করছেন।
শিবলী কমিশনে আইপিওর গতি
অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ২০২০ সালের ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় করোনা মহামারির অভিঘাতে পুঁজিবাজারে অনিশ্চয়তা ছিল। এর মধ্যেও তার সময়ে বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির গতি বাড়ে।
২০২০-২১ অর্থবছরে ওয়ালটন, রবি, মীর আখতার, তৌফিকা ফুডস, ই-জেনারেশন, লুব-রেফ, এনআরবিসি ব্যাংক ও ডমিনেজ স্টিলসহ মোট ১৬টি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসে। এসব কোম্পানি মিলে প্রায় ১ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা সংগ্রহ করে।
২০২১-২২ অর্থবছরেও বিএসইসি আটটি কোম্পানিকে আইপিওর অনুমোদন দেয়। ওই অর্থবছরে আইপিওর মাধ্যমে প্রায় ৬৭৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ আসে। এসব কোম্পানির মধ্যে ছিল জেএমআই হাসপাতাল, বারাকা পাতেঙ্গা পাওয়ার, এসবিএসি ব্যাংক, সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স, একমি পেস্টিসাইডস ও নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস।

বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কমিশন মোট ১৪১টি কোম্পানিকে আইপিওর অনুমোদন দেয়। এর বড় একটি অংশ অনুমোদিত হয় অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সময়ে।
তবে তার মেয়াদের শেষ দিকে প্রাথমিক বাজারে ধীরগতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে নয়টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও নয়টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে। আগের সময়ের তুলনায় তখন নতুন কোম্পানি আসার গতি এবং অর্থসংগ্রহের পরিমাণ কমে যায়।
এরপর ২০২৪ সালের মার্চে টেকনো ড্রাগসের আইপিও অনুমোদন দেয় শিবলী কমিশন। আগস্টে তিনি পদত্যাগ করলে তার কমিশনও বিলুপ্ত হয়। ফলে তার সময়ে আইপিওর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও মেয়াদের শেষ দিকে প্রাথমিক বাজারে গতি কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাকসুদ কমিশনে ‘আইপিও শূন্য’
২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। তার সময়ে আইপিও বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। তৎকালীন কমিশন আগের অনেক আবেদন নতুন করে যাচাই শুরু করে। বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক হিসাব, জমি, সম্পদ, লাভ-লোকসান এবং করপোরেট সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এসব বিষয় যাচাইয়ের পর অনেক কোম্পানির আইপিও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তার কমিশন।
একই সময়ে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামো সংস্কারে জোর দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে মার্জিন ঋণ, মিউচুয়াল ফান্ড এবং পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ—এই তিন গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা সংস্কার করে তার কমিশন।
তবে নিয়ম সংস্কার হলেও এর বাস্তব ফল হিসেবে নতুন কোম্পানির আইপিও আবেদন আসেনি। দীর্ঘ সময় ধরে সংস্কার ও আবেদন যাচাই চলায় তার কমিশনের মেয়াদকালে নতুন করে কোনো কোম্পানি আইপিও অনুমোদন পায়নি। এমনকি নতুন করে কোনো কোম্পানি আইপিও অনুমোদনের জন্য আবেদনও জমা দেয়নি। ফলে চলতি বছরের ৪ জুন দায়িত্ব ছাড়ার দিন পর্যন্ত খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কমিশনে নতুন আইপিও অনুমোদনের সংখ্যা শূন্যই থেকে যায়।
মাসুদ খানের নতুন কৌশল
খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের দিনেই ২০২৬ সালের ৪ জুন চার বছরের জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট মাসুদ খান। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রাথমিক বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি বড় দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আনার ওপর জোর দেন।

মাসুদ খান জানিয়েছেন, বর্তমান আইপিও প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। এ কারণে বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে বিকল্প ব্যবস্থা দরকার। গত জুলাইয়ে এক বক্তব্যে তিনি বড় স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারে আনার চেষ্টা করার কথা জানান। একইসঙ্গে আইপিওর নিয়ম সহজ করা এবং আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ দিয়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহারের সীমা পুনর্বিবেচনার কথাও বলেন।
ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে সরাসরি তালিকাভুক্তির নতুন কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করেছে তার কমিশন। প্রস্তাবিত ডাইরেক্ট লিস্টিং রুলস, ২০২৬-এ বড় কোম্পানিগুলোকে আইপিও ছাড়াই শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমান কমিশন শুধু আইপিও অনুমোদন বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করে বাজারে ভালো কোম্পানির সরবরাহ বাড়াতে একাধিক প্রবেশপথ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় তিন মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করেনি।
আগ্রহ আছে, আবেদন নেই
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত ও আর্থিকভাবে সক্ষম কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের জন্য পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী। তবে সেই আগ্রহ এখনো আনুষ্ঠানিক আবেদনে রূপ নেয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মার্চেন্ট ব্যাংকার জানিয়েছেন, তারা কয়েকটি সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে আইপিওর জন্য প্রস্তুত করছেন। তবে নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে আরও স্পষ্টতা আসার অপেক্ষায় অনেক কোম্পানি এখনই আবেদন জমা দিতে চাইছে না।
বাজারে সম্ভাব্য আইপিও প্রার্থী হিসেবে বিআরবি, ডিবিএল, সিটি ও কনফিডেন্সের মতো কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নামও আলোচনায় এসেছে। এতে পুঁজিবাজারে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কোম্পানির আগ্রহ আছে, মার্চেন্ট ব্যাংকাররাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন কিন্তু নিয়ন্ত্রকের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন পৌঁছাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আইপিও খরার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোম্পানির মূল্যায়ন।
উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, শেয়ারের যথাযথ মূল্য না পেলে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ার ছাড়ার কারণে কোম্পানিতে তাদের মালিকানার অংশ অতিরিক্ত কমে যেতে পারে।
নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তাও আরেকটি বড় কারণ। আইপিওর নিয়মকানুনে ঘন ঘন পরিবর্তন হওয়ায় সম্ভাব্য ইস্যুয়াররা আবেদন করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
এ ছাড়া তালিকাভুক্তির পর আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, করপোরেট সুশাসন এবং স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগসহ বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স বা পরিপালনসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতাও অনেক কোম্পানিকে নির উৎসাহিত করছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা আইপিওর অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আরও নমনীয়তা চান। বিশেষ করে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি সুদের ব্যাংকঋণ পরিশোধে আইপিওর অর্থ ব্যবহারের সুযোগ চান তারা।
সংকট এখন পাইপলাইনে
আইপিওর সমস্যা এখন শুধু অনুমোদনের নয়, নতুন কোম্পানির পাইপলাইন তৈরি না হওয়াই বড় সমস্যা। বিএসইসির কাছে বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় কোনো আইপিও আবেদন নেই। দেশে ৬৬টি লাইসেন্সধারী মার্চেন্ট ব্যাংক থাকলেও সম্ভাব্য ইস্যুয়ারদের অনেকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। নিয়ন্ত্রক কাঠামো আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
পুঁজিবাজার সংস্কারবিষয়ক টাস্কফোর্স আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়ন্ত্রক ফি কমানো, কমপ্লায়েন্সের বোঝা কমানো এবং ডিজিটাল ফাইলিং ব্যবস্থা চালুর মতো সুপারিশ করেছে। এখন বিএসইসি ও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য কাঠামো তৈরি করা, যাতে মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলো প্রাথমিক আগ্রহ থেকে বেরিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আইপিও আবেদনে এগিয়ে আসে।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, আইপিও কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো কোম্পানিকে আবেদন করতে নিষেধ করা হয়নি। কোনো ইস্যু ম্যানেজার বা কোম্পানি আনুষ্ঠানিক আবেদন না করলে আইপিও প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ভালো কোম্পানির জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির (ডাইরেক্ট লিস্টিং) বিধান হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি আইপিও প্রক্রিয়া সহজ করতে কাজ চলছে। শিগগিরই এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে অনেক কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, বর্তমান সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তাদের জায়গা থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। অচিরেই এর ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজেটে কর ছাড়সহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হলে সরকারি শেয়ার, বহুজাতিক কোম্পানি এবং বেসরকারি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে আসতে আগ্রহী হবে। আর ভালো মূল্য পেলে অনেক কোম্পানি আইপিওতে আসতেও আগ্রহী হবে।
এমএমএইচ/এমএসএ
