বিজ্ঞাপন

এবার বাজার পরিস্থিতি নিয়ে শীর্ষ ব্রোকারদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে ডিএসই

এবার বাজার পরিস্থিতি নিয়ে শীর্ষ ব্রোকারদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে ডিএসই

টানা দরপতন, বাড়তে থাকা বিক্রির চাপ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের মধ্যে এবার শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় ডিএসইর বোর্ড রুমে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

ডিএসইর একটি বিশ্বস্ত সূত্র ঢাকা পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা, দরপতনের কারণ চিহ্নিত করা এবং বাজারে স্বাভাবিকতা ফেরাতে করণীয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুতেও বড় দরপতনের পর ডিএসই ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) জরুরি বৈঠক করেছিল। কিন্তু এরপরও বাজারের অস্থিরতা কাটেনি। বরং গত সপ্তাহের ধারাবাহিক দরপতনের পর চলতি সপ্তাহের প্রথম দুই কার্যদিবসেও সূচকের পতন অব্যাহত রয়েছে। ফলে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৯৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৪১৮ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে নেমে আসে। এদিন লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৮৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৩৬টির শেয়ারের দাম কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ২৭টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ২১টির দর। বড় পতনের দিনেও লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৫৭১ কোটি ৩২ লাখ টাকা হয়।

আজও (সোমবার) সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসেও সেই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। দুপুর ২টা পর্যন্ত ডিএসইএক্স ৪০ পয়েন্টের বেশি কমেছে। অর্থাৎ মাত্র দুই কার্যদিবসেই প্রধান সূচকের পতন ১৩৬ পয়েন্টের বেশি দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বাজারে বিক্রির চাপও আরও বেড়েছে।

এর আগে গত ৬ থেকে ১০ সেপ্টেম্বরের সপ্তাহেও বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়। ওই সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই সূচক কমে। সপ্তাহ শেষে ডিএসইএক্স ১৪৭ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে নেমে যায়, যা ছিল প্রায় তিন মাসের মধ্যে সূচকটির সর্বনিম্ন অবস্থান।

ওই সপ্তাহে বাজারের পতন শুধু সূচকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ডিএসইতে মোট লেনদেন হয় ২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের ৩ হাজার ৪৪ কোটি টাকার চেয়ে কম। দৈনিক গড় লেনদেন প্রায় ৯ শতাংশ কমে ৫৫৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে ৩১০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের দর কমে, বিপরীতে বাড়ে মাত্র ৬০টির। প্রায় সব প্রধান খাতেই দরপতন দেখা যায়।

বাজারের সাম্প্রতিক দুর্বলতার পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফায় পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রি করে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অবস্থান নিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপও বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে। বিভিন্ন কোম্পানির লেনদেনের তথ্য চেয়ে ডিএসইর পক্ষ থেকে ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে চিঠি দেওয়া এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কারণে কিছু বড় বিনিয়োগকারী সতর্ক হয়ে শেয়ার বিক্রি করছেন, যা বাজারে বিক্রির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বাজারের প্রতি আস্থার ঘাটতি। চলতি বছরের শুরুতে বাজারে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির সামঞ্জস্য না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগের বদলে অনেকে হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে নগদ অর্থ ধরে রাখছেন।

জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও এখন বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে শিল্প উৎপাদন ও কোম্পানির পরিচালন ব্যয় নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়ছে।

বাজারের দুর্বল অবস্থার আরেকটি দিক হলো বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সংকোচন। গত সপ্তাহে দরপতনের পাশাপাশি লেনদেনও কমেছে। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কম দামে শেয়ার কেনার আগ্রহ কিছু বিনিয়োগকারীর থাকলেও সামগ্রিক অনিশ্চয়তা সেই ক্রয়চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বাজারে ক্রেতার তুলনায় বিক্রেতার চাপই বেশি থাকছে।

এ অবস্থায় আগামীকালের বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ডিএসই সরাসরি বাজারের ভেতরের পরিস্থিতি, বড় বিনিয়োগকারীদের আচরণ, বিক্রির চাপের কারণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে স্বাভাবিক লেনদেন ফিরিয়ে আনতে ব্রোকারদের করণীয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর ডিএসই ও ডিবিএর জরুরি বৈঠকেও টানা দরপতন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট ও অস্বাভাবিক বিক্রির চাপ নিয়ে আলোচনা হয়। তখনও বাজারে স্বাভাবিকতা ফেরাতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। কিন্তু এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও বড় দরপতন হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, ওই বৈঠকের পরও বাজারের মৌলিক চাপগুলো পুরোপুরি কাটেনি।

এমএমএইচ/এসএম