ইলিশ ধরতে সাগরে নামা চট্টগ্রামের হাজার হাজার মাছধরা ট্রলারের বড় ব্যয় হচ্ছে জ্বালানিতে। একেকটি ট্রলার এক ট্রিপে গড়ে ২ হাজার লিটার ডিজেল ব্যবহার করলে ইলিশ মৌসুমে ১০টি ট্রিপে একটি ট্রলারের জ্বালানি খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার লিটার।
সেই হিসাবে চট্টগ্রামের নিবন্ধিত ৫ হাজার ৬৭৬টি মাছধরা ট্রলার ১০টি করে ট্রিপ দিলে মৌসুমে ডিজেলের প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ১১ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার লিটার।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে ৫ হাজার ৬৭৬টি মাছধরা ট্রলার এবং ৫৩ হাজারের বেশি জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার সমুদ্রগামী জেলে ইলিশ ধরার কাজে সাগরে রয়েছেন।
এর বাইরে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট, ফিরিঙ্গিবাজার, কাট্টলী ও পতেঙ্গাসহ কর্ণফুলী, আনোয়ারা, বাঁশখালী, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড উপজেলার সাগরপাড়ে ছোট-বড় প্রায় ১০ হাজার যান্ত্রিক ছোট বোট রয়েছে। এসব নৌযানও মাছ ধরার কাজে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি ছোট বোটে প্রায় ৫০ লিটার করে জ্বালানি ব্যবহার হয়। এসব ছোট বোট দৈনিক চারবার করে সাগরে যাওয়া-আসা করে।
সূত্র বলছে, চলতি ২০২৬ সালে ডিজেলের দাম এক দফা বেড়েছে। এপ্রিল মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। এরপর জুনে জ্বালানি তেলের আরেক দফা মূল্য সমন্বয় হলেও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত থাকে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বোট মালিক দিদারুল ইসলাম বলেন, আমার দুটি বোট রয়েছে। অন্যান্য বছরের মতো এবার ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে জ্বালানির দামও বেশি। প্রতিটি বোটে ৪০ লিটার করে জ্বালানি প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাগর উত্তাল থাকায় আবহাওয়া ইলিশ আহরণের উপযোগী নয়। ফলে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে মাছের দামেও এর প্রভাব পড়ছে।
গহিরা চিবাতলী ঘাটের গদির কারবারি ইমতিয়াজ শাকিল বলেন, মানুষের খরচ বেশি। জেলেদের কাছ থেকে মাছ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব বাজারেও পড়ছে।
গহিরা ঘাট এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট সাইজের ৪টি ইলিশে ১ কেজি ৮০০ টাকা, মাঝারি সাইজের ২টি ইলিশে ১ কেজি ১ হাজার ৪০০ টাকা, বড় সাইজের ১টি ইলিশের ওজন ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ১ হাজার ৮০০ টাকা, একদম বড় সাইজের ১টি ইলিশের ওজন ১ কেজি ৫০০ গ্রাম ২ হাজার ৩০০ টাকা দাম নেওয়া হচ্ছে।
গহিরা থেকে মাছ কিনতে আসা ইকবাল বাহার বলেন, তিনটি মিলে এক কেজি ওজনের ইলিশের পাইকারি দাম ৭০০ টাকা। বড় সাইজের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ টাকা। আমরা নগর থেকে তিনজন এসেছি। ছোট-বড় মিলিয়ে ছয় কেজি মাছ কিনেছি।

মৎস্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাগরে মাছ ধরার সময় জ্বালানি খরচ সরাসরি আহরণ ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। ট্রলারকে দীর্ঘ সময় সাগরে অবস্থান করতে হলে ডিজেলের চাহিদাও বাড়ে। ফলে জ্বালানির দাম ও সরবরাহের ওপর ইলিশ আহরণের ব্যয় অনেকটাই নির্ভরশীল।
জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকৃত আহরণে ওঠানামা রয়েছে।
জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্র বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণ হয়েছে ১৫ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন। এর আগের অর্থবছরের তুলনায় ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় ৫ হাজার ৮৮৪ মেট্রিক টন।
চলতি মৌসুমে ১৭ হাজার টন ইলিশ আহরণের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সাগরে বিপুলসংখ্যক ট্রলার ও যান্ত্রিক নৌযানকে নিয়মিত মাছ ধরতে হবে। ফলে ইলিশের পাশাপাশি মৌসুমজুড়ে জ্বালানির চাহিদাও বাড়বে।
মৎস্য খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশ আহরণ বাড়াতে মাছের প্রাপ্যতার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ জ্বালানির ব্যয় বেড়ে গেলে মাছ ধরার মোট খরচ বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে জেলেদের আয় এবং বাজারে ইলিশের দামের ওপর।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, ইলিশ আহরণে জ্বালানি খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়। সাগরে বেশি সময় অবস্থান করতে হলে ট্রলার ও নৌযানে জ্বালানির ব্যবহার বাড়ে। ফলে জ্বালানি ব্যয় বাড়লে মাছ আহরণের মোট খরচও বাড়ে, যার প্রভাব বাজারের দামে পড়তে পারে।
এমআর/এসএএস
