প্রয়োজনে বিমা কোম্পানিগুলোর সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধে বাধ্য করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধ না করার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেসব কোম্পানি দাবি পরিশোধ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) পরিদর্শন ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, মানুষের জীবন, সম্পদ ও ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বিমার মূল উদ্দেশ্য। জীবন বিমার পাশাপাশি মানুষের বাড়ি, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস পণ্য, সম্পত্তি ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন ধরনের সম্পদের বিমা করা যায়। বিমার পরিধি অনেক বড় হলেও বাংলাদেশে এখনো এ খাতকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান বিমা খাতের পরিস্থিতি খুব একটা সুখকর নয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর এ খাতে বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। ব্যাংকিং খাতে যেভাবে বিভিন্ন ধরনের শোষণ ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে, বিমা খাতেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণে খাতটিকে সুশৃঙ্খল করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিমা খাত যাতে অনিয়ন্ত্রিত খাতে পরিণত না হয়, সে জন্য সরকার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের মতো বিমা খাতেও প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধানে পরিবর্তন আনা দরকার। এ ধরনের পরিবর্তন আগামী দিনে সংসদের মাধ্যমে আনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিমা খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ না করা উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, সাধারণ মানুষ জীবনের কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ বিমায় বিনিয়োগ করেন ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য। দুর্দিনে সেই অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশা থাকে তাদের। কিন্তু বিমা কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশ গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করেনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিমা দাবির ৫৭ শতাংশ অনাদায়ি রয়েছে। অর্থাৎ ১০০ টাকার দাবির মধ্যে ৫৭ টাকার দাবি পরিশোধ করা হয়নি। এই চিত্র থেকেই বোঝা যায়, বিমা খাতে কতটা বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
গ্রাহকদের দাবি দ্রুত পরিশোধে আইডিআরএ কঠোর অবস্থান নিয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, যেসব বিমা কোম্পানি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করেনি, তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হচ্ছে। যারা দাবি পরিশোধ করছে, তাদের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। আর যারা করছে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিমা কোম্পানির দায়িত্ব হলো গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত রাখা। কিন্তু কিছু কোম্পানি গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ না করে জমি ও অন্যান্য সম্পদ কিনেছে এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে। এমনকি সরকারি সিকিউরিটিজেও বিনিয়োগ করেছে। অথচ গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করেনি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রয়োজন হলে কোম্পানিগুলোকে তাদের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করতে হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিমা কোম্পানির সম্পদ জমিয়ে রাখার চেয়ে গ্রাহকদের বৈধ দাবি পরিশোধ করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।
গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত অনাদায়ি দাবি নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কিছু কোম্পানি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করেছে। আইডিআরএর চেয়ারম্যানও এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ তৈরি করেছেন। তার উদ্যোগে কিছু দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অন্য বিমা কোম্পানিগুলোর জন্যও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যেসব বিমা কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ না করে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজন হলে তাদের সম্পদ বিক্রি করে জনগণের দাবি পরিশোধ করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনাদায়ি বিমা দাবির যে বড় অংশ রয়েছে, তা দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের বৈধ দাবি যত দ্রুত সম্ভব পরিশোধ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বিমা খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিমা খাত যত বেশি সুশৃঙ্খল ও আস্থাশীল হবে, দেশের অর্থনীতিতেও এ খাতের অবদান তত বাড়বে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর প্রদানসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিমা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এমএমএইচ/এমএন
