লভ্যাংশে হঠাৎ লাগাম, কেউ বিপাকে কেউ বিপদে

Dhaka Post Desk

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৯:২৫

লভ্যাংশে হঠাৎ লাগাম, কেউ বিপাকে কেউ বিপদে

ডিএসই টাওয়ার

সমাপ্ত অর্থবছরের বেশি লভ্যাংশ ঘোষণার পর বিপাকে পড়েছে আইডিএলসিসহ আর্থিক খাতের তিন কোম্পানির পর্ষদ ও শেয়ারহোল্ডাররা। অন্য কোম্পানি দুটি হলো- বিডি ফিন্যান্স ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড।

এ অবস্থার কারণ বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের ওপর লাগাম টেনে ধরে। লভ্যাংশের নতুন নীতিমালায় বলা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান যতই মুনাফা করুক ১৫ শতাংশের বেশি নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। শুধু তাই নয়, ১০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিতে হবে। আর তাতে বিপাকে পড়েছে আর্থিক খাতের এই তিন কোম্পানি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই নির্দেশনার আগেই আইডিএলসি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এছাড়াও বিডি ফিন্যান্স ও আইপিডিসি ১২ শতাংশ করে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। বিনিয়োগকারী ও পরিচালনা পরিষদ উভয়েরই এখন প্রশ্ন তাদের কি হবে? কোম্পানি তিনটিকে যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা পালন করতে হয় তবে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এ বিষয়ে বিনিয়োগকারী এনামুল হক আকন্দ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আইডিএলসি করোনার সময়েও ভালো মুনাফা করেছে। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ভালো পারফর্মেন্সের কারণে আমি শেয়ার কিনেছি। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ১৫ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না। তাতে প্রতিটি শেয়ারে আমার ক্ষতি হবে দুই টাকা। আমার ক্ষতিপূরণ কে দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালার প্রেক্ষিতে কোম্পানি তিনটির কর্মকর্তারা বলছেন, কোম্পানির বোর্ড সভায় লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়েছে। নিয়ম অনুসারে সামনে বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) তা পাশ হবে। তার আগেই হঠাৎ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিমালায় আমরা বিব্রত হয়েছি।

তবে আশা করছি, আমরা যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আগেই লভ্যাংশ ঘোষণা করেছি। আমাদের বিষয়টা এ আইনের বাইরে থাকবে। তারপরও যদি বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে বলে, ঘোষিত লভ্যাংশ নীতিমালা অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে, তাহলে তা করা হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সুরাহা করবো।

হঠাৎ করে লভ্যাংশ ঘোষণার নতুন নীতিমালা জারিতে শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বুধবার এ নীতিমালা প্রকাশের পর পুঁজিবাজারে আর্থিক খাতের শেয়ারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। 

তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ১৫ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিতে পারবে না, তার অর্থ হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক লাগাম টেনেছে। এ কারণে সক্ষমতা থাকার পরও কোম্পানিগুলো ভালো লভ্যাংশ দিতে পারবে না। অর্থাৎ শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর দায় কে নেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত নতুন নীতিমালায় বলা হয়, মুনাফা যত বেশিই করুক ১৫ শতাংশরে বেশি নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। শুধু তাই নয়, যেসব প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) ১০ শতাংশের কম ও শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব প্রতিষ্ঠানও কোনো লভ্যাংশ দিতে পারবে না।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩ এর ১৮(ছ) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করে দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে বুধবার পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি মূলধন সাশ্রয়ী ও তারল্য বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংরক্ষিত সম্পদ না রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঘাটতি সমন্বয়ে ডেফারেল সুবিধা ভোগ করছে, সেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ সম্পদ সংরক্ষণের আগে কোনো প্রকার নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে।

এতে আরও বলা হয়, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ব্যতীত কোনো প্রকার লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না।

এছাড়া যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) ১০ শতাংশের কম ও শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোনো প্রকার লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ লভ্যাংশের হার ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করতে ও পরবর্তী নিদের্শনা না দেওয়া পর্যন্ত চলমান রাখতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন ঘোষণায় বিনিয়োগারীরা চরমভাবে হতাশ হয়েছেন। তারা এটাকে অন্যায় বলে মন্তব্য করেছেন।

আইডিএলসি-আইপিডিসি ও বিডি ফিন্যান্সের লভ্যাংশ ঘোষণা

গত সপ্তাহ অর্থাৎ ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের তিন প্রতিষ্ঠান ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সালে সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করে পর্ষদ। এর মধ্যে আইডিএলসি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৩৫ শতাংশ নগদ, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ১২ শতাংশ নগদ ও বিডি ফিন্যান্স ৬ শতাংশ নগদ ও ৬ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেওয়ার প্রস্তাব করে।

প্রতিষ্ঠানগুলো যা বলছে

আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মাসুদ করিম বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আগেই আমাদের পর্ষদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংক যদি মনে করে, লভ্যাংশ আগে ঘোষণা হওয়ায় এ নীতিমালার বাইরে থাকবে তাহলে ঠিক আছে। আর না হলে বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

বিডি ফিন্যান্সের কোম্পানি সচিব মুন্সি আবু নাঈম বলেন, লভ্যাংশের নতুন নীতিমালা অনুসারে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বোনাস লভ্যাংশ দেওয়া যাবে। তারপরও আমরা ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে পারব কি-না, বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের অনুমতি দিবে কি-না, সেই বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বসবো। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন আদেশের ফলে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এমআই/এসএসএইচ

Link copied