হু হু করে বাড়ছে সরকারি শেয়ারের দাম, সতর্ক থাকার আহ্বান

Mahfuzul Islam

১২ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৩৮ পিএম


হু হু করে বাড়ছে সরকারি শেয়ারের দাম, সতর্ক থাকার আহ্বান

বীমা, বস্ত্র এবং ওষুদ ও রসায়ন খাতের পর এবার কারসাজি চক্রের খপ্পরে পড়ে হু হু করে দাম বাড়ছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সরকারি ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টির শেয়ারের দাম হঠাৎ বেড়েছে।

উৎপাদন প্রায় বন্ধ— এমন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামও দ্বিগুণ বেড়েছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন- বিএসইসি ও ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম কেন এমন ঊর্ধ্বমুখী— জানতে চাওয়া হলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমি তো ঢালাওভাবে সরকারি শেয়ারের দাম বাড়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। এখানে ম্যানিপুলেশন হচ্ছে। কে বা কারা এটি করছে, বিএসইসি’র উচিত তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া। সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও উচিত এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের আগে ঝুঁকি রিকভার হবে কি না, তা জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করা।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। গত বছরের ২০ ডিসেম্বরের পর থেকে প্রথম দফায় এগুলোর দাম বাড়তে শুরু করে। ৯ জানুয়ারি থেকে তা ঢালাওভাবে বাড়তে থাকে। এর পেছনে কলকাঠি নাড়াচ্ছে চার থেকে পাঁচটি কারসাজি চক্র।

তাদের মধ্যে রয়েছে- সমবায় অধিদফতরের এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে থাকা একটি চক্র; দ্বিতীয় চক্রটি রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের নেতৃত্বে, এবং তৃতীয়টি হচ্ছে- মার্চেন্ট ব্যাংকার্সদের একটি চক্র। এছাড়া প্রশাসনের মধ্যে দুটি চক্র সংঘবদ্বভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম কারসাজির মাধ্যমে বাড়াচ্ছে।

যেভাবে শুরু হয় কারসাজি

বহুল আলোচিত বিমা খাতের প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়া’ ও ‘প্রভাতি’র মতোই সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) শেয়ারের মুনাফা হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। এটিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দাম বৃদ্ধি। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৪ টাকা ৩৪ পয়সা। যা এর আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৮ পয়সা। অর্থাৎ মুনাফা বেড়েছে ছয় থেকে সাত গুণ। মুনাফা বাড়ার গোপন খবরটি সমবায় অধিদফতরের ওই চক্রটির কাছে পৌঁছায়। তারা ডিসেম্বরজুড়ে শেয়ার কেনে। ফলে ২৬ ডিসেম্বর প্রথম প্রান্তিকের মুনাফা বৃদ্ধির খবর প্রকাশের আগেই শেয়ারটির দাম বাড়তে থাকে।

dhakapost

ডিএসই’র তথ্য অনুযায়ী, ২৩ ডিসেম্বর থেকে বাড়তে থাকে শেয়ারটির দাম। ওইদিন বিএসসি’র শেয়ারের দাম ছিল ৪৯ টাকা ৪ পয়সা। সেখান থেকে সর্বশেষ ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ১২৭ টাকা ২০ পয়সায়। অর্থাৎ ১৯ দিনে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৭৭ টাকা ৮০পয়সা।

বিএসসি’র মুনাফা বৃদ্ধির খবরটি ইস্যু করে বাকি চক্রগুলো পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো মুনাফা হবে— বাজারে এমন গুজব ছড়ায়। ফলে ওই দুই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আইসিবি ও উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ারের দামও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে বাড়তে শুরু করে।

ডিএসই’র তথ্য বলছে, ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলের শেয়ারের দাম ছিল ১৭৯ টাকা। ১১ জানুয়ারি শেয়ারটির সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ২৪৮ টাকা ৪৬ পয়সায়। অর্থাৎ শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৬৯ টাকা ৪৬ পয়সা।

বিএসসি’র মুনাফা বৃদ্ধির খবরটি ইস্যু করে বাকি চক্রগুলো পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভালো মুনাফা হবে— বাজারে এমন গুজব ছড়ায়। ফলে ওই দুই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আইসিবি ও উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ারের দামও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে বাড়তে শুরু করে

২৬ ডিসেম্বর পাওয়ার গ্রিডের শেয়ারের দাম ছিল ৫৫ টাকা। ২০ টাকা ৪০ পয়সা বেড়ে ১১ জানুয়ারি তা লেনদেন হয়েছে ৭৫ টাকা ৪ পয়সায়। ২৯ ডিসেম্বর ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) লিমিটেডের শেয়ারের দাম ছিল ১১৭ টাকা ৩ পয়সা। সেখান থেকে ১৭ টাকা বেড়ে ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ১৩৪ টাকা ৩ পয়সায়।

এছাড়া ২১ ডিসেম্বর ৫২ টাকা ৭ পয়সায় লেনদেন হওয়া উসমানিয়া গ্লাসের শেয়ার ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ৬৩ টাকা ১ পয়সায়। অর্থাৎ দাম বেড়েছে ১১ টাকা। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির শেয়ার গত ২৭ ডিসেম্বর ছিল ৩৪ টাকা ১ পয়সা। সেখান থেকে ১২ টাকা ৭০ পয়সা বেড়ে ১১ জানুয়ারি তা লেনদেন হয়েছে ৪৬ টাকা ৮০পয়সায়।

যমুনা অয়েলের শেয়ার চলতি বছরের ২ জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়তে শুরু করে। এদিন শেয়ারটির দাম ছিল ১৭০ টাকা ৪ পয়সা। সেখান থেকে ১৫ টাকা ৪০ পয়সা বেড়ে ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ১৮৬ টাকা ৮ পয়সায়। ৪ জানুয়ারি থেকে দাম বাড়ে তিতাস গ্যাসের। এদিন প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ছিল ৩৬ টাকা ৯ পয়সা। সেখান থেকে তা ১৩ টাকা বেড়ে ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ৪৯ টাকা ৬০ পয়সায়।

৫ জানুয়ারি থেকে পদ্মা অয়েল ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করে। এদিন পদ্মা অয়েলের শেয়ারের দাম ছিল ২১১ টাকা ৪ পয়সা। ১১ টাকা বেড়ে ১১ জানুয়ারি তা লেনদেন হয়েছে ২৩৩ টাকা ৩ পয়সায়। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শেয়ারের দাম ছিল ১৯৫ টাকা ১ পয়সা। এটি ২৩ টাকা ৮০ পয়সা বেড়ে ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ২১৮ টাকা ৯ পয়সায়।

প্রকৌশল খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এটলাস বাংলাদেশ’র উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে। ৬ জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দামও বাড়তে শুরু করে। ওইদিন এর শেয়ারের দাম ছিল ১০৭ টাকা ৮ পয়সা। সেখান থেকে ১৪ টাকা বেড়ে ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ১২১ টাকা ২ পয়সায়। অর্থাৎ তিন কর্মদিবসে (মাঝে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি) শেয়ারটির দাম বেড়েছে ১৪ টাকা।

dhakapost

তৃতীয় দফায় ৯ জানুয়ারি থেকে দাম বাড়তে শুরু করে সাতটি প্রতিষ্ঠানের। গত দুদিনের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার সর্বনিম্ন ৩ টাকা থেকে ১২৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। 

প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টসের। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার গত ৯ জানুয়ারি ছিল দুই হাজার ৯০৫ টাকা। সেখান থেকে ১২৩ টাকা বেড়ে ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ৩০২৮ টাকায়।

প্রকৌশল খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এটলাস বাংলাদেশ’র উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে। ৬ জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দামও বাড়তে শুরু করে। ওইদিন এর শেয়ারের দাম ছিল ১০৭ টাকা ৮ পয়সা। সেখান থেকে ১৪ টাকা বেড়ে ১১ জানুয়ারি লেনদেন হয়েছে ১২১ টাকা ২ পয়সায়। অর্থাৎ তিন কর্মদিবসে (মাঝে শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি) শেয়ারটির দাম বেড়েছে ১৪ টাকা

ইস্টার্ন ক্যাবলসের শেয়ারের দাম ৯ জানুয়ারি ছিল ১৩১ টাকা ৭ পয়সা। সেখান থেকে ১৭ টাকা বেড়ে ১১ জানুয়ারি তা ১৪৮ টাকা ৮ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। ন্যাশনাল টিউবসের শেয়ার ৮৬ টাকা ১ পয়সা থেকে ১৪ টাকা বেড়ে ১০০ টাকায়, রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের শেয়ার ১০১৫ টাকা ৬ পয়সা থেকে ৬৩ টাকা বেড়ে ১০৭৮ টাকা ৯ পয়সায়, রূপালি ব্যাংকের শেয়ার ৩৩ টাকা থেকে দুই টাকা বেড়ে ৩৫ টাকায় এবং উৎপাদন বন্ধ থাকা শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ার ৮৩ টাকা ৩ পয়সা থেকে চার টাকা বেড়ে ৮৭ টাকা ৪ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

এছাড়া ৯ জানুয়ারি ১১৫ টাকা ৫ পয়সায় লেনদেন হওয়া ঝিল বাংলা সুগার মিলস’র শেয়ার ১১ জানুয়ারি ১১৮ টাকা ৪ পয়সায় লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ দুদিনে শেয়ারপ্রতি দাম বেড়েছে ৩ টাকা।

যা বলছেন পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা

প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের এমন দাম বৃদ্ধির বিষয়টি ‘সরাসরি কারসাজি’ না বলে ‘অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ছে’ বলে স্বীকার করেছেন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার অধ্যাপক শেখ সামসুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে সেক্টর ওয়াইজ শেয়ারের দাম বেড়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অতিরিক্ত বেড়েছে। এখানে অ্যাবনরমাল (কারসাজি) কোনো লেনদেন হয়েছে কি না— বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’

তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। একটি হলো- কমিশন সম্প্রতি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার-মানি যেগুলো ডিপোজিট রয়েছে, সেগুলো শেয়ারে কনভার্ট করার নির্দেশ দিয়েছে। আরেকটি হলো- সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোড করতে বলা হয়েছে। তবে এ কারণে তো সব শেয়ারের দাম বাড়ার কথা নয়।

dhakapost

ঝুঁকি মোকাবিলায় কী করা উচিত— জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক সামসুদ্দিন আহমেদ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘যারা কম ঝুঁকি নিতে চান তাদের এ মুহূর্তে সরকারি শেয়ারে বিনিয়োগে সতর্ক থাকতে হবে। দাম বাড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলে কেবল সেসব শেয়ারে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। সেটাও সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে।’

এ বিষয়ে ডিএসই’র প্রভাবশালী এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছয়-সাত বছর আগে একইভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়িয়ে কারসাজি চক্রটি তা বিক্রি করে চলে যায়। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ধরা খান। এবারও তা-ই হচ্ছে। যারা এতদিন অল্প অল্প করে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনেছেন, তারা লাভবান হচ্ছেন। যারা বেশি লাভের আশায় এখন শেয়ার কিনছেন, তারা ধরা খাবেন।

তার মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসি সর্বশেষ প্রান্তিকে বড় মুনাফা দেখিয়েছে। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। এক বিএসসি’র শেয়ারের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। এটা তো খালি চোখেই দেখা যায়, অর্থাৎ ম্যানিপুলেশন হচ্ছে। এটা তো বাড়াবাড়ি!

এক্ষেত্রে কী করা উচিত— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএসসির অডিট রিপোর্ট কি সঠিক, না ভুয়া— তা খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি প্রায়ই উল্টাপাল্টা নিউজ দেয় যে, জাহাজ কেনা হচ্ছে। পরে আর কোনো খবর থাকে না। সুতরাং প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারকে কেন্দ্র করে পুরো সেক্টরের শেয়ারের দাম যেভাবে বাড়ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

এমআই/এমএআর/

 

Link copied