৯২ শতাংশ শিক্ষক কর্মক্লান্তিতে ভুগছেন, ক্লাসে মনোযোগ নেই ৯০ শতাংশের

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি বড় অংশ পেশা-বহির্ভূত নানা কাজের চাপে চরম কর্মক্লান্তিতে ভুগছেন। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯২ দশমিক ৬৯ শতাংশ শিক্ষক দীর্ঘস্থায়ী কর্মক্লান্তিতে আক্রান্ত। এ কারণে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের পর ৯০ শতাংশ শিক্ষকই পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের শিখনফল ও ফলাফলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশা-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার শিক্ষণ ও শিখনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পেশা-বহির্ভূত কাজে বছরে প্রায় ১৯ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা মূল্যের শিক্ষক শ্রম ব্যয় হয়। একজন সহকারী শিক্ষক মাসে গড়ে ৪ হাজার ১১৬ টাকা মূল্যের সময় এ কাজে দেন। সারাদেশে সহকারী শিক্ষকদের এ কাজের পেছনে বছরে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ১০৭ কোটি ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার ১ টাকা।
গবেষণার উপাত্ত অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকরা সহকারী শিক্ষকদের তুলনায় বেশি সময় (গড়ে ২৭.৭৪ ঘণ্টা) নন-প্রফেশনাল কাজে ব্যয় করেন। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী যেসব শিক্ষকের ক্ষেত্রে কর্মক্লান্তি বা বার্নআউট নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে (২১৯ জন), তাদের মধ্যে ৯২.৬৯ শতাংশ ‘লেট-স্টেজ বার্নআউট’-এ ভুগছেন।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে প্রত্যেকটি স্কুলকে একটি অটোনোমাস বডির মতো গড়ে তুলতে হবে। কারণ আমরা দেখেছি, এতগুলো সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও আমাদের অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় খুব ভালোভাবে শিক্ষাদান করছে। আমি নিজেই বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শনে যাওয়ার আগে এটা বিশ্বাস করতাম না যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এত ভালো শিক্ষা দেওয়া হয়। আমাদের শিক্ষকরা অর্থমূল্যে খুব বেশি কিছু পান না, হয়তোবা তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ে। কারণ যে সব স্কুলে ভালো শিক্ষা দেওয়া হয়, সেসব স্কুলের কমিউনিটির মানুষ শিক্ষকদের সম্মান করেন।
তিনি বলেন, স্কুলে আমি দেখেছি, একজন যোগ্য প্রধান শিক্ষক টিমওয়ার্কের মাধ্যমে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে কাজ করেন। তাই স্কুলগুলো অটোনোমাস বডির মতো কাজ করলে শিক্ষার মান আরও ভালো হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জনবল। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এবং দক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ মানবসম্পদ তৈরি না হলে রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের আরেকটি সমস্যা ম্যানেজমেন্টে। আমরা বড় বড় কথা বলি, ডিজিটালাইজেশনের কথা বলি, কিন্তু সব জায়গায় ফাঁকি। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কিন্তু সব জায়গায় ফাঁকি বিদ্যমান। ডিপিইতে বিশাল একটি সিস্টেম আছে, কিন্তু বাস্তবে সেখানে আপডেটেড কোনো ডাটা পাওয়া যায় না। আমরা আধুনিক প্রযুক্তিটাও ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারছি না। আমাদের প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার হলে মানুষের জীবন সহজ ও স্মার্ট করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োগে আমাদের সমস্যা। কাজেই শিক্ষকদের যে সময় নষ্ট হয়, সেটি কমিয়ে কীভাবে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানো যায়, সে চিন্তা আমাদের আছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।
আরএইচটি/এমএন