দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও শিক্ষার্থী কল্যাণকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে আসন্ন বাজেটে। প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলা, শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ইউনিফর্ম-জুতা-ব্যাগ বিতরণ এবং শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এসব উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে প্রাথমিক শিক্ষার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষা খাতে একটি বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করতেই এসব অগ্রাধিকার বাজেটে প্রতিফলিত হতে পারে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পাঠ্যবইনির্ভর বা পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। বরং প্রযুক্তি ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন, সৃজনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির সঙ্গে শিক্ষাকে আরও বেশি সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যেই শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থী কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো একটি ‘স্মার্ট এডুকেশন ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলা। যেখানে প্রযুক্তি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে একই কাঠামোর আওতায় এনে ধাপে ধাপে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন ঘটানো হবে। আসন্ন বাজেটে সেই ভিত্তি তৈরির বিষয়গুলোই অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম, জুতা, মোজা ও স্কুলব্যাগ বিতরণের বৃহৎ কর্মসূচিও নেওয়া হচ্ছে। দেশের ১ কোটি ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে পর্যায়ক্রমে এসব উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। নির্বাচনী ইশতেহার এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা হবে যুগোপযোগী, ক্যারিয়ারমুখী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। স্মার্ট এডুকেশন সিস্টেম ওভারনাইট আসে না। এটা ধাপে ধাপে গড়ে তুলতে হয়। আমরা এখন পুরো ইকোসিস্টেম তৈরির কাজ করছি। আগামী বাজেটেও সেই ভিত্তি তৈরির উদ্যোগ থাকবে।’
বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষার যেসব বিষয়
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহার, ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রযুক্তি এবং উন্নত সংযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও বাজেট সহায়তার প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে শিক্ষকদের দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।
তবে এবারের পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষার্থী কল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলো। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মিড-ডে মিল কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম চলছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও কর্মসূচিটি ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দেখাতে শুরু করেছে। পাইলট কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী বছর দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে প্রযুক্তি ও পুষ্টির সমন্বয়ে আধুনিক করার পরিকল্পনা চলছে। এর অংশ হিসেবে ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টি নিশ্চিতে আগামী বছর থেকে দেশের সব সরকারি প্রাথমিকে মিড-ডে মিল চালুর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মিড-ডে মিলকে শুধু খাদ্য সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া কমানো, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং শেখার পরিবেশ উন্নত করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে কর্মসূচিটি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে আগামী বাজেটেও এ খাত বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম, জুতা, মোজা ও স্কুলব্যাগ বিতরণের বৃহৎ কর্মসূচিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ১ কোটি ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে পর্যায়ক্রমে এসব উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। নির্বাচনী ইশতেহার এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানা গেছে, মূল কর্মসূচি শুরুর আগে আগামী জুলাই-আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রকল্প) বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে। পাইলট প্রকল্পের আওতায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে অন্তত ১ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ইউনিফর্ম, জুতা, মোজা ও স্কুলব্যাগ বিতরণ করা হবে। পরে পর্যায়ক্রমে বাকি শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পাইলট কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাইলট কর্মসূচির আওতায় বিতরণযোগ্য উপকরণগুলোর মান ও ব্যবহারযোগ্যতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমাদেরকে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, স্কুলব্যাগগুলো ওয়াটারপ্রুফ হবে। বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করেই উপকরণগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। যেহেতু এটি একটি পাইলট কার্যক্রম, তাই কোথাও কোনো সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি থাকলে আমরা তা শনাক্ত করতে পারব। পরে জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের সময় সেগুলো সংশোধন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, পাইলট প্রকল্পের ফলাফল সন্তোষজনক হলে আগামী জানুয়ারি থেকে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পুরোদমে এ কর্মসূচি চালু করা হতে পারে। এ লক্ষ্যে দেশের কোনো উপজেলা যাতে বাদ না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রতিটি উপজেলার একাধিক বিদ্যালয়কে পাইলট কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ২৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে এমন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়, যেখানে শিশুরা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং ভবিষ্যৎ জীবন, কর্মজগৎ ও নাগরিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করবে। তার মতে, প্রযুক্তি, পুষ্টি, শিক্ষা উপকরণ ও মানসম্মত পাঠদান— সবকিছুকে সমন্বয় করেই নতুন প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে।
শিক্ষা খাতে ২৩ হাজার কোটি টাকা বাড়তি অর্থায়নের আশা শিক্ষামন্ত্রীর
এদিকে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি বলেছেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ প্রস্তাব অনুমোদন হলে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে, যা শিক্ষা খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় করা যাবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রায় ১৪ লাখ ট্যাব সরবরাহের একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হলে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরএইচটি/এমএন
