দেশের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেবে কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। আগামী ২ জুলাই শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যক্রমে মিল থাকা মোট ১৪টি বিষয়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রশ্নপত্রের সহজ–কঠিন বৈষম্য কমিয়ে মূল্যায়নে সমতা ও শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতেই নেওয়া হয়েছে এই উদ্যোগ।
এতদিন প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড নিজস্ব প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা আয়োজন করত। এতে বিভিন্ন বোর্ডে প্রশ্নের মান ও কঠিনতার পার্থক্য নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হতো। নতুন ব্যবস্থায় ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা নির্ধারিত অভিন্ন বিষয়গুলোতে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেবে। তবে স্বতন্ত্র কারিকুলাম ও সিলেবাসের কারণে প্রথম বছর এই উদ্যোগের বাইরে থাকছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোর্ডভিত্তিক আলাদা প্রশ্নপত্রের পরিবর্তে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলে ঢাকা বোর্ডের একজন শিক্ষার্থী যে প্রশ্নে পরীক্ষা দেবে, একই সময়ে দিনাজপুর, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটের পরীক্ষার্থীরাও একই প্রশ্নে অংশ নেবে। একইভাবে মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থীরাও সাধারণ বোর্ডের সঙ্গে মিল থাকা বিষয়গুলোতে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষায় অংশ নেবে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সাধারণ বোর্ডের যেসব বিষয়ে পাঠ্যক্রম ও বিষয়বস্তু অভিন্ন, সেসব বিষয়েও একই প্রশ্নপত্র ব্যবহার করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত বছরগুলোতে প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রায়ই দেখা যেত কোনো বোর্ডে প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন হয়েছে, আবার কোনো বোর্ডে অপেক্ষাকৃত সহজ হয়েছে। এর ফলে ফলাফল মূল্যায়নে এক ধরনের বৈষম্য এবং অযাচিত প্রতিযোগিতা তৈরি হতো, যা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ সৃষ্টি করত। এই বৈষম্য কমিয়ে মূল্যায়নে সমতা আনতেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন বোর্ডের মধ্যে প্রশ্নপত্রের সহজ–কঠিন হওয়ার যে বৈষম্য ও অযাচিত প্রতিযোগিতা থাকে, তা দূর করতেই এবার একক প্রশ্নে পরীক্ষা আয়োজন করা হচ্ছে। একই দেশে এসএসসি ও এইচএসসির মতো বড় পাবলিক পরীক্ষা ভিন্ন প্রশ্নে হতে পারে না।
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রাসার কয়েকটি আবশ্যিক ও নৈর্বাচনিক বিষয়ের সিলেবাস সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে অভিন্ন। এ কারণে ওই মিল থাকা ১৪টি বিষয়ে এবার মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও সাধারণ বোর্ডের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেবে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মো. ফারুক আহম্মেদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাদ্রাসার নিজস্ব কিছু বিশেষায়িত ও ধর্মীয় বিষয় ছাড়া বাকি সাধারণ বিষয়গুলোর সিলেবাস এখন সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মতোই। এবারের পরীক্ষায় বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), গণিত (আবশ্যিক), বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, পৌরনীতি, কৃষিশিক্ষা এবং গার্হস্থ্য বিজ্ঞানসহ মোট ১৪টি বিষয়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, এর ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নের প্রক্রিয়া আরও সমন্বিত ও কার্যকর হবে।
তবে মন্ত্রণালয় অভিন্ন বিষয়ের কথা বললেও সিলেবাসের ভিন্নতার কারণে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড আপাতত এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে তাদের বিষয়ের সরাসরি মিল নেই।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কারিকুলাম ও সিলেবাস সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের কোনো বিষয়ের সঙ্গে আমাদের বিষয়গুলোর হুবহু মিল নেই। ফলে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় কারিগরি বোর্ডের পরীক্ষা বরাবরের মতো নিজস্ব প্রশ্নপত্রেই অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যদি মন্ত্রণালয় কারিকুলাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেয়, তাহলে সিলেবাস পরিবর্তনের মাধ্যমে কারিগরি বোর্ডও অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়ের বিকল্প ভাবনা
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা আবহাওয়ার দিক থেকে দেশের জন্য তুলনামূলক দুর্যোগপ্রবণ সময় হিসেবে পরিচিত। অতীতেও বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে একাধিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করার নজির রয়েছে। এবার একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়ায় দুর্যোগ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দুর্যোগের সঙ্গে প্রশ্নপত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। অভিন্ন প্রশ্ন ইতোমধ্যে নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। কোনো বিশেষ অঞ্চলে দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা গ্রহণে সমস্যা হলে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আধুনিক ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে।
১১ শিক্ষা বোর্ডে পরিচালিত হচ্ছে মাধ্যমিক–উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম
দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, একটি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং একটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, পাঠ্যক্রম তদারকি, পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন ও ফল প্রকাশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম এসব বোর্ডের অধীনেই পরিচালিত হয়।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলো হলো— ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, যশোর, বরিশাল, সিলেট, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ। অঞ্চলভিত্তিক এসব বোর্ড তাদের অধীন স্কুল ও কলেজগুলোর শিক্ষা ও পরীক্ষা– সংক্রান্ত কার্যক্রম তদারকি করে। অন্যদিকে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
এতদিন শিক্ষা বোর্ডগুলো নিজস্ব প্রশ্ন প্রণয়ন কমিটি ও মডারেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলাদাভাবে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করে আসছিল। তবে সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর অংশ হিসেবে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আগামী ২ জুলাই শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেবে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন নিবন্ধিত শিক্ষার্থী।
বোর্ডভিত্তিক হিসাবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ৩ লাখ ৩৯৩ জন শিক্ষার্থী ৩১০টি কেন্দ্রে, রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩০ জন শিক্ষার্থী ২০৮টি কেন্দ্রে, কুমিল্লা বোর্ডে ৯৪ হাজার ৮০২ জন শিক্ষার্থী ১৯৩টি কেন্দ্রে, যশোর বোর্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১০ জন শিক্ষার্থী ২৪০টি কেন্দ্রে এবং চট্টগ্রাম বোর্ডে ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন শিক্ষার্থী ১১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেবে।
এছাড়া বরিশাল বোর্ডে ৫৮ হাজার ৬৬৪ জন শিক্ষার্থী ১৪২টি কেন্দ্রে, সিলেট বোর্ডে ৭১ হাজার ৬১১ জন শিক্ষার্থী ৯৬টি কেন্দ্রে, দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৯ জন শিক্ষার্থী ২১২টি কেন্দ্রে এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৭৩ হাজার ৩৭ জন পরীক্ষার্থী ১১১টি কেন্দ্রে অংশ নেবে।
এই ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন শিক্ষার্থী ১ হাজার ৬২৬টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় বসবে।
অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৪৬১টি কেন্দ্রে ৯২ হাজার ৯০৫ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৬১০টি কেন্দ্রে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেবে।
সব মিলিয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা ২ হাজার ৬৯৭টি।
পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশে আয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ, পরিবহন, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার্থী প্রবেশ, কক্ষ তদারকি এবং সিসিটিভিভিত্তিক পর্যবেক্ষণ— সব পর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রসচিব, পরিদর্শক, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
এ ছাড়া আগামী ২৪ জুন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের উপস্থিতিতে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
সভায় ঢাকা ও ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সব কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেবেন।
আরএইচটি/জেডএস
