বিজ্ঞাপন

মাধ্যমিকে শিখন সংকট

মুখস্থ বিদ্যার চাপে কমছে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা

মুখস্থ বিদ্যার চাপে কমছে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা

দেশে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষণ দক্ষতা ও চিন্তা ক্ষমতায় মারাত্মক ধস নেমেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সর্বশেষ ‘ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস (নাস)’ প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মুখস্থ বিদ্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে সিংহভাগ শিক্ষার্থীই বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো প্রধান বিষয়গুলোতে সাধারণ সমস্যা সমাধান এবং বিশ্লেষণী চিন্তার দক্ষতায় চরম ঘাটতিতে ভুগছে। এমনকি পরীক্ষার হলে সাধারণ রিডিং প্যাসেজ বুঝতে এবং মৌলিক জ্যামিতিক ও গাণিতিক হিসাব মেলাতেও হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাধারণ স্কুলগুলোর তুলনায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বাংলায় সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ইংরেজি ভাষায় ‘ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং’ বা নিজস্বভাবে লেখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি এতটাই প্রকট যে, প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই মেধার শীর্ষ স্তরে পৌঁছাতে পারছে না। ভৌগোলিক বৈষম্যের কারণে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ইংরেজির স্কোর তলানিতে নেমে গেছে, যার মধ্যে রংপুর ও ময়মনসিংহের শিক্ষার্থীদের ফলাফল সবচেয়ে বেশি দুর্বল। গণিতের ক্ষেত্রেও চিত্রটি বেশ হতাশাজনক; দেশের মাত্র ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতের শীর্ষ স্তরে জায়গা করে নিতে পেরেছে। বিশেষ করে জ্যামিতিক ধারণার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শূন্যতা দেখা গেছে। 

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে অষ্টম ও দশম উভয় শ্রেণিতেই বাংলা, ইংরেজি ও গণিত, এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা ও গণিতে এই পতনের হার সবচেয়ে বেশি, তবে ইংরেজির ক্ষেত্রে স্কোরের পতন কিছুটা কম হয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘আইটেম রেসপন্স থিওরি’ মডেল অনুসরণ করে এই দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন কার্যক্রমটি পরিচালনা করা হয়, যা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কারিকুলাম এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলার মোট ৯৯৯টি সাধারণ স্কুল ও মাদ্রাসার প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী এই সমীক্ষায় অংশ নেয়।

প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের গড় স্কেল স্কোর এবং ৫টি ভিন্ন ‘অ্যাচিভমেন্ট ব্যান্ড’ বা দক্ষতার স্তরের ভিত্তিতে ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলা ভাষায় অষ্টম শ্রেণির গড় স্কেল স্কোর ৪০৪, যেখানে ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন ‘ব্যান্ড ২’ (দুর্বল) এবং ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ‘ব্যান্ড ৬’ স্তরে রয়েছে। দশম শ্রেণিতে বাংলায় গড় স্কোর ৪১৩ হলেও মাত্র ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘ব্যান্ড ২’ এবং ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ‘ব্যান্ড ৬’ স্তরে অবস্থান করছে। অষ্টম থেকে দশম শ্রেণিতে বাংলায় স্কেল স্কোর বাড়লেও এই বৃদ্ধির হার অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় মাউশি এখন শ্রেণিভিত্তিক নির্দিষ্ট পারফরম্যান্স স্ট্যান্ডার্ড তৈরির সুপারিশ করেছে।

অন্যদিকে, ইংরেজি বিষয়ে অষ্টম শ্রেণির গড় স্কেল স্কোর ৩৭৯ এবং দশম শ্রেণিতে তা ৪০২। ইংরেজিতে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির মধ্যে শিখন অগ্রগতির হার সন্তোষজনক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট। অষ্টম শ্রেণিতে গড় স্কেল স্কোর ৩৯২ হলেও ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী রয়েছে সর্বনিম্ন ‘ব্যান্ড ২’ স্তরে এবং মাত্র ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ স্তর ছুঁতে পেরেছে। দশম শ্রেণিতে গণিতের গড় স্কোর ৪২৫ এবং এখানে ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘ব্যান্ড ৬’ অর্জন করেছে।

এছাড়া, শুধুমাত্র অষ্টম শ্রেণিতে পরিচালিত বিজ্ঞান মূল্যায়নে গড় স্কেল স্কোর এসেছে ৩০৪, যেখানে ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন স্তরে এবং মাত্র ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে।

এদিকে শিক্ষার্থীদের মেধার এই মূল্যায়নে বিভাগগুলোর মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য পাওয়া গেছে। বিষয়ভেদে বিভাগের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও দেখা গেছে। সার্বিক ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলা ও গণিত উভয় বিষয়েই গড় স্কোরে দেশের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগ। তবে ইংরেজির ক্ষেত্রে এককভাবে শীর্ষস্থান দখল করেছে চট্টগ্রাম বিভাগ। বিপরীতে, প্রায় সব বিষয়েই এবং উভয় শ্রেণিতেই দেশের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে রয়েছে সিলেট বিভাগ। এছাড়া ইংরেজি বিষয়ে সিলেটের সঙ্গে যৌথভাবে নিম্ন অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ। শীর্ষ বিভাগ খুলনা এবং সর্বনিম্ন বিভাগ সিলেটের মধ্যে স্কোরের এই বড় ব্যবধান নীতিগতভাবে জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি রাখে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

লিঙ্গ, অঞ্চল ও প্রাতিষ্ঠানিক ধরনের ক্ষেত্রেও মূল্যায়নে বড় বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। ভাষা দক্ষতার (বাংলা ও ইংরেজি) ক্ষেত্রে ছাত্ররা পিছিয়ে থাকলেও ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে দশম শ্রেণির বাংলায় ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে ভালো পারফর্ম করেছে। তবে আশার কথা হলো, গণিত ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যে কোনো লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান পাওয়া যায়নি। ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শহরের শিক্ষার্থীরা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় সব বিষয়েই উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ে শহরের শিক্ষার্থীদের স্কোর ২০ থেকে ৩০ পয়েন্ট বেশি।

একইভাবে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনস্থ স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা শিক্ষার শিক্ষার্থীদের চেয়ে সব বিষয়েই অনেক ভালো স্কোর করেছে, যার মধ্যে ইংরেজিতে এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। এছাড়া সমতলের শিক্ষার্থীরা হাওর, উপকূলীয় বা পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভালো ফলাফল করেছে।

শিক্ষার মান উন্নয়নে যেসব সুপারিশ মাউশির

শিক্ষাব্যবস্থার এই গুণগত ঘাটতি ও বৈষম্য পূরণে মাউশির পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সুপারিশও করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু পাসের হার বা এনরোলমেন্ট বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা ও শিখনফল নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগীয় ও শহর-গ্রামের বৈষম্য দূর করতে গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানবিক ও প্রযুক্তিগত সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। 

একইসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং জেলা পর্যায়ে ‘ডিস্ট্রিক্ট রিপোর্ট কার্ড’ তৈরি করে শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ওয়ার্কশপের মাধ্যমে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে মাউশি।

শুধু পাসের হার বৃদ্ধি বা পরীক্ষায় ভালো ফল করাকেই শিক্ষার মানের একমাত্র সূচক হিসেবে দেখার সুযোগ এখন আর নেই বলে মন্তব্য করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।

ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, এটি ২০২৩ সালের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, যা যাচাই-বাছাই ও গবেষণা শেষে সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এখান থেকে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন পরিস্থিতি ও দক্ষতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিত্র উঠে এসেছে। একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে যা শিখছে, সে তা কতটা বুঝতে পারছে, বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে কি না, নিজের ভাষায় প্রকাশ করতে পারছে কি না, এসব বিষয় এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতাকেই এখন গুরুত্ব দিতে হবে। তাই শুধু পাস নয়, নিশ্চিত করতে হবে প্রকৃত শিখন।

তিনি বলেন, ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্টস (নাস)–এর ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে। ভাষা দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, বিশ্লেষণী চিন্তা এবং গণিতভিত্তিক দক্ষতার ক্ষেত্রে যে ঘাটতি উঠে এসেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শহর-গ্রাম, অঞ্চল ও বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

মাউশি মহাপরিচালক আরও বলেন, এই ফলাফলকে আমরা ব্যর্থতা হিসেবে দেখছি না; বরং কোথায় আরও বেশি বিনিয়োগ, পরিকল্পনা ও সহায়তা প্রয়োজন, সেটি নির্ধারণের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছি।

এছাড়া সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষক প্রশিক্ষণকে আরও কার্যকর করা, শ্রেণিকক্ষে দক্ষতাভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক পাঠদান জোরদার করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক শিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আরএইচটি/এমএসএ