মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধির সই নকল করে ও ভুয়া চিঠি তৈরি করে নিয়োগ জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম এবং জাল সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার ১১ জন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। এদের মধ্যে ৫ জন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও সুপারিনটেনডেন্টের বেতন-ভাতা (এমপিও) সাময়িক স্থগিত করাসহ কেন তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে না—তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ভুয়া সনদধারী ৩ শিক্ষকের এমপিও স্থগিত করে চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অর্থ শাখার সহকারী পরিচালক ও এমপিও বাছাই কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ শুকুর আলম মজুমদারের সই করা পৃথক পৃথক অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অভিযুক্ত সবাইকে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে সন্তোষজনক লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি মাদ্রাসা জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৬ অনুযায়ী গঠিত কমিটি কর্তৃক জুন ২০২৬ মাসের নতুন এমপিও আবেদন যাচাই-বাছাইকালে এই বিশাল জালিয়াতি ধরা পড়ে। তদন্তে দেখা যায়, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা সরকারপাড়া আল-হিকমাহ মাদ্রাসার সুপার আবুশাহাদাত মো. জাহাঙ্গীর আলম, কুড়িগ্রামের চিলমারী সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. নাজমুল হক, কুটিরগ্রাম এম এইচ বালিকা মাদ্রাসার সুপার মো. মাহফুজার রহমান খন্দকার, রাজারভিটা ইসলামিয়া মহিলা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. রফিকুর ইসলাম, রংপুরের মিঠাপুকুরের যাদবপুর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সুপার মো. ইব্রাহীম মিয়া, নওগাঁর নামাজগড় গাউসুল আজম কামিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জহরুল ইসলাম, ভোলার চরফ্যাশনের চর শশীভূষণ হোসাইনিয়া মাদ্রাসার সুপার মো. ওমর ফারুক, ঘটখালী আমিন উদ্দন মহিলা আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আবদুস ছালাম এবং পূর্ব ফরিদাবাদ ইউনুছিয়া মাদ্রাসার সুপার মুহাম্মদ জাফর উদ্দিন এবং ভোলার লালমোহনের মুসলিমিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. মোস্তফা কামাল উদ্দিন জাফরী তাদের প্রতিষ্ঠানে ল্যাব সহকারী ও অফিস সহায়ক পদে লোক নিয়োগের জন্য ডিজির প্রতিনিধির ভুয়া চিঠি তৈরি করেন। শুধু তাই নয়, তারা জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া নিয়োগ বোর্ড গঠন করে ফলাফল শিট (সিএস) তৈরি করেন এবং ডিজির প্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করে সুমন মিয়া, শামীম ওসমান সুমন, সিরাজুল ইসলাম, সাজিদ হাসান, শিহাব উদ্দিন, মাহেদী হাসান, আফফান, নাসরিন, মিরাজ হোসেন ও সাকিলদের নতুন এমপিওভুক্তির আবেদন পাঠান। অধিদপ্তর এই জালিয়াতি ধরে ফেলে নতুন আবেদনগুলো বাতিল করেছে এবং এই প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের এমপিও সাময়িক স্থগিত করেছে।
রাজধানীর বাড্ডায় আর্থিক অনিয়ম ও স্বাক্ষর জালের অভিযোগ
এদিকে, রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন আলহাজ্ব রাহীমুল্লাহ মোল্লা দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট জহিরুল ইসলাম পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দাতা সদস্যদের টাকা মাদ্রাসার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ এবং সভাপতির স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নীতিমালা ২০২৬-এর ধারা অনুযায়ী তার বেতন-ভাতা সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।
ধরা পড়েছে এনটিআরসিএ জাল সনদ এর অবাধ্যতাও
অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, গাজীপুরের কাপাসিয়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার আইসিটি বিষেশনের সহকারী শিক্ষক ইসমেতারা (২০১৪ সালের ১০ম শিক্ষক নিবন্ধন) এবং চট্টগ্রামের চন্দনাইশের হাশিমপুর মকবুলিয়া কামিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী মুহাম্মদ আইয়ুব আলীর (২০০৮ সালের ৪র্থ নিবন্ধন) দাখিলকরা শিক্ষক নিবন্ধন প্রত্যয়নপত্র এনটিআরসিএ-এর যাচাইয়ে সম্পূর্ণ জাল ও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কামাত আঙ্গারিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদ দিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে এনটিআরসিএ রেকর্ড অনুসন্ধান করে তার ২০১১ সালের ৭ম নিবন্ধনের সনদটিও ভুয়া বলে নিশ্চিত করে। এই তিন শিক্ষকেরই এমপিও সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে কুড়িগ্রামের উলিপুরের ধমশ্রেণী ইন্দারর পাড়া বালিকা মাদ্রাসার সমাজবিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক রাশেদা সুলতানা তার জাল সনদের অভিযোগের শুনানিতে দুইবার নোটিশ দেওয়া সত্ত্বেও স্বশরীরে উপস্থিত না হয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করায় তার বেতনও সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।
এমন অবস্থায় অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে অভিযুক্তরা যদি সন্তোষজনক ও আইনানুগ জবাব দিতে ব্যর্থ হন, তবে তাদের ইনডেক্স ও এমপিও স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
আরএইচটি/বিআরইউ
