পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের অবহেলা, কিংবা নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে ওভার ও আন্ডার মার্কিং ঠেকাতে বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে শিক্ষা প্রশাসন। ফল পুনঃনিরীক্ষার প্রচলিত নিয়মের বাইরে সরাসরি উত্তরপত্রের মূল্যায়ন মান যাচাই করতে ‘সারপ্রাইজ টেস্ট’ বা বিশেষ অডিট ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
নতুন এই নিয়মে ‘র্যান্ডম স্যাম্পলিং’ বা দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পরীক্ষকদের জমা দেওয়া খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, যেখানে কোনো অনিয়ম বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই এই ব্যবস্থা আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে।
পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইন যুগোপযোগী করে সংশোধন করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশোধিত এই আইনে শুধু পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়মই নয়, উত্তরপত্র মূল্যায়নে শিক্ষকদের গাফিলতি বা দায়িত্বেও অবহেলাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ফলে কোনো পরীক্ষকের বিরুদ্ধে মূল্যায়নে অনিয়মের প্রমাণ মিললে তিনি বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি শাস্তির মুখোমুখি হবেন।
আরও পড়ুন
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন থেকেই এই নতুন ব্যবস্থা আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে। পরীক্ষকদের খামখেয়ালি রুখতে চালু করা হচ্ছে এক ধরনের ‘সারপ্রাইজ টেস্ট’ বা বিশেষ অডিট ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে ‘র্যান্ডম স্যাম্পলিং’ বা দৈবচয়ন পদ্ধতি। এর আওতায় পরীক্ষকেরা উত্তরপত্র বোর্ডে জমা দেওয়ার পর, সেখান থেকে লটারির মতো করে নির্দিষ্টসংখ্যক খাতা বাছাই করা হবে। এরপর বোর্ড মনোনীত বিশেষজ্ঞ বা প্রধান পরীক্ষকদের মাধ্যমে সেগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে। এই যাচাই প্রক্রিয়ায় যদি প্রথম ও দ্বিতীয় মূল্যায়নের নম্বরের মধ্যে অস্বাভাবিক কোনো পার্থক্য বা অযৌক্তিক ওভার/আন্ডার-মার্কিং ধরা পড়ে, তবে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনেক পরীক্ষক নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি উত্তরপত্র নিয়ে শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে মূল্যায়ন করেন। কোথাও কোথাও নিজে না দেখে অন্যের মাধ্যমে উত্তরপত্র মূল্যায়নের অভিযোগও রয়েছে। অতীতে নম্বর হেরফের, মূল্যায়নে অসঙ্গতি এবং দায়িত্বে অবহেলার ঘটনাও শিক্ষা প্রশাসনের নজরে এসেছে। তাদের মতে, এমন অনিয়ম ঠেকাতেই এবার র্যান্ডম স্যাম্পলিং বা ‘সারপ্রাইজ টেস্ট’ পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কোনো পরীক্ষা নয় বরং পরীক্ষকদের কাজের মান যাচাইয়ের একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। এতদিন একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে জমা দেওয়ার পর সেটি সাধারণত আর যাচাই করা হতো না। ফলে মূল্যায়নে কোনো ভুল, অবহেলা বা অসঙ্গতি থাকলেও তা অনেক সময় ধরা পড়ত না। নতুন ব্যবস্থায় সেই সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, উত্তরপত্র মূল্যায়নে নানা ধরনের অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়েও এমন অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডকে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে তথ্য গোপন করে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত খাতা নেওয়ার অভিযোগে তিন পরীক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।

বোর্ডের অভিযোগ অনুযায়ী, একজন পরীক্ষকের জন্য সর্বোচ্চ ৩০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়নের বিধান থাকলেও রাজবাড়ীর কালুখালীর লাড়ীবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক মো. খোরশেদ আলম তথ্য গোপন করে ৯০০টি উত্তরপত্র গ্রহণ করেন। এছাড়া নরসিংদীর মাধবদী গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষক মো. মনির হোসেন এবং নরসিংদী বিয়াম জিলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের একই বিষয়ের পরীক্ষক মো. মশিউর রহমান নির্ধারিত ৩০০টির পরিবর্তে ৪৫০টি করে উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব নেন।
বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করলে মূল্যায়নের গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অভিযুক্ত তিন পরীক্ষকের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে এবং কেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবার শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, অনেক পরীক্ষক নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি উত্তরপত্র নিয়ে শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে মূল্যায়ন করেন। কোথাও কোথাও নিজে না দেখে অন্যের মাধ্যমে উত্তরপত্র মূল্যায়নের অভিযোগও রয়েছে। অতীতে নম্বর হেরফের, মূল্যায়নে অসঙ্গতি এবং দায়িত্বে অবহেলার ঘটনাও শিক্ষা প্রশাসনের নজরে এসেছে। তাদের মতে, এমন অনিয়ম ঠেকাতেই এবার র্যান্ডম স্যাম্পলিং বা ‘সারপ্রাইজ টেস্ট’ পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুনঃনিরীক্ষা নয়, এবার লক্ষ্য ‘প্রকৃত’ পুনর্মূল্যায়ন
বোর্ড পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রতিবছরই হাজার হাজার শিক্ষার্থী উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষার জন্য আবেদন করেন। অনেকেরই ধারণা, আবেদন করার পর তাদের উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। বর্তমানে চালু থাকা পুনঃনিরীক্ষা ব্যবস্থায় উত্তরপত্রের মূল্যায়ন পুনরায় করা হয় না; কেবল কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয় যাচাই করা হয়।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, পুনঃনিরীক্ষার সময় মূলত পাঁচটি বিষয় পরীক্ষা করা হয়। এগুলো হলো— কোনো প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেওয়া বাদ পড়েছে কি না, উত্তরপত্রের ভেতরের নম্বর কভার পৃষ্ঠায় তুলতে কোনো ভুল হয়েছে কি না, নম্বরের যোগফলে কোনো ত্রুটি রয়েছে কি না, কোনো প্রশ্নের নম্বর বৃত্ত (ওএমআর) ভরাটে ভুল হয়েছে কি না এবং পরীক্ষকের দেওয়া নম্বর যথাযথভাবে ট্যাবুলেশন শিটে স্থানান্তর করা হয়েছে কি না।
তবে বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক যে নম্বর দিয়েছেন, তা কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তন বা সংশোধনের সুযোগ নেই। অর্থাৎ পুনঃনিরীক্ষার সময় উত্তর সঠিকভাবে মূল্যায়ন হয়েছে কি না, বেশি বা কম নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না কিংবা মূল্যায়নে কোনো গাফিলতি হয়েছে কি না, এসব বিষয় যাচাই করা হয় না। এমনকি বর্তমান আইনে পরীক্ষার্থী, তার অভিভাবক বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে উত্তরপত্র দেখানোরও কোনো বিধান নেই।

ফলে এতদিন পুনঃনিরীক্ষা কার্যক্রম মূলত নম্বর গণনা ও প্রশাসনিক ভুল সংশোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কোনো পরীক্ষক উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করলেও বা ভুলভাবে নম্বর দিলেও সেই মূল্যায়ন পুনর্বিবেচনার সুযোগ কার্যত ছিল না।
এই বাস্তবতায় পরিবর্তন আনতেই পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সংশোধিত আইনে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এখন থেকে শুধু নম্বর গোনাই নয়, প্রয়োজন হলে উত্তরপত্রের মূল্যায়নের মানও যাচাই করা হবে। অর্থাৎ একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে জমা দিলেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। প্রয়োজন মনে করলে বোর্ড সেই মূল্যায়ন পুনরায় পরীক্ষা করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়ন ব্যবস্থায় একটি কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। একইসঙ্গে পরীক্ষকদের মধ্যেও দায়িত্বশীলতা ও সতর্কতা বাড়বে। কারণ, যেকোনো সময় তাদের মূল্যায়িত উত্তরপত্র দৈবচয়ন পদ্ধতিতে পুনরায় যাচাই করা হতে পারে।
তবে পরীক্ষার্থীরা আবেদন করলে তাদের উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে কি না, কিংবা তারা নিজের উত্তরপত্র দেখতে পারবেন কি না, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।
পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং জনপ্রতি মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত উত্তরপত্রের সংখ্যাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে একজন পরীক্ষক আগের তুলনায় আরও বেশি সময় নিয়ে প্রতিটি উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন। একইসঙ্গে এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় তথাকথিত ‘মানবিক নম্বর’ বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ থাকছে না
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান বোর্ড আইনে পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র দেখানোর কোনো বিধান নেই। তবে সরকার চাইলে প্রজ্ঞাপন বা প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধনের মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থা চালু করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীর হাতে সরাসরি উত্তরপত্র তুলে দেওয়ার পরিবর্তে বোর্ড মনোনীত অভিজ্ঞ পরীক্ষক বা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হতে পারে।
আরও পড়ুন
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, নতুন আইন কার্যকর হলে ভবিষ্যতে পুনঃনিরীক্ষা ব্যবস্থারও পরিবর্তন আসতে পারে। শুধু নম্বর গণনা বা যোগফল যাচাইয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উত্তরপত্রের প্রকৃত মূল্যায়ন পুনরায় করার সুযোগ যুক্ত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে আইন সংশোধন ও পরবর্তী বিধিমালা প্রণয়নের পর।
সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা আইন সংশোধনের মাধ্যমে শুধু পরীক্ষা পরিচালনা নয়, উত্তরপত্র মূল্যায়নেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, অতীতে একজন পরীক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে জমা দেওয়ার পর সেটি সাধারণত আর কেউ যাচাই করতেন না। ফলে মূল্যায়নে গাফিলতি, ওভার-মার্কিং, আন্ডার-মার্কিং কিংবা অন্য কোনো অনিয়ম হলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই ধরা পড়ত না। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষা বোর্ডগুলো দৈবচয়ন (র্যান্ডম স্যাম্পলিং) পদ্ধতিতে নির্দিষ্টসংখ্যক উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়ন করবে। এতে কোনো পরীক্ষকের দায়িত্বে অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এটি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নয় বরং পরীক্ষকদের কাজের মান যাচাইয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। কোনো শিক্ষক নির্দেশনা অনুযায়ী উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছেন কি না, কোথাও অযৌক্তিকভাবে বেশি বা কম নম্বর দেওয়া হচ্ছে কি না কিংবা মূল্যায়নে দায়িত্বে অবহেলা হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ই এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। একজন পরীক্ষার্থীর প্রাপ্য নম্বর যেন কোনোভাবেই ভুল মূল্যায়নের কারণে কমে বা বেড়ে না যায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাড়ছে পরীক্ষক, থাকছে না ‘মানবিক নম্বর’
উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান আরও উন্নত করতে এবার পরীক্ষকদের ওপর কাজের চাপও কমানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাবলিক পরীক্ষায় পরীক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং জনপ্রতি মূল্যায়নের জন্য নির্ধারিত উত্তরপত্রের সংখ্যাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে একজন পরীক্ষক আগের তুলনায় আরও বেশি সময় নিয়ে প্রতিটি উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ পাবেন।
একইসঙ্গে এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় তথাকথিত ‘মানবিক নম্বর’ বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত নির্দেশিকা অনুযায়ী উদারভাবে নম্বর দেওয়া যাবে, তবে সেটি অবশ্যই নির্ধারিত মূল্যায়ন নীতিমালার মধ্যেই হতে হবে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কোনো উত্তরের একটি অংশ সঠিক হলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আংশিক নম্বর (পারশিয়াল মার্কিং) দিতে হবে। কিন্তু কোনো পরীক্ষার্থীকে শুধু পাস করিয়ে দেওয়া বা ফল উন্নত করার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ মূল্যায়ন হবে সম্পূর্ণ উত্তরভিত্তিক; কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’ বা ‘মানবিক নম্বর’ বিবেচনায় নেওয়া হবে না।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। অনেক পরীক্ষক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যতগুলো উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব, তার চেয়ে বেশি খাতা নিয়ে যান। ফলে শেষ পর্যন্ত সব উত্তরপত্র সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না। অতীতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে এমন কিছু ঘটনাও ঘটেছে, যা শিক্ষা বোর্ডের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তিনি বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হই। অনেক শিক্ষক নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি খাতা নিয়ে যান। ফলে মূল্যায়নের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতীতে দু-একটি উদ্বেগজনক ঘটনাও আমরা দেখেছি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই মন্ত্রণালয় র্যান্ডম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে কিছু উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, দৈবচয়ন ভিত্তিতে নির্বাচিত উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের পর যদি প্রথম ও দ্বিতীয় মূল্যায়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই উদ্যোগটি বিশেষ করে যেসব শিক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়নে দায়িত্বে অবহেলা করেন, তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি, এর ফলে যারা এতদিন দায়িত্ব পালনে কিছুটা উদাসীন ছিলেন, তারাও আরও সতর্ক হয়ে নিয়ম মেনে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন।
শিক্ষার্থীরা কি উত্তরপত্র দেখতে পারবে?
পরীক্ষার্থীদের নিজ নিজ উত্তরপত্র দেখার সুযোগ দেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান বোর্ড আইনে পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র দেখানোর কোনো বিধান নেই। তবে সরকার চাইলে প্রজ্ঞাপন জারি বা প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধনের মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, শিক্ষার্থীর হাতে সরাসরি উত্তরপত্র তুলে দেওয়ার পরিবর্তে বোর্ড মনোনীত অভিজ্ঞ শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।
তার মতে, এতে একদিকে যেমন উত্তরপত্রের গোপনীয়তা বজায় থাকবে, অন্যদিকে মূল্যায়নের নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নির্দেশনার অপেক্ষায় শিক্ষা বোর্ড
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক নাজনীন ফেরদৌস বলেন, নতুন ব্যবস্থার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা এখনো বোর্ডের হাতে পৌঁছেনি। নির্দেশনা পাওয়ার পরই বোর্ড প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
তিনি বলেন, একটি পরিবর্তন আসছে, এটি আমরা জানি। আশা করছি খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা হাতে পাব। নির্দেশনা পাওয়ার পর কোন কোন বিষয় বাস্তবায়ন করতে হবে, সে অনুযায়ী বোর্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বর্তমানে চালু থাকা পুনঃনিরীক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পুনঃনিরীক্ষার সময় মূলত নম্বর গণনা, নম্বর স্থানান্তর এবং কোনো প্রশ্নে নম্বর দেওয়া বাদ পড়েছে কি না, এসব বিষয়ই যাচাই করা হয়। পরীক্ষকের দেওয়া নম্বর পরিবর্তনের কোনো সুযোগ বিদ্যমান বিধিমালায় নেই।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, বিদ্যমান বোর্ড আইনে উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের কোনো বিধান নেই। বর্তমানে পুনঃনিরীক্ষার যে ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেটিই কার্যকর। আইন বা বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন এলে বোর্ড সেই অনুযায়ী নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করবে।
আরএইচটি/এমএসএ
