প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কিংবা পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই সরকারি ওয়েবসাইটে পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কার্যত নজিরবিহীন। সেই নজিরবিহীন ঘটনাই ঘটেছে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশকে ঘিরে।
এমনিতেই নীতিমালা নিয়ে আইনি জটিলতা, পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া এবং ফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল এই বৃত্তি পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফল অনলাইনে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় নতুন করে তৈরি হয়েছে ‘ফল ফাঁস’ বিতর্ক। ফলে নীতিগত বিতর্ক, আইনি জটিলতা, পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়া ও ফল প্রকাশের আগেই ফল উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন, দাপ্তরিক নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা ছিল। সেই লক্ষ্যে এক দিন আগেই, অর্থাৎ ৮ জুলাইয়ের মধ্যে চূড়ান্ত ফল প্রস্তুত করে অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ (আইএমডি)। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফল ওয়েব পোর্টালে প্রকাশিত হয়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ ব্যবহারকারীরা ফলাফল ডাউনলোড করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। পরে কর্তৃপক্ষ দ্রুত লিংক সরিয়ে ফেললেও ততক্ষণে ফলাফল অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
যদিও ঘটনার পরপরই ফল প্রকাশ স্থগিত করা হয়। একইসঙ্গে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
প্রথমে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফল প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়। পরে ঈদুল ফিতরের আগে, এরপর ঈদের পরে এবং সর্বশেষ জুন মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হলেও প্রতিবারই তা পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৯ জুলাই ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে ঘটে যায় নজিরবিহীন এই ঘটনা
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কারিগরি ত্রুটির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে এই ‘ফল ফাঁস’ বিতর্কই ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাকে প্রথম আলোচনায় আনেনি। বরং পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই এটি একের পর এক বিতর্ক, আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। শুরুতে শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। পরে সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হলে আদালত সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে নির্দেশ দেন। এরপর অধিদপ্তর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করে। ফলে পরীক্ষা আয়োজনের পুরো প্রক্রিয়াই কয়েক মাস পিছিয়ে যায়।

এসব জটিলতা কাটিয়ে চলতি বছরের এপ্রিলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও ফল প্রকাশ নিয়েও তৈরি হয় দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। প্রথমে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফল প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়। পরে ঈদুল ফিতরের আগে, এরপর ঈদের পরে এবং সর্বশেষ জুন মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হলেও প্রতিবারই তা পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৯ জুলাই ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে ঘটে যায় নজিরবিহীন এই ঘটনা।
যেভাবে প্রকাশ পেল ৯ জেলার ফল
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাটির বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ জুলাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় ৯ জুলাই ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ নির্ধারিত সময়ের আগেই ৮ জুলাই চূড়ান্ত ফল প্রস্তুতের কাজ শেষ করে।
পরিকল্পনা ছিল, মন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিংয়ের পর ওই লিংকগুলো সক্রিয় করা হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ফল প্রকাশ করা হবে। কিন্তু পরদিন সকাল ১০টা ৫ মিনিট থেকে আগে তৈরি করা লিংকগুলোতে ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল ‘পাবলিশড’ অবস্থায় আপলোড হয়ে যায়। প্রকাশিত জেলার মধ্যে ছিল মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ
আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণার পর যাতে দেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা দ্রুত জেলা ও বিভাগভিত্তিক ফল ওয়েব পোর্টাল থেকে সংগ্রহ করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতির দায়িত্ব দেওয়া হয় তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী প্রোগ্রামার আশরাফুল আলম এবং সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার মো. মেহতাব কায়েসকে। তাদের দায়িত্ব ছিল ব্যাক-এন্ডে প্রয়োজনীয় লিংক তৈরি, সার্ভার প্রস্তুত রাখা এবং ফল প্রকাশের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিশ্চিত করা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ জুলাই রাত ১১টা ১৫ মিনিট থেকে তারা ব্যাক-এন্ডে বিভাগ ও জেলাভিত্তিক পৃথক লিংক তৈরির কাজ শুরু করেন। পরিকল্পনা ছিল, মন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিংয়ের পর ওই লিংকগুলো সক্রিয় করা হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ফল প্রকাশ করা হবে।
কিন্তু পরদিন সকাল ১০টা ৫ মিনিট থেকে আগে তৈরি করা লিংকগুলোতে ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল ‘পাবলিশড’ অবস্থায় আপলোড হয়ে যায়। প্রকাশিত জেলার মধ্যে ছিল মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ।
লিংকগুলো অল্প সময়ের জন্য সচল থাকলেও সেই সময়ের মধ্যেই কয়েকজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ফলাফল ডাউনলোড করে ফেলেন। পরে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা বিভাগের এই নয়টি জেলা ছাড়া অন্য কোনো জেলার ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের (আইএমডি) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি কোনো ধরনের হ্যাকিং বা সাইবার হামলার ঘটনা নয়। বরং কারিগরি প্রস্তুতির সময় অসাবধানতা এবং নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণেই ফলাফল নির্ধারিত সময়ের আগেই জনসমক্ষে চলে আসে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফল প্রকাশের আগে তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাধিকবার কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বিশেষ করে মন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে কোনো অবস্থাতেই ফলাফলের ফাইল ওয়েব পোর্টালে আপলোড করা যাবে না—এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, লাইভ প্রোডাকশন সার্ভারে কাজ করার সময় যে ধরনের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক, তা মানা হয়নি। পরীক্ষামূলক কাজ বা প্রি-লিংক তৈরির মতো কার্যক্রম সাধারণত আলাদা টেস্টিং পরিবেশে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে সরাসরি লাইভ সার্ভারেই কাজ করা হয়েছে। এর ফলেই ভুলবশত কয়েকটি জেলার ফলাফল সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বিষয়টি আইএমডি টিমের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটুআইয়ের কারিগরি সহায়তায় ওয়েব পোর্টালে দৃশ্যমান লিংকগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে এর আগেই কয়েকজন ব্যবহারকারী ফলাফল ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পরপরই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করে। মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসীর সই করা এক চিঠিতে সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার মো. মেহতাব কায়েসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
কারিগরি ত্রুটির বিষয়টি তদন্তের পাশাপাশি ফল প্রকাশের প্রস্তুতিও চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার (১২ জুলাই) ফল প্রকাশ করা হতে পারে
চিঠিতে বলা হয়, ফলাফল প্রস্তুতের পর ওয়েব পোর্টালে আপলোডের জন্য প্রয়োজনীয় লিংক তৈরির দায়িত্ব মো. মেহতাব কায়েসকে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ফল যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে কোনোভাবেই ওয়েবসাইটে আপলোড না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা অমান্য করে ৯ জুলাই সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলার ফলাফল আপলোড করা হয়। পরে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ওই লিংকের মাধ্যমে ফল ডাউনলোড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
একই দিনে পরিচালক (প্রশাসন) মাহবুবা আইরিনের সই করা অফিস আদেশে ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. মিরাজুল ইসলাম উকিলকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন উপবৃত্তি বিভাগের শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিয়াউল কবির সুমন। সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন-২) রোকসানা হায়দারকে।
কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঘটনাটি তদন্ত করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে ফল আগাম প্রকাশের কারণ, দায়িত্বে অবহেলা, নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ না করার কারণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় তুলে ধরতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে সহকারী প্রোগ্রামার আশরাফুল আলমের ভূমিকাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফল প্রকাশ-সংক্রান্ত কারিগরি প্রস্তুতির সময় তিনি সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার মো. মেহতাব কায়েসের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছিলেন। তবে প্রতিবেদনে ফলাফল আগেভাগে উন্মুক্ত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণে ব্যর্থতা এবং লাইভ সার্ভারে ভুল প্রক্রিয়ায় কাজ করাকেই দায়ী করা হয়েছে।
শুরু থেকেই বিতর্কে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা
আনুষ্ঠানিকভাবে ফল প্রকাশের আগেই আংশিক ফল ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিলেও, ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শুরু থেকেই ছিল বিতর্ক, আইনি জটিলতা ও অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত, সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়, আপিল, পরীক্ষা পেছানো এবং ফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্ব—একটির পর একটি ঘটনায় প্রায় এক বছর ধরেই আলোচনায় ছিল এই পরীক্ষা।
গত বছরের ১৭ জুলাই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর একটি স্মারকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়, ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় শুধু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশ নিতে পারবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কেরানীগঞ্জ পাবলিক ল্যাবরেটরি স্কুলের পরিচালক, শিক্ষক ও অভিভাবক প্রতিনিধিসহ ৪২ জন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
রিটের শুনানি শেষে গত বছরের ৩ নভেম্বর হাইকোর্ট ওই সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করেন। আদালত রায়ে বলেন, ২০০৮ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেজিস্টার্ড কিন্ডারগার্টেন, কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং নিবন্ধিত বা অনুমোদনপ্রাপ্ত অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যোগ্য শিক্ষার্থীরাও বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ১৫ দিনের মধ্যে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে হাইকোর্টের এই রায় মেনে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা আয়োজনের পথে হাঁটেনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। বরং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিল করে অধিদপ্তর। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। আইনি প্রক্রিয়া, নতুন করে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির কারণে পুরো কার্যক্রম কয়েক মাস পিছিয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশনা এবং সংশোধিত ব্যবস্থাপনার আলোকে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নতুন সূচি ঘোষণা করা হয়। সেই অনুযায়ী পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া দেশের অন্য সব জেলায় গত ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল পৃথক সময়সূচিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়।
প্রায় ১৬ বছর পর আগের ধাঁচে আলাদা বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন হওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার মোট ৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং প্রায় ৯০ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থী ছিল।
তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে একই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন পঞ্চম শ্রেণির সমমানের বৃত্তি পরীক্ষার ফল নির্ধারিত সময়েই প্রকাশ করা হয়। বিপরীতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা, প্রশাসনিক জটিলতা, পরীক্ষা পেছানো এবং শেষ পর্যন্ত ফল প্রকাশের আগেই আংশিক ফল উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা দেশের শিক্ষা খাতে ব্যতিক্রমধর্মী একটি ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ফল কবে, অপেক্ষায় লাখো শিক্ষার্থী
নির্ধারিত দিনে ফল প্রকাশ স্থগিত হওয়ায় নতুন করে অপেক্ষায় পড়েছেন লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কারিগরি ত্রুটির বিষয়টি তদন্তের পাশাপাশি ফল প্রকাশের প্রস্তুতিও চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার (১২ জুলাই) ফল প্রকাশ করা হতে পারে।
এবারের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং প্রায় ৯০ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থী রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী মোট ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে। এর মধ্যে ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুল (মেধাবৃত্তি) এবং ৪৯ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী সাধারণ গ্রেডে নির্বাচিত হবে।
বৃত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রেও সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট বৃত্তির ৮০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং বাকি ২০ শতাংশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। সেই হিসাবে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৬৬ হাজার এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ১৬ হাজার ৫০০টি বৃত্তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, ট্যালেন্টপুলে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা প্রতি মাসে ৩০০ টাকা এবং সাধারণ গ্রেডে নির্বাচিতরা প্রতি মাসে ২২৫ টাকা করে বৃত্তি পাবে। এ ছাড়া উভয় শ্রেণির বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বছরে এককালীন ২২৫ টাকা করে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালীন দুই বছর তারা এই সুবিধা ভোগ করবে।
ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা অনলাইনে আইপিইএমআইএস পোর্টালের মাধ্যমে ফল জানতে পারবেন। পাশাপাশি এসএমএসের মাধ্যমেও ফল জানার সুযোগ রাখা হবে বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
আরএইচটি/এমএসএ
