২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ শ্রেণি এবং মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে চারটি নতুন পাঠ্যবই। প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, এসব বইয়ে থাকছে মোট ৩৫টি অধ্যায়। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘আনন্দময় শিখন’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে তৈরি করা বইগুলোর প্রাথমিক কাঠামো যাচাই-বাছাই করতে রোববার (১২ জুলাই) থেকে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী মূল্যায়ন কার্যক্রম। বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন শেষে চূড়ান্ত করা হবে চারটি নতুন পাঠ্যবই।
আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক স্তরের চতুর্থ শ্রেণি এবং মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন চারটি পাঠ্যবই। নতুন রূপরেখা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ, লোকজ সংস্কৃতি ও বাস্তবমুখী কারিগরি দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে ৩৫টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে এই বইগুলো। বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত পরিমার্জন শেষে বইগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের কয়েকজন শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল চারটি বইয়ের প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেছে। এর মধ্যে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তার সঙ্গে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান, অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ, সহযোগী অধ্যাপক ড. নূর-ই-আলম সিদ্দিকী এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের মহাপরিচালক ড. মো. আব্দুল আজিজ।
তবে এই কাঠামোই চূড়ান্ত নয়। বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতামত, আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়বস্তু আরও পরিমার্জন ও সময়োপযোগী করা হতে পারে।
চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইয়ে থাকছে ১৩ অধ্যায়
এখন পর্যন্ত দাঁড়ানো কাঠামো অনুযায়ী চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটিতে মোট ১৩টি অধ্যায় রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার গুরুত্ব, নিয়মকানুন, কৌশল, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে পরিচিত করানো এই বইয়ের মূল লক্ষ্য।
বইটির অধ্যায়গুলো হলো— খেলাধুলার গুরুত্ব ও উপকারিতা, শরীরচর্চা ও ব্যায়াম, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস (দৌড় ও লাফ), সাঁতার, মার্শাল আর্ট, খেলাধুলা ও মানসিক প্রশান্তি, খেলাধুলায় দুর্ঘটনা ও প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নতুন কুঁড়ি ক্রীড়া।
প্রতিটি অধ্যায়ে সংশ্লিষ্ট খেলার মৌলিক ধারণা, নিয়ম, কৌশল, অনুশীলন এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে। খেলাধুলার মাধ্যমে দলগত মনোভাব, আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলা তৈরির বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে থাকছে ১০ অধ্যায়
চতুর্থ শ্রেণির আরেকটি নতুন বই হতে যাচ্ছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’। বাংলাদেশের ভাষা, ঐতিহ্য, জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে বইটিতে ১০টি অধ্যায় রাখা হয়েছে।
অধ্যায়গুলো হলো— আমি ও আমার সংস্কৃতি, পরিবার ও সামাজিক মূল্যবোধ, ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি, উৎসব ও ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি, শিল্প-সংস্কৃতি, বাংলাদেশের খাবার সংস্কৃতি, পোশাক ও অলংকার, বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি ও সংস্কৃতি।
এই বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, দেশের ঐতিহ্য, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনধারা এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণা সম্পর্কে জানতে পারবে।
‘আনন্দময় শিখন’ বইয়ে থাকবে ইতিবাচক জীবনচর্চার পাঠ
ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য প্রস্তাবিত ‘আনন্দময় শিখন’ বইটি শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক মানসিকতা, সুস্থ জীবনচর্চা ও আনন্দময় শেখার অভিজ্ঞতা তৈরিতে গুরুত্ব দেবে।
সাতটি অধ্যায়ে সাজানো এই বইয়ের বিষয়গুলো হলো— ব্যায়াম করা, শরীরের যত্ন নেওয়া, বিনয়ী হওয়া, প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে থাকা, পৃথিবীকে উপভোগ করা, কৃতজ্ঞ হওয়া এবং সুখী হওয়ার উপায়।
বইটিতে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং ব্যবহারিক কাজ ও শেখার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তোলার বিষয় রাখা হয়েছে। পড়াশোনাকে আনন্দময় ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার লক্ষ্যেই এই বইটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ে দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হতে যাওয়া আরেকটি নতুন বই ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’। সাধারণ শিক্ষার স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের কাছে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করা এই বইয়ের প্রধান উদ্দেশ্য।
জন কেলারের ১৯৮৩ সালের ‘এআরসিএস-পি’ প্রেরণা মডেল অনুসরণ করে বইটির কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই মডেলের মূল বিষয় হলো— মনোযোগ, প্রাসঙ্গিকতা, আত্মবিশ্বাস, সন্তুষ্টি ও উদ্দেশ্য।
পাঁচটি অধ্যায়ে সাজানো এই বইয়ের বিষয়গুলো হলো— দক্ষ মানুষের ওপর নির্ভরশীলতা (মনোযোগ আকর্ষণ), কারিগরি দক্ষতায় সহজতর জীবন (প্রাসঙ্গিকতা), নিরাপদ দক্ষতা শেখা (আত্মবিশ্বাস), সমাজ ও জাতির জন্য কারিগরি দক্ষতা (সন্তুষ্টি) এবং কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা (উদ্দেশ্য)।
এই বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব, বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ, বিভিন্ন পেশার সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতি সম্পর্কে ধারণা পাবে।
বদলাচ্ছে শেখার ধরন, গুরুত্ব পাচ্ছে বাস্তব জীবন ও দক্ষতা
নতুন প্রণয়ন করা এসব বই সম্পর্কে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, নতুন পাঠ্যবইগুলো থেকে শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ, নৈতিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতা তৈরিতে এ বইগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আধুনিক যুগের চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কারিগরি দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করাই এসব বই পড়ানোর অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, নতুন পাঠ্যবইয়ের কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে বিষয় বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, শ্রেণিশিক্ষক, শিক্ষা গবেষক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে। প্রথমে প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এরপর বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে তা আরও পরিমার্জন করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পর্যালোচনার মাধ্যমে বইগুলোকে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করা হবে।
ভুলমুক্ত ও প্রাণবন্ত পাঠ্যবই তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : শিক্ষামন্ত্রী
২০২৭ সালের পাঠ্যবই প্রণয়নসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, পাঠ্যবই থেকে অতীতের সব ভুলত্রুটি ও ‘লেগ্যাসি’র আবর্জনা পরিষ্কার করে নতুন প্রজন্মের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত পাঠ্যবই উপহার দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
নতুন ৪ বইয়ের ভ্যালিডেশন প্রোগ্রামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অতীতের ভুল সংশোধন করে বর্তমানের পাঠ্যবইগুলোকে এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যেন তা শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ ও কাগজের মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বইয়ের মলাট ও ভেতরের চিত্রগুলো এমনভাবে নির্বাচন করতে হবে যেন তা শিক্ষার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে। চিত্রগুলো যেন নিজেরাই কথা বলে।
পাঠ্যবই পরিমার্জনে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রতিটি বই নির্ভুল করার লক্ষ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় করা হয়েছে। ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও কারিগরি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সাব-কমিটি পাণ্ডুলিপিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করবে। আমরা অতীতের আবর্জনা নিয়ে সামনে এগোতে চাই না। বিগত দিনের বইগুলোতে বানান ভুলসহ নানা সমস্যা ছিল, এবার আমরা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গ্রুপভিত্তিক মিটিং করেছি। আশা করছি, এবার বইগুলোতে কোনো ভুল থাকবে না এবং কোনো সমালোচনার সুযোগ থাকবে না।
আরএইচটি/এমএন
