রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) পরিচালিত এক তদন্তে এটি উঠে এসেছে।
তদন্তে কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষের নিয়োগকে ‘বিধিসম্মত নয়' বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আনা একাধিক অভিযোগের সত্যতা বা আংশিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, অনিয়মে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ এবং সরকারি কোষাগারে বকেয়া রাজস্ব জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিআইএ-এর চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কলেজটিতে সরেজমিন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। দলের নেতৃত্ব দেন ডিআইএ-এর পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন শিক্ষা পরিদর্শক মো. মকবুলার রহমান, শিক্ষা পরিদর্শক শায়লা শারমিন শুচি এবং অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব।
তদন্ত শেষে প্রণীত প্রতিবেদনে অধ্যক্ষের নিয়োগে অনিয়ম, অভিজ্ঞতা সনদে অসংগতি, আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন, কর্মচারী ছাঁটাই, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় এবং অনৈতিক ঘটনার অভিযোগসহ নানা বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে কলেজটির বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করলেও তার অভিজ্ঞতা সনদ যাচাইয়ে গুরুতর অসংগতি ধরা পড়ে। তদন্তে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত একই সময়ে তিনি ময়মনসিংহের ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ অর্থাৎ দুটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন এবং উভয় প্রতিষ্ঠান থেকেই বেতন বা অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেন।
অথচ সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী একই সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা সম্পূর্ণ বেআইনি। এছাড়া পরবর্তীকালে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সময় তিনি পূর্ববর্তী কর্মস্থলের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রও দাখিল করেননি। এসব কারণে তদন্ত দল মন্তব্য করেছে, তার আবেদন শুরুতেই বাতিলযোগ্য ছিল এবং তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বিধিবহির্ভূত হয়েছে। এ বিষয়ে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্রে তদন্তে উঠে এসেছে ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্র পরিচালনার স্থান থেকে উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। তদন্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক পরীক্ষার সম্মানী থেকে ৮ লাখ ৮১ হাজার ২২৪ টাকা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার সম্মানী থেকে আরও ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৫০ টাকা কর কর্তন না করায় মোট ১২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৭৪ টাকা সরকারি রাজস্ব হিসেবে বকেয়া রয়েছে।
আর্থিক অনিয়মেও বড় চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরীক্ষার সম্মানী ও বিভিন্ন খাত থেকে অন্তত ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকার কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত বেতন দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, কেনাকাটা ও ভ্যাট সংক্রান্ত লেনদেনেও প্রয়োজনীয় কর কর্তন না করায় আরও উল্লেখযোগ্য অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তদন্ত দল এসব অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
প্রতিবেদনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে অতিরিক্ত মূল বেতন গ্রহণ করতে পারেন না। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কলেজ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অতিরিক্ত বেতন হিসেবে মোট ১ কোটি ৯৮ লাখ ৪৫ হাজার ৪৪১ টাকা প্রদান করা হয়েছে। তদন্ত দল এই অর্থ প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ফেরত আনার সুপারিশ করেছে।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত দল। সরকারি নীতিমালায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ও সেশন ফি সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া নীতিমালায় অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও দৈনিক পত্রিকা, কলেজ প্রতীক, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, টিউটোরিয়াল ও অনলাইন ফি’সহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত ফি’র বাইরেও রেজিস্ট্রেশন ও কেন্দ্র ফি আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কলেজের নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির ঘটনায়ও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. আনোয়ার হোসেন ও মো. কেরামত আলী মোল্লার কাছ থেকে কৌশলে স্বাক্ষর নিয়ে তাদের পদত্যাগ দেখিয়ে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা তদন্ত কমিটির কাছে লিখিতভাবে দাবি করেন, তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি বরং তাদের অজ্ঞাতসারে স্বাক্ষর ব্যবহার করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তদন্ত দল অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তাদের পুনর্বহাল এবং বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের সুপারিশ করেছে। এছাড়া এক অস্থায়ী ল্যাব সহকারী অভিযোগ করেছেন, এমপিওভুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে তার কাছে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয় এবং অর্থ না দেওয়ায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
কলেজের কয়েকজন সাবেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগের বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রভাষক মো. উজ্জ্বল আলীর বিরুদ্ধে একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগের পর তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া শুরু হলে তিনি পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বরখাস্তকৃত প্রভাষক মো. হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরবর্তী সময়ে বিয়ে এবং তালাকের ঘটনা ঘটেছে। তদন্ত দল অডিও রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
ডিআইএ সুপারিশ করেছে, বর্তমান অধ্যক্ষের নিয়োগ পুনর্বিবেচনা, অবৈধভাবে আদায় ও ব্যয় করা অর্থ উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মচারীদের পুনর্বহাল, বকেয়া রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার। তদন্ত প্রতিবেদন শিগগিরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা যায়, ২০১৮ সালে কেনা কলেজের মাইক্রোবাসটি দীর্ঘ সাত বছর কোনো লগবই ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে। এই সময়ে জ্বালানি ও সার্ভিসিং বাবদ প্রায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও গাড়ির ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়নি। তদন্ত দল মন্তব্য করেছে, লগবই না থাকায় গাড়িটি ব্যক্তিগত বা অননুমোদিত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
এছাড়া তদন্তে কলেজের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়ও একাধিক দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত স্টক টেকিং কমিটি নেই, ফাইল রেজিস্টার, ক্যাশ বুক, চেক রেজিস্টার ও ডেসপ্যাচ রেজিস্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। এইচএসসি ও ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত নয়, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা নেই, অভিভাবক সভা নিয়মিত হয় না এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও সন্তোষজনক নয়।
এসবের ভিত্তিতে ডিআইএ তাদের প্রতিবেদনে কলেজটির বর্তমান অধ্যক্ষের নিয়োগ পুনর্বিবেচনা, অবৈধভাবে আদায় ও ব্যয় করা অর্থ উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত কর্মচারীদের পুনর্বহাল, বকেয়া রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন যাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সততা, স্বচ্ছতা ও সুশাসন বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক প্রফেসর এম. এম. সহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও সুশাসন বজায় রাখা আমাদের মূল লক্ষ্য। সরকারি আইন ও নীতিমালা লঙ্ঘন করে কোনো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি টাকার সঠিক হিসাব রাখা আবশ্যক।
কলেজটিতে উঠে আসা অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা (ডিআইএ) প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। সেখান থেকে বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আরএইচটি/বিআরইউ
