চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা মাদরাসার সংখ্যা কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ। বিপরীতে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি এমন মাদরাসার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৭৬ শতাংশ। শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল নয়, সার্বিক ফলাফলেও হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
এ বছর দাখিল পরীক্ষায় ১ লাখ ৩২ হাজার ১৮৫ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছে ১৪১ জনকে।
গত বছর শূন্য পাসের মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৮২টি। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৬টিতে। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৪৪টি বা প্রায় ১৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাসের মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ হয়েছে। এছাড়া ১০ শতাংশের নিচে পাসের হার থাকা মাদরাসার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৬টিতে।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে শতভাগ পাস করা মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৪১০টি। চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৮টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান কমেছে ৩২২টি। শতাংশের হিসাবে এই পতন প্রায় ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, গত বছর শূন্য পাসের মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৮২টি। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৬টিতে। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ১৪৪টি বা প্রায় ১৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাসের মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ হয়েছে।
এছাড়া ১০ শতাংশের নিচে পাসের হার থাকা মাদরাসার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৬টিতে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সার্বিক ফলাফলও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ বছর দাখিল পরীক্ষায় ১ লাখ ৩২ হাজার ১৮৫ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছে।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শাখায় ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪০ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। এর মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত হয় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫৬ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০৬ জন। এ শাখায় পাসের হার ৫৪ দশমিক ২২ শতাংশ। সাধারণ শাখায় ছাত্রীদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ছাত্রদের ৫০ দশমিক ১১ শতাংশ।
বিজ্ঞান শাখায় ২৬ হাজার ৩০ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এ শাখায় পাসের হার ৬৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ছাত্রীদের পাসের হার ৬৬ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং ছাত্রদের ৬১ দশমিক ১৭ শতাংশ।
মুজাব্বিদ শাখায় ৫৪৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৫৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। হিফযুল কোরআন শাখায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল আরও কম।
সব শাখা মিলিয়ে চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৭ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত ছিল। পরীক্ষায় উপস্থিত হয় ২ লাখ ৯৬ হাজার ১৮২ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৭৯৭ জন। সার্বিক পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন
এবার দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৭১৬ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ৩ হাজার ৫৭২ জন এবং ছাত্রী ৩ হাজার ১৪৪ জন। মোট উপস্থিত পরীক্ষার্থীর তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়ার হার ২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিপিএ-৪ পেয়েছে ৩৩ হাজার ৩৩৬ জন শিক্ষার্থী। জিপিএ ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৯৯ পেয়েছে ৩৪ হাজার ৪২২ জন। জিপিএ ৩ থেকে ৩ দশমিক ৪৯-এর মধ্যে ফল করেছে ৪১ হাজার ৬২৫ জন। এছাড়া সর্বনিম্ন ধাপে জিপিএ-১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ১ হাজার ৫৩৬ জন শিক্ষার্থী।
জেলাভিত্তিক ফলেও বড় বৈষম্য
দাখিলের ফলে জেলাভিত্তিক বড় ধরনের বৈষম্যও দেখা গেছে। পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা জেলা। এ জেলায় পাসের হার ৮৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম পাসের হার সিরাজগঞ্জে—৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। ঢাকা জেলায় ৮ হাজার ৭১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ হাজার ৭১৮ জন পাস করেছে। এ জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ৪৬০ জন।
পাসের হারে ঢাকার পর রয়েছে কক্সবাজার, ফেনী ও চট্টগ্রাম। কক্সবাজারে পাসের হার ৭৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ, ফেনীতে ৭৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৭১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
চট্টগ্রামে ১২ হাজার ৪৯৯ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। এ জেলায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯২৭ জন। খুলনায় পাসের হার ৬২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এছাড়া সিলেটে পাসের হার ৫৯ দশমিক ২২ শতাংশ এবং কুমিল্লায় ৫৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, ফলের তলানিতে রয়েছে সিরাজগঞ্জ। এ জেলায় পাসের হার ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ। পাস করেছে ১ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থী। বরগুনায় পাসের হার ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ঝালকাঠিতে ৩৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ। রাজশাহীতে পাসের হার ৩৯ দশমিক ১০ শতাংশ, রংপুরে ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৪৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং কুড়িগ্রামে ৪৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
পাহাড়ি তিন জেলার মধ্যে বান্দরবানে পাসের হার ৫১ দশমিক ৬৮ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে ৫২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং রাঙামাটিতে ৬০ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
ফল বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখবে বোর্ড : চেয়ারম্যান
দাখিলে ফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র এক থেকে দেড় মাস হয়েছে। ফলে আগের বছরের পরীক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এবারের তুলনামূলক চিত্র পুরোপুরি বিশ্লেষণের সুযোগ এখনও হয়নি।
তিনি বলেন, এবার পরীক্ষার ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আগে অনেক মাদরাসা নিজ নিজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিত। এবার দাখিল ও আলিম পরীক্ষার্থীদের অন্য কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানে আগে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে এবার সেটার সুযোগ কমেছে।
বোর্ড চেয়ারম্যান আরও বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। সার্বিক পরীক্ষাব্যবস্থাপনাও আগের তুলনায় ভালো হয়েছে। ফলে পরীক্ষার পরিবেশ আরও নিয়ন্ত্রিত ছিল। এর একটা প্রভাব ফলাফলে পড়তে পারে। তবে ফল কেন এতটা খারাপ হয়েছে, সেটা আমাদের ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
ফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, এবার আমাদের বোর্ডের অধীনে প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। আমরা এসব প্রতিষ্ঠানকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করার পরিকল্পনা করছি। কেন এমন ফল হলো, প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার পরিবেশ কেমন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম কেমন এবং অ্যাকাডেমিক মান কী অবস্থায়—এসব বিষয় জানতে চাই।
এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হবে জানিয়ে অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করবে না এটা অবশ্যই প্রশ্নের বিষয়। ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও কার্যক্রম কেমন, সেটি দেখতে হবে। এমপিওভুক্তির বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে।
বোর্ড চেয়ারম্যান আরও বলেন, সারা দেশে আমাদের মনিটরিং আরও বাড়ানো হবে। কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে, কেন ফলাফল খারাপ হচ্ছে এবং কীভাবে লেখাপড়ার মান উন্নত করা যায় এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করা হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো মাদরাসা শিক্ষার মান আরও উন্নত করা।
এজন্য খুব দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরএইচটি/এমএন
