বিজ্ঞাপন

মা-বাবার স্বপ্ন মেয়ে ডাক্তার হবে

দারিদ্র্যকে হারিয়ে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেল সীতাকুণ্ডের অদম্য পারজানা

দারিদ্র্যকে হারিয়ে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেল সীতাকুণ্ডের অদম্য পারজানা

ফল প্রকাশের দিনটিতে বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অজানা শঙ্কা ছিল পারজানা আক্তারের। পাস করবে এ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু মেধার স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘গোল্ডেন জিপিএ-৫’ কি সত্যিই ধরা দেবে? উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার সেই মুহূর্তে শিক্ষকের পাঠানো ফলাফলের শিট হাতে পেয়ে যেন থমকে গেল সে। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না পারজানা।

পরে বিস্তারিত ফলাফল দেখার পর যখন নিশ্চিত হলো, হ্যাঁ, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে, সে তখন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। আনন্দে ছলছল করে ওঠে চোখ। সেই অশ্রু ছিল দীর্ঘদিনের কষ্ট, না-পাওয়ার বেদনা আর নিরলস পরিশ্রম শেষে পাওয়া সাফল্যের আনন্দাশ্রু।

সীতাকুণ্ডের দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেয়ে পারজানা আক্তারের গল্পটা তাই শুধু ভালো ফল করার গল্প নয়, এটি অভাবকে হারিয়ে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থী পারজানা সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার প্রতি তার ছিল গভীর মনোযোগ। অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিল সে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিল তার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তবে এই সাফল্যের পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।

দরিদ্র কৃষক বাবা নুরুল ইসলাম ও মা খতিজা বেগমের সংসারে বেড়ে উঠেছে পারজানা। অভাব-অনটন ছিল তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। মেয়ের স্কুলের মাসিক বেতন পরিশোধ করতেও অনেক সময় বাবাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। সংসারের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে নামিদামি কোচিং কিংবা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ পারজানার জন্য ছিল অনেকটাই বিলাসিতা। কিন্তু স্বপ্নের কাছে অভাবকে হার মানতে দেয়নি সে।

নবম শ্রেণিতে ওঠার পর বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে কিছুটা ভয় কাজ করছিল পারজানার মনে। তখন বড় ভাইয়ের উৎসাহেই বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয় সে। একটি গণমাধ্যমে সামান্য বেতনে চাকরি করা সাংবাদিক বড় ভাইটিই হয়ে ওঠেন তার পড়াশোনার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা।

কোচিং বা প্রাইভেটের বিকল্প হিসেবে পারজানা বেছে নেয় নিজের অধ্যবসায়কে। দিন-রাত এক করে বাড়িতে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে ছুটে গেছে শিক্ষকদের কাছে। শিক্ষকরাও তাকে নিরাশ করেননি।

ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনোটিই তাকে নিয়মিত ক্লাস করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। ক্লাসের পড়া মন দিয়ে লিখে নিয়ে অনেক সময় পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরত সে। একদিকে সংসারের অভাব, অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন পড়াশোনা সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেছে পারজানা।

সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রাব্বানি বলেন, পারজানা ছিল ক্লাসের অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিয়মিত শিক্ষার্থী। পড়ালেখার প্রতি আন্তরিকতা এবং শিষ্টাচারের কারণে শিক্ষক ও সহপাঠী সবারই প্রিয় ছিল সে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিদারুল আলম বলেন, ক্লাসে মনোযোগী হওয়া এবং শিক্ষকদের কথা মেনে চললে ভালো ফলাফল করা সম্ভব। আমাদের ছাত্রী পারজানা আক্তার তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আমি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।

পারজানার সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি তার বাবা-মা। মেয়ের ফলাফলে আনন্দিত নুরুল ইসলাম ও খতিজা বেগমের চোখে-মুখে এখন তৃপ্তির ছাপ। এতদিনের অভাব-অনটন, মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে নানা কষ্ট— সবকিছু যেন মুহূর্তেই সার্থক হয়ে উঠেছে তাদের কাছে।

পারজানার মা-বাবার স্বপ্নও খুব বড়। তাদের মেয়ে ভবিষ্যতে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক হবে। শুধু নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়, সমাজের অবহেলিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

পারজানা বলেন, তার স্বপ্ন একজন চিকিৎসক হওয়া। মানুষের সেবা করতে চায় সে। বাবা-মা যে কষ্ট করে তাকে পড়াশোনা করিয়েছেন, সেই কষ্টের প্রতিদান দিতে চায় নিজের সাফল্যের মধ্য দিয়ে।

গোল্ডেন জিপিএ-৫ হাতে পাওয়ার পর পারজানার সামনে এখন নতুন পথ। পথটি হয়ত আগের চেয়ে আরও কঠিন।

এমআর/এসএএস

বিজ্ঞাপন