বিজ্ঞাপন

সাক্ষরতার আলোয় ‘ডিজিটাল অন্ধকার’, ফরম পূরণেও অন্যের দ্বারস্থ মানুষ

সাক্ষরতার আলোয় ‘ডিজিটাল অন্ধকার’, ফরম পূরণেও অন্যের দ্বারস্থ মানুষ

দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের চারজনের মধ্যে তিনজনের বেশি মানুষ পড়তে ও লিখতে পারেন। তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই সক্ষমতার সঙ্গে বাস্তবে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও কম্পিউটার ব্যবহার করেন মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

ডিজিটাল দক্ষতার এই ব্যবধানের প্রভাব পড়ছে নাগরিক সেবা গ্রহণেও। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরযান নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবার আবেদন ও প্রক্রিয়ার বড় অংশ অনলাইনে হওয়ায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি থাকা মানুষকে অন্যের সহায়তা নিতে হচ্ছে। রাজধানীর আগারগাঁওসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে অনলাইন ফরম পূরণের জন্য কম্পিউটারের দোকানে মানুষের উপস্থিতি এরই একটি দৃশ্যমান চিত্র।

সম্প্রতি আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অনলাইন আবেদন করাতে কম্পিউটারের দোকানে ভিড় করছেন আবেদনকারীরা। কেউ নতুন পাসপোর্টের আবেদন, কেউ তথ্য সংশোধন আবার কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড ও অনলাইন পেমেন্টের কাজ করাতে এসেছেন। আবেদনকারীদের একটি অংশ নিজেরাই এসব ধাপ সম্পন্ন করতে না পারায় দোকানের কর্মীদের সহায়তা নিচ্ছেন।

পাসপোর্ট অফিসের মতো একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) বিভিন্ন কার্যালয়ের আশপাশেও। ড্রাইভিং লাইসেন্স, মোটরযান নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবার আবেদন অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়। কিন্তু আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অনেক নাগরিককে তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিতে হচ্ছে।

অনলাইন সেবা ব্যবহারে শুধু ইন্টারনেট সংযোগ থাকাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট খুঁজে বের করা, অ্যাকাউন্ট তৈরি, তথ্য পূরণ, ছবি ও প্রয়োজনীয় নথির ডিজিটাল কপি তৈরি, ফাইল আপলোড, অনলাইন পেমেন্ট এবং আবেদনসংক্রান্ত পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন করার মতো একাধিক দক্ষতা প্রয়োজন। কম্পিউটার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা না থাকলে এসব ধাপ অনেকের জন্য জটিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মোবাইল ব্যবহার বেশি, কম্পিউটার ব্যবহার কম

বিবিএসের ‘আইসিটি অ্যাক্সেস অ্যান্ড ইউজ বাই হাউসহোল্ডস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস সার্ভে ২০২৪-২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হার ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের মালিকানার হার ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ। একই জরিপে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার পাওয়া গেছে ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

অন্যদিকে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর হার মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের তুলনায় কম্পিউটারভিত্তিক দক্ষতা ও ব্যবহারের পরিধি অনেক কম।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সরকারি চাকরি-সংক্রান্ত তথ্য খুঁজেছেন। খেলাধুলা-সংক্রান্ত তথ্য খুঁজেছেন ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ। অনলাইনে পণ্য বা সেবা কেনার হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।

মৌলিক ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রেও ব্যবহারকারীদের সক্ষমতার পার্থক্য রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কপি-পেস্ট করতে পারেন। তবে কম্পিউটার ব্যবহারের সামগ্রিক হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ হওয়ায় বোঝা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও কম্পিউটারভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।

শহর-গ্রামে ইন্টারনেট ব্যবহারে ৩২.১ শতাংশীয় পয়েন্ট ব্যবধান

ডিজিটাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। দুই এলাকার ব্যবধান ৩২ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট।

ডিজিটাল ব্যবহারের এই ব্যবধানের সঙ্গে ডিভাইসের প্রাপ্যতা, অবকাঠামো, ইন্টারনেটের ব্যয় এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার বিষয়গুলোও সম্পর্কিত। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা, চাকরি, তথ্য ও সরকারি সেবা ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

বিবিএসের জরিপে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যয়কেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে পাওয়া গেছে। ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা ইন্টারনেট ব্যবহারে উচ্চ খরচকে অনাগ্রহের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইন্টারনেটের দাম সস্তা করতে হবে : বিটিআরসি চেয়ারম্যান্যান

ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী।

সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের জন্য ইন্টারনেটের দাম আরও কমিয়ে আনতে হবে। ইন্টারনেটের দাম জলের মতো সস্তা করতে হবে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে ইন্টারনেট শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতের কার্যক্রমের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। তাই শুধু ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণ নয়, উচ্চগতির, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাজারব্যবস্থায় ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারলে সেটিই হবে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির কার্যকর ফল।

সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ

দেশে প্রচলিত সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর এই হার ২০২৩ সালে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এর আগের বছর সাক্ষরতার হার ছিল ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৮০ দশমিক ১ শতাংশ এবং নারীদের ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, সাক্ষরতা শুধু পড়তে, লিখতে ও গণনা করতে পারার মৌলিক সক্ষমতা নয়। মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গেও সাক্ষরতার সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি বলেন, এখনো বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের একটি অংশ কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে।

সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

দক্ষতার সঙ্গে সাক্ষরতা যুক্ত করার উদ্যোগ 

জানা গেছে, সরকারের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে সাক্ষরতার সঙ্গে কর্মদক্ষতা যুক্ত করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যালয়বহির্ভূত কিশোর-কিশোরীদের জন্য ‘স্কিল ফোকাসড লিটারেসি ফর আউট অব স্কুল অ্যাডোলেসেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় মৌলিক সাক্ষরতা, গণনা দক্ষতা ও প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৮২৫ জন কিশোর-কিশোরীকে ১৩টি অকুপেশনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া দেশের ৫৮ জেলার সদর উপজেলায় কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে ৪ হাজার ৪৪০ জন ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীকে এ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।

সরকারি পরিকল্পনায় ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যালয়বহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা ও দক্ষতার আওতায় আনার বিভিন্ন কর্মসূচিও রয়েছে।

ডিজিটাল স্কিলও জীবনদক্ষতার অংশ : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য

বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল স্কিলও জীবনদক্ষতাও অংশ বলে মনে করছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, সাক্ষরতার কার্যক্রমকে শুধু পড়া ও লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। নিরক্ষরতা দূর করার পাশাপাশি কিশোর-কিশোরী, প্রাপ্তবয়স্ক ও অন্যান্য বয়সী জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক শিক্ষা, ভাষা দক্ষতা ও জীবনদক্ষতার সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতাও যুক্ত করতে হবে।

ড. জিন্নাহ বলেন, বর্তমান এআই বিপ্লবের সময়ে ডিজিটাল দক্ষতা মানুষের প্রয়োজনীয় সক্ষমতার অংশ হয়ে উঠেছে। তাই সাক্ষরতা বৃদ্ধির জন্য এক দিনের কর্মসূচির পরিবর্তে পাঁচ বছর মেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শিক্ষার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে কর্মসূচিতে যুক্ত করতে পরিবারকে সহায়তা, আয়-উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতার মতো বহুমাত্রিক উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

আরএইচটি/এসএম