বিজ্ঞাপন

ক্যামেরা যখন সীমা ছাড়ায়

নায়িকাদের অস্বস্তিতে ফেলছে ‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও’

নায়িকাদের অস্বস্তিতে ফেলছে ‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও’

একটা সময় ছিল যখন সংবাদপত্রের বিনোদন পাতা মানেই ছিল প্রিয় তারকাদের নতুন কাজের খবর, তাদের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট কিংবা পর্দার পেছনের নানা গল্প। পাঠকদের কাছে বিনোদন সাংবাদিকতা ছিল সুস্থ গসিপিং কিংবা তাদের জীবনের কথন। কিন্তু ইন্টারনেটের যুগে বিনোদন সাংবাদিকতার সেই দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গেছে। সুস্থ বিনোদন প্রকাশের পরিবর্তে এখন ফুটে উঠছে তারকাদের নিয়ে এক বিকৃত চর্চা।

সামাজিক মাধ্যমে আমরা যখন রিলস বা ছোট ভিডিওগুলো দেখি, তখন বিনোদন অঙ্গনের অনেক ভিডিও আমাদের সামনে আসে। হতাশাজনক বিষয় হলো, সেসব ভিডিওর বড় একটি অংশে এখন আর সুস্থ বিনোদন মেলে না; বরং সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভিডিও ধারণকারীদের এক ধরনের কুরুচিপূর্ণ উদ্দেশ্য।

কেন এই অস্বস্তি?

লাল গালিচা কিংবা কোনো শোরুম উদ্বোধন, সবখানেই এখন উৎসুক জনতার ভিড়। প্রিয় কোনো তারকাকে একনজর দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এই ভিড়ের সৃষ্টি। সেখানে পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি উপস্থিত থাকছেন একদল তথাকথিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, যাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধারণের চেয়ে আলাদা এবং অশোভন। বর্তমান সময়ে যাকে বলা হচ্ছে ‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও’র বিকৃত চর্চা। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ভিডিও ধারণ করার সময় লেন্সের অবস্থান তারকাদের চোখের উচ্চতায় না রেখে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওপর থেকে ধরা হয়। মূলত তারকাদের পোশাকের আড়ালে স্পর্শকাতর অংশগুলোকে ফ্রেমবন্দি করে আলাদা অডিয়েন্স তৈরি করা এবং ভিউয়ের মাধ্যমে বাণিজ্য করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

সরেজমিনে এমন দৃশ্যের দেখা মিলছে অহরহ। এখন বিনোদনভিত্তিক ইভেন্টগুলোতে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে অপেশাদার ইউটিউবার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের উপস্থিতি অনেক বেশি। এসব অনুষ্ঠানে তারকাদের ব্যক্তিগত শালীনতা ও স্বস্তি উপেক্ষা করেই ক্যামেরা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে এমন বিব্রতকর ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক শিল্পী বিতর্কের ভয়ে বিষয়গুলো মুখ বুজে সহ্য করেন, আবার কেউ কেউ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠেন।

থাবায় স্বজনরাও

এই অশোভন চর্চা এখন শুধু নায়িকা-অভিনেত্রীদের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটির শিকার এখন তারকাদের স্বজনেরাও। সম্প্রতি ভাইরাল একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও'র শিকার হতে যাচ্ছিলেন এক চিত্রনায়কের স্ত্রী। একটি ইভেন্টে সাংবাদিকদের সামনে বসে থাকা অবস্থায় ক্যামেরা ধরার অ্যাঙ্গেল দেখে তিনি রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়েন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, তিনি হাত দিয়ে নিজের লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করেন এবং ক্ষুব্ধ হয়ে চিত্রগ্রাহককে বলেন, ‘আপনি ওপর থেকে ক্যামেরাটা নামান।’

শোবিজ অঙ্গনে এটি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে চিত্রনায়িকা পরীমণি, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মান এমনকি তানজিন তিশাও এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন এবং তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারকাদের এমন সচেতন অবস্থান প্রমাণ করে যে, এই অপেশাদার চর্চা এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে।

নেটিজেনদের মধ্যে যারা সচেতন, তারা এই ধরনের ভিডিওগুলোকে এড়িয়ে চলেন। এ বিষয়ে এক নিয়মিত দর্শকের ভাষ্য, আমরা যখন আমাদের প্রিয় তারকাদের ভিডিও দেখতে চাই, তখন অনেক সময় ভিডিওর থাম্বনেইল বা ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল দেখে আমাদেরও লজ্জিত হতে হয়। এগুলো সুস্থ বিনোদন তো নয়ই, বরং সাইবার বুলিংয়েরও একটা অংশ।

ভুক্তভোগী অভিনেত্রীর দীর্ঘশ্বাস

এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়ে ভুক্তভোগী একজন অভিনেত্রীর সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। মুঠো ফোনে তাকে বিষয়টি সম্পর্কে জানাতেই শোনা গেল এক দীর্ঘশ্বাস। সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী তার পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। হতাশার সুরে সেই অভিনেত্রী বলেন, আপনারা এ নিয়ে লেখালেখি করলে আদতে কোনো সমাধান আসবে না। কারণ, এসব প্রতিবেদন কারও মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারবে না, যদি তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এসব করে থাকে। তাদের মানসিকতা এমন, আমাদের যেন ইভেন্টে বোরকা পরে যাওয়া উচিত। আমি নিজে যখন দেখেছি, 'টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও'র শিকার হয়েছি, সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ করেছি। শুধু আমার একার না, সকলেরই এর প্রতিবাদ করা উচিত। একটাই সমাধান, এমন কিছুর শিকার হলে সঙ্গে সঙ্গেই সেই ফোন বা ক্যামেরা ছুড়ে ফেলে দেওয়া। আর এসব যারা করছে, তাদের মধ্যে ইউটিউবার কিংবা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরই বেশি; যারা সাংবাদিকতার নৈতিকতা বা গোপনীয়তা মানছেন না।

সচেতন মহল ও পেশাদারদের উদ্বেগ

নারী শিল্পী বা মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ চর্চা চলছে, তাকে আধুনিক সময়ের এক নীরব ব্যাধি হিসেবে দেখছে সচেতন মহল। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাংবাদিক রাবেয়া খাতুন বলেন, সামাজিক মাধ্যমে নারী মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কটূক্তি করা, অশালীন মন্তব্য লেখা কিংবা তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ও দৃষ্টিকটু  অ্যাঙ্গেলের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে বিদ্রূপ করা এখন যেন অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বিষয়টি এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে, এ নিয়ে প্রতিবাদ জানানোর প্রয়োজনীয়তাও অনেকের মাথায় আসে না। বিভিন্ন পেইজ, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং কিছু ব্যক্তি ভিউ বাড়ানোর আশায় নিয়মিতভাবে এই অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজ করে যাচ্ছে। কারও সম্মতি ছাড়া এভাবে দৃষ্টিকটু অ্যাঙ্গেলে ভিডিও ধারণ বা প্রচার করা শুধু অনৈতিকই নয়, আইনগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। এসব কারণে অভিনেত্রী, মডেলদের সবসময় অতিরিক্ত সামাজিক চাপ ও মানসিক হয়রানির মুখে পড়তে হয়।

প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বিনোদন সাংবাদিকতাকে যেমন এগিয়েছে, তেমনি ‘ভিউ বাণিজ্যের’ অসুস্থ প্রতিযোগিতা এই পেশার নীতি ও নৈতিকতাকে দিনদিন প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিনোদন সাংবাদিক ও গীতিকবি জনি হক বলেন, প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ব্যবহার এগিয়েছে ঠিকই তেমনি শঙ্কার কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের দেশে ভিউ এর বিষয়টা যেমন ইউটিউবাররাও দেখেছে, গণমাধ্যমও তাই দেখছে। কনটেন্ট এর ভিউ বাড়ানোর চেষ্টা করাটা ভুল কিছু নয়, কিন্তু সাংবাদিকতার নীতিমালা কিংবা নৈতিকতা মেনে তা করতে হবে। আমরা যেমন দেখছি, তারকাদের সঙ্গে যে টপ অ্যাঙ্গেল ভিউ বা এভাবে ক্যামেরা তাক করা হচ্ছে, সেটা অবশ্যই আপত্তিকর, যা গ্রহণযোগ্য নয়, আর এটা সাংবাদিকতাও নয়।’

এই সংকট নিরসনে ইভেন্ট আয়োজকদের অব্যবস্থাপনা এবং দায়ও মনে করিয়ে দেন তিনি। জনি হক আরও যোগ করেন, বলিউডের বিভিন্ন ইভেন্টে সাংবাদিক, চিত্রগ্রাহক কিংবা মোবাইল জার্নালিস্টদের জন্য আলাদা আলাদা সারি করা হয়। আমাদের আয়োজকেরা এভাবে আয়োজন করে না। চিত্রগ্রাহকেরা কোথায় থাকবেন, কতটুকু দূরত্বে থাকবেন, সেটার নির্দেশনা দেওয়া হয় না। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন সংবাদপত্রের মতো মেইনস্ট্রিমকে অগ্রাধিকার ও বিভিন্ন ধারার সাংবাদিকদের অবস্থান পৃথক করে আয়োজকদের ইভেন্ট সাজাতে হবে। এর ফলে যেমন ইউটিউবারদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, তেমনি নৈতিকতাহীন কর্মীদের তারকাদের কাছে গায়ে পড়ার প্রবণতাও কমে আসবে।

পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে বিনোদনের ইভেন্ট কাভার করার শিক্ষাটাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

মোবাইল সাংবাদিকতার আড়ালে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ আতঙ্ক

মোবাইল সাংবাদিকতা বা মোজো-র প্রসারে সংবাদ সংগ্রহ দ্রুততর হলেও, এর আড়ালে একদল অপেশাদার কন্টেন্ট ক্রিয়েটর পুরো সাংবাদিকতা পেশাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিষয়টি নিয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ সংবাদপত্রের ডিজিটাল ইনচার্জ মাসুম জয় বলেন, আমরা মেইনস্ট্রিমের ডিজিটালে যারা কাজ করি, তারা সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করে এসে কাজ করছি। তাই আমরা বা আমাদের প্রতিষ্ঠান এমন কোনো কাজ করি না যার জন্য হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। এখন দেখা যাচ্ছে যার কাছে মোবাইল আছে, সে-ই সাংবাদিক! কিন্তু কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও সাংবাদিকদের মধ্যে তো তফাৎ আছে। সে জন্য আমরা ডিজিটাল রিপোর্টারস ফোরাম থেকে কাজ করছি, কীভাবে এই বিষয়গুলো থেকে প্রতিকার পাওয়া যায়।

ভাইরাল হওয়ার নেশা ও প্রতিকারের দাবি

ইভেন্টগুলোতে বিশৃঙ্খলার পেছনে আয়োজকদের ভাইরাল হওয়ার মানসিকতাকে দায়ী করে এই সংবাদকর্মী কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেন। সেই চিত্রনায়কের স্ত্রীর ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইভেন্টের লোকেরাও সাংবাদিক ছাড়াও অতিরিক্ত ইউটিউবারদের আনছেন। কারণ তারাও চায় প্রচার বাড়ুক, ভাইরাল কনটেন্ট হোক। সেই নায়কের স্ত্রীর দিকে যিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ক্যামেরা তুলেছিলেন, তিনি মূলত একজন ইউটিউবার। এই যে প্রতিনিয়ত আমরা মোবাইল জার্নালিস্টরা হ্যারাস হচ্ছি, বিপদে পড়ছি, বাড়তি কথা শুনতে হচ্ছে, অথচ আমরা তো এসব করছি না। সে জন্য আমরা চিন্তা করেছি, তথ্য মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেব এবং এসব অপেশাদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দিব।

‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও’র এই অসুস্থ চর্চা শুধু নারী শিল্পীদের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যই নষ্ট করছে না, বরং কলুষিত করছে সুস্থ বিনোদন সাংবাদিকতার পরিবেশও। দিনশেষে এই সংকট কাটাতে ইউটিউবার কিংবা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের কাণ্ডজ্ঞানের পাশাপাশি আয়োজক এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা একান্ত প্রয়োজন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএ