বিজ্ঞাপন

গ্লোবাল জনরার ‘রকস্টার’

খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসা অন্যরকম শাকিব খান

খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসা অন্যরকম শাকিব খান

ঠিক কবে থেকে সিনেমা দেখা শুরু করেছি মনে নেই। তবে এটুকু মনে আছে শৈশবে আম্মু আমাকে টাকা দিয়েছিলেন ’ভেজা চোখ’ সিনেমাটা দেখতে। যে সিনেমার কোনো কপি বাংলাদেশের কোথাও নেই! সেই গল্পে যাব না। তবে আমি দেখেছি বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উত্থান-পতনের পরে পুনরায় উত্থান। পাশাপাশি দেখেছি বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলো ভেঙে সেখানে বাণিজ্যিক শপিং মল গড়ে তুলতে।

এদিকে নতুন শহরে ভ্রমণের সময় আগে খুঁজি সেখানে কোনো সিনেমা হল আছে কিনা। বিশ্বের যেসব দেশে ভ্রমণ করেছি প্রতিটি দেশের সিনেমা হলে কাজের ফাঁকে সিনেমা দেখেছি। পাড়ায় ভিসিআরে মুভি দেখা, পরীক্ষা শেষে গ্রামে দল বেঁধে ভিসিআর এনে মুভি দেখা, এমনকি ভাড়ার ভিসিআরের টেলিভিশন সেট এনে সেটা ভেঙে ফেলারও ’মহান কীর্তিও’ আমার দ্বারা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ওঠার পর পাশের রুমের এক বড় ভাই নতুন কম্পিউটার কিনলেন। তখন ফ্লপির যুগ। এখনকার মতো টেরাবাইটের হার্ডডিস্ক পাওয়া যেত না। ভিডিও ক্লাব আর মুভি ক্লাব বিলুপ্তি হয়ে ততদিনে সেখানে ভিসিডি ও সিডি প্লেয়ার জায়গা নেওয়া শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট কার্ড দেখিয়ে সিডি ক্লাব থেকে মুভি আনতাম। ওই বড় ভাইয়ের কাজই ছিল কম্পিউটারে গেম খেলা এবং আমাদের সঙ্গে নিয়ে মুভি দেখা।

মাল্টিপ্লেক্সসহ দেশজুড়ে ১০৩ প্রেক্ষাগৃহে ‘রকস্টার’

সিনেমাখোর এই আমার তখন আরও পোয়াবারো। জগতের যত ঘরানার মুভি আছে, নতুন রিলিজ পাওয়া বলিউডের মুভি, উত্তম কুমার থেকে শুরু করে প্রসেনজিৎ-টালিউডের মুভিগুলোও দেখতে থাকলাম। আর ফাঁকে ফাঁকে সিনেমা হলে গিয়ে মুভি দেখা ছিলই। তবে এটা সত্যি কাটপিসের যুগ শুরু হওয়ার পর ইচ্ছে করেই সিনেমা হলমুখী হতাম না। সেটা ধীরে ধীরে আবারও শুরু হয়, যেখানে শাকিব খানেরও কিছু অবদান আছে। গত কয়েক বছর ধরে প্রতি ঈদে শাকিব খানের মুভি রিলিজ পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে শাকিব খান যেন পরিচালকদের কাছে নিশ্চিন্ত সোনার ডিম পাড়া হাঁস হয়ে এসেছেন।

তাই তো প্রতি ঈদে ‘প্রিয়তমা’, ‘রাজকুমার’, ‘বরবাদ’, ‘তাণ্ডব’, ‘প্রিন্সে’র মতো সিনেমা দর্শক দেখছেন। কিন্তু এবারের ঈদুল আজহায় শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’ সিনেমা নিয়ে যে নেতিবাচক সমালোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে, টেলিভিশনের পর্দায় দর্শকদের যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, তা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না আমার! ঈদের দ্বিতীয় দিনে তাই সিনেপ্লেক্সে বসে দেখে নিলাম ‘রকস্টার’।

শাকিবের ‘রকস্টার’ দেখতে পারবে সবাই

সত্যি বলতে, থিম বা ঘরানার মিল থাকা মানেই সিনেমাটি 'কপি' বা নকল করা হয়েছে এমনটি ঢালাওভাবে আপনি বলতে পারেন না। প্রথমত শাকিব খানের 'রকস্টার' মূলত একটি নির্দিষ্ট জনরা বা ঘরানার সিনেমা, কোনো নির্দিষ্ট মুভির ফ্রেম-টু-ফ্রেম কপি নয়। বলা যেতে পারে একটি 'গ্লোবাল জনরা'। বিশ্বের যেকোনো দেশের মিউজিশিয়ান বা রকস্টারদের জীবন নিয়ে সিনেমা বানালে কিছু কমন উপাদান বা 'ট্রেডমার্ক' চলে আসে।

এই যেমন জাঁকজমকপূর্ণ কনসার্ট, খ্যাতির চূড়ায় ওঠা, একাকীত্ব বা ডিপ্রেশন, মদের আসক্তি বা ড্রাগ ট্রমা এবং একটি ট্র্যাজিক প্রেমের গল্প। হলিউডের 'এ স্টার ইজ বর্ন' এবং বলিউডের 'আশিকী ২' সিনেমার মধ্যেও এই একই মিলগুলো রয়েছে। তাই একে কপি না বলে একই ঘরানার ফর্মুলা বলা বেশি যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এই সিনেমার মৌলিকতা রয়েছে উপস্থাপনে।

যদিও গল্পে একজন শিল্পীর উত্থান-পতনের চিরচেনা রূপটি দেখানো হয়েছে, তবে পরিচালক আজমান রুশোর মেকিং এবং সংলাপে আমাদের দেশীয় মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতা এবং বাস্তব জীবনের কয়েকজন বাংলাদেশি রকস্টারের স্ট্রাগলের ছায়া রাখার চেষ্টা করেছেন। ফলে এর আবেগ এবং পরিবেশ একেবারেই বাংলাদেশি।

অনেকে রণবীর কাপুরের 'রকস্টার' বা 'আশিকী ২'-এর সঙ্গে তুলনা করে ট্রোল করার চেষ্টা করলেও, আমি বলব সিনেমাটির নিজস্ব একটি আলাদা ভাইব এবং 'র অ্যানিমেশন' রয়েছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের প্রেজেন্টেশন এবং শাকিব খানের একদম নতুন এক্সপেরিমেন্টাল লুকের কারণে এটা স্বাধীন এবং ফ্রেশ প্রচেষ্টা হিসেবেই প্রশংসা পাচ্ছে।

শাকিব খান মানেই যেখানে প্রেম, বিচ্ছেদ, অ্যাকশন, সফলতার একটা ছাঁচে ফেলে সিনেমা বানানোর চেষ্টা, সেই চিরায়ত ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছেন পরিচালক রুশো। ছবিটা যেহেতু একজন রকস্টারের জীবন নিয়ে, তাই গান বেশি থাকবে মুভিতে এটাই স্বাভাবিক। আমার কাছে মুভির প্রতিটি গানই উপভোগ্য লেগেছে।

সিনেমাটিতে অবিশ্বাস্যভাবে প্রভাব রেখেছেন আহমেদ হাসান সানি। সিনেমাটিতে ব্যবহার করা প্রায় আটটি গানের প্রত্যেকটির পেছনেই ছিলেন তিনি। বেশিরভাগ গানে কণ্ঠও দিয়েছেন সানি। আহমেদ হাসান সানির অনবদ্য কণ্ঠের গান, ছবিটিকে সত্যিকার অর্থেই নিয়ে যায় এক মিউজিক্যাল মজমায়। অঙ্কন কুমারের গানও শ্রুতিমধুর ছিল।

যদিও ছবির শেষ দিকে এসে গল্পটা হঠাৎ ব্রেক কষে মুখ থুবড়ে পড়েছে। শুধু এটুকু বাস্তবতা বাদ দিলে ক্যামেরার কাজ ছিল অসাধারণ। মনে হচ্ছিল বিদেশি কোনো মুভি দেখতে বসেছি। আমি বলব 'রকস্টার' সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা এর টেকনিক্যাল দিক। সিনেমাটির ক্যামেরা ওয়ার্ক, সিনেমাটোগ্রাফি এবং কালার গ্রেডিং অসাধারণ। মুভিটা মনে হয়েছে চিরাচরিত ঢালিউডের অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা 'লাউড' কালার টোন থেকে বের হয়ে একদম আন্তর্জাতিক ধাঁচের বা গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের লুক দিয়েছে।

মুড অনুযায়ী রঙের ব্যবহার দেখেছি। যখন শাকিব খানের কনসার্ট বা গ্ল্যামার লাইফ দেখানো হয়েছে, তখন নিয়ন, গাঢ় নীল এবং গর্জিয়াস গোল্ডেন ভাইব রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, যখন তার হতাশা, একাকীত্ব ও ট্রমা দেখানো হয়েছে, তখন ফ্রেমগুলোতে কিছুটা ডার্ক, স্যাচুরেটেড, ধূসর ও টিল কালার টোন ব্যবহার করা হয়েছে। ক্যামেরা ওয়ার্ক এবং শটের বৈচিত্র্য ছিল।

ডাইনামিক ছিল কনসার্ট শটস। রকস্টারের লাইভ পারফরম্যান্সের দৃশ্যগুলোতে দুর্দান্ত ক্যামেরা মুভমেন্ট দেখা গেছে। ড্রোন শট, জিব-আর্মের সুইফ্ট মুভমেন্ট এবং ফ্রেমের দ্রুত পরিবর্তন দর্শকদের একদম লাইভ কনসার্টের উত্তেজনা এনে দেয়। শাকিব খানের নতুন ড্রেডলকস হেয়ারস্টাইল, ট্যাটু এবং তার চোখের এক্সপ্রেশন বা ইমোশন ধরার জন্য প্রচুর হাই-ডেফিনিশন 'ক্লোজ-আপ' ও 'এক্সট্রিম ক্লোজ-আপ' শট ব্যবহার করা হয়েছে; এটি স্টারের ইমেজের চেয়ে অভিনেতার ভেতরের কষ্টকে স্ক্রিনে বড় করে দেখিয়েছে।

সিনেমার বড় একটি অংশের চিত্রায়ণ হয়েছে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন নয়নকাড়া লোকেশনে। সেখানকার আউটডোর শটগুলো, বিশেষ করে পিচঢালা রাস্তায় শাকিবের আইকনিক পোজ এবং রোমান্টিক দৃশ্যগুলোর ফ্রেমিং ও লাইটিং ছিল দেখার মতো। শাকিব খানের সঙ্গে সাবিলা নূরের ’আমি যাবো হারিয়ে’ গানটা যেমন অসাধারণ ছিল, রয়্যাল এনফিল্ডে দুজনের ঘোরাঘুরির দৃশ্যে যেন খানিক সময়ের জন্য হলেও মনে হচ্ছিল সাবিলা ’রোমান হলিডের’ অড্রে হেপবার্ন, শাকিব খান গ্রেগরি পেক।

সব মিলিয়ে আমি বলব টেকনিক্যাল দিক থেকে আজমান রুশোর 'রকস্টার' ঢালিউডে নতুন বেঞ্চমার্ক তৈরি করেছে। কোনো সিনেমা কারো ভালো নাই লাগতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনা মনের মধ্যেই রাখুন। বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির এখন ওড়ার সময়। দয়া করে এর ডানা কেটে দেবেন না। একে নীল আকাশে মনের মতো উড়তে দিন।

এমআইকে