বাড়ির ছাদে, গাছের ডালে উড়তে শুরু করেছে নানা রঙের পতাকা। দেয়ালে দেয়ালে ফুটে উঠছে গ্রাফিতি আর পতাকার রঙ। কোথাও ব্রাজিলের সবুজ-হলুদের আবহ, কোথাও দুলছে আর্জেন্টিনার নীল-সাদার আবেগ। বোঝার বাকি নেই, চারটি ক্যালেন্ডার বদল হয়ে গেছে। ফের দুয়ারে ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবলে মাইলখানেক পিছিয়ে থাকা দেশ হলেও এমন উন্মাদনা ফিরে আসে বিশ্বকাপেই। আর এই উন্মাদনার অন্যতম সঙ্গী যে গান, সেটা ‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’। সোমালিয়ান-কানাডিয়ান শিল্পী কে’নানের গান এটি।
২০১০ বিশ্বকাপ থেকে এবারের আসর, টানা পাঁচ আসর ধরে বিশ্বকাপ আমেজে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দোলা দিয়ে আসছে এ গান। ওই বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় হয়েছিল বিশ্বকাপ। অফিসিয়াল থিম সং ছিল শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’। সেটি জনপ্রিয়তার আকাশ ছুঁয়েছিল বটে। কিন্তু ‘ক্লাসিক’ হয়ে উঠল আন-অফিসিয়াল গান ‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’। ফুটবলের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনায় গানটি ব্যবহৃত হলেও গানটিতে লুকিয়ে আছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত সোমালিয়া থেকে উঠে আসা এক তরুণের দেশান্তরী হওয়ার ক্ষত। আজ ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনের প্রাক্কালে তাই কালজয়ী সে গানের আদ্যোপান্ত জেনে নেওয়া যাক…

যেভাবে ‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’-এর জন্ম
আসল নাম কেইনান আবদি ওয়ারসেম। গানে পরিচিতি পেয়েছেন কে’নান নামে। ২০০৯ সালে নিজের চতুর্থ অ্যালবাম ‘ট্রুবাডোর’ প্রকাশ করেন তিনি। সে অ্যালবামেরই গান ‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে সোমালিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ লেগেছিল। জীবন বাঁচাতে পরিবারের সঙ্গে মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথমে আমেরিকা, পরে কানাডায় পাড়ি জমান কে’নান। স্বদেশের ভয়াল রূপ, মানুষের দুর্দশা তাকে তাড়িত করেছে।
সেই তাড়না থেকে বাঁধলেন গান। গানটির সংগীত প্রযোজনা করেছিলেন ব্রুনো মার্স ও কেরি ব্রাদার্স জুনিয়র। শুরুতে খুব একটা সাড়া পায়নি এ গান। তবে সে বছর হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। সে দুর্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সংগীত তারকারা। আর হাতিয়ার ছিল এই ‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’। জাস্টিন বিবার, ড্রেকসহ জনপ্রিয় শিল্পীরা মিলে গানটি কাভার করেন। এরপর তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অতঃপর গানটি নজরে আসে কোকা কোলার। তারা ২০১০ বিশ্বকাপ উপলক্ষে গানটির নতুন রিমিক্সড ভার্সন তৈরি করে। নতুন ভার্সনে কথার মধ্যেও আনা হয় কিছু পরিবর্তন। এর ভিডিওতে অংশ নেন শিল্পী নিজেও। ব্যাস, আকাশ ছোঁয়ার গল্পের শুরু এখানেই।

কেন আলাদা ‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’?
২০০৯ সালের গানটি আজও কেন শ্রোতাদের মনে এত গভীরভাবে গেঁথে আছে? উত্তর লুকিয়ে রয়েছে এর কথা ও সুরের গভীরেই। গানটির চিরচেনা ‘ও ও ও ওও’ হামিং আনমনেই দোলা দেয় শ্রোতাদের মনে। ভাষা না বুঝলেও এই সুর সবাইকেই আকৃষ্ট করে। সুরের যে কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই, এ গানটিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আর যখনই গানটিতে ‘গিভ মি ফ্রডম, গিভ মি ফায়ার’ লাইনগুলো বেজে ওঠে, শ্রোতারাও যেন সেই আহ্বানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। হৃদয়ে জাগে অদ্ভুত শিহরণ।
গানের কথাগুলোতে খেলার মাঠের লড়াইকে জীবনের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। খেলা যেমন সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে, এই গানটিও ঠিক সেই বৈশ্বিক একতার বার্তাই পৌঁছে দেয় সবার মাঝে।

শুধু তা-ই নয়, গানের সবচেয়ে আবেগময় অংশ ‘হোয়েন আই গেট ওল্ডার, আই উইল বি স্ট্রংগার’—কথাটির মাধ্যমে শিশু বা একটি নিপীড়িত জাতির ভেতরের লুকিয়ে থাকা স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্নকে ফুটিয়ে তোলে।
কে’নানের ভাবনা
‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন কে’নান। এক সাক্ষাতকারে জানান, গানটি প্রথমে শুধু তার নিজের গান হিসেবে তৈরি করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে এটি হাইতির মানুষের জন্য লড়াকু সব শিল্পীদের যৌথ কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। কে’নানের সাথে জাস্টিন বিবার, ড্রেক, এভ্রিল লাভিনের মতো জনপ্রিয় কানাডিয়ান শিল্পীরা একত্রিত হয়ে এই গানে কণ্ঠ দেন এবং হাইতির দুর্যোগ কবলিত মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

যা বলছেন এ সময়ের শ্রোতারা
বর্তমান সময়ে এসেও গানটি কতটা প্রাসঙ্গিক, তা ইউটিউবের কমেন্ট সেকশনে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের জুন মাসে এসেও হাজার হাজার শ্রোতা এই গানের নিচে মন্তব্য করে হাজিরা দিচ্ছেন। কেউ লিখছেন, ‘১৬ বছর পর ২০২৬ সালের জুনে এখানে কে কে আছেন?’, আবার কেউ মন্তব্য করছেন, ‘ইউটিউব হলো আমাদের কাছে থাকা টাইম মেশিনের সবচেয়ে কাছের একটা রূপ, যা আমাদের সেই সুন্দর অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়’। ভক্তদের এমন মন্তব্য প্রমাণ করে যে, কালজয়ী গান কখনো পুরনো হয় না, বরং সময়ের সাথে সাথে তা আরও বেশি মায়াবী হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত সময়ে এ গান হতে পারে সম্প্রীতির বার্তা
আজকের যুদ্ধবিদ্ধস্ত ও অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এ গানটি শুধু ফুটবল সংগীত নয়, বরং সম্প্রীতি ও শান্তির এক জোরালো বার্তা। গত কয়েক বছরে একের পর এক যুদ্ধ, হিংসা ও ভূ-রাজনৈতিক বৈরিতার সাক্ষী হয়েছে বিশ্ববাসী। এই বৈরি সম্পর্কের মাঝে নেটিজেনদের মন্তব্য আজ পুরো বিশ্ববাসীর মনের কথাকে প্রতিধ্বনিত করেছে, তাদের মন্তব্য এমন—‘২০২৬ সালে এসে এই গানটি বড্ড বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মানুষ হওয়া প্রয়োজন। যুদ্ধ, লোভ, দুর্নীতি আর ক্ষুধা নিপাত যাক।’

সব মিলিয়ে বর্তমান সময়ের শ্রোতাদের মতে, আজকের দিনে মানুষের মুক্ত চেতনা যখন চার দেয়ালে বন্দী, তখন ‘ওয়েভিন’ ফ্ল্যাগ’ মনে করিয়ে দেয়, মিসাইল কিংবা পারমাণবিক অস্ত্র নয়, পৃথিবীর একমাত্র যুদ্ধটা হওয়া উচিত সবুজ ঘাসের মাঠে, যার প্রধান অস্ত্র হবে একটি ‘ফুটবল’ এবং যার সেনাক্যাম্প বা বাঙ্কার হবে স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুম।
ডিএ/কেআই

