২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ বেড়েছে নামমাত্র। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। এর মধ্যে সংস্কৃতি খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ০.০৯ শতাংশ।
দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে মোট বাজেটের অন্তত ২ শতাংশ সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আসছেন সংস্কৃতি কর্মীরা। তবে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রস্তাবিত ৮২৬ কোটি টাকার মধ্যে পরিচালন ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে ৪৮৫ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ৩৪১ কোটি টাকা। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮২৪ কোটি টাকা। সেই তুলনায় নতুন অর্থবছরের মূল বরাদ্দ মাত্র ২ কোটি টাকা বেড়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা পোস্ট; তাতে পাওয়া গেল মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
‘সংস্কৃতিকে একটু অবহেলা করা হয়’
ছায়ানটের সহ-সভাপতি ও একুশে পদকজয়ী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল বলেন, ‘সরকারের বাজেট সংস্কৃতি খাতে সবসময়ই কম থাকে। সংস্কৃতিকে একটু অবহেলা করা হয়। সরকার মনে করে না, এটা আমাদের দেশের জন্য খুব একটা জরুরি কিছু। সব সরকারের বেলায় আমরা এমন দেখেছি। তো এখন এইটা নতুন কিছু না। আমরা আশা করব, এইটা নিয়ে সরকার আবার নতুন করে বিবেচনা করবে।’

খানিকটা আক্ষেপ করেই তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরাই নিজেদের টাকায় চলি। আমাদের নিজেদের যতটুকু ক্ষমতা আছে, সেই দিয়েই আমরা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করি। আসলে সংস্কৃতি একটা দেশের পরিচয়ের একটা প্রধান জায়গা। তবে সরকার আমাদের যত দেবে, আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তত বাড়বে। তো ন্যাচারালি, সব সময়ই আমরা আশা করি সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।’
‘এটি খুবই সংস্কৃতিবান্ধব বাজেট’
সংস্কৃতি খাতের এবারের বাজেট নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘এবারে যে বাজেটটা প্রণীত হলো, সেটি খুবই সংস্কৃতিবান্ধব বাজেট বলে আমি মনে করি। এখানে যে টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটি আমাদের ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, যেটাকে আমরা সৃজনশীল অর্থনীতি বলছি, সেটাকে শক্তিশালী করা এবং সব স্তরের শিল্পী, সাহিত্যিক এদেরকে জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি একটা বড় ভূমিকা রাখবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নতুন বাংলাদেশে যে যাত্রা, সেই যাত্রায় এই যে শিল্পী-সাহিত্যিকদের প্রতি এই সরকারের যে নতুন এবং অসাধারণ সিদ্ধান্ত, সেটি আমাদের আপ্লুত করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আবার নাটকের ক্ষেত্রে, সংগীতের ক্ষেত্রে, লোকসংগীতের ক্ষেত্রে, নৃত্যের ক্ষেত্রে, আবৃত্তির ক্ষেত্রে, চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে, প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এবং চিত্রকলার ক্ষেত্রে সব জায়গাতে এবং নিউ মিডিয়া যেটি নতুন এসছে—এই এই যে একটা দিগন্ত বিস্তৃত যে সংস্কৃতির ভুবন, এই ভুবনকে আরও শক্তিশালী করা, আরও বেশি শক্তিশালী করা, গণমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং নৃগোষ্ঠী সহ আমাদের সমতলের মানুষের সঙ্গে সংস্কৃতির যে একটা ঐকতান তৈরি করে সব মানুষের কাছে সংস্কৃতি দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে, থানা পর্যায়ে সেই কাজটি কিন্তু আমরা করতে পারব।’
শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা যাত্রা শুরু করেছি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং বর্তমান সরকারের যে বাজেট যে প্রণীত হয়েছে, সেটিতে আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা বিশ্বাস করি যে আগামী বছর বাজেটে আরও এই বরাদ্দ বাড়ানো হবে এবং আমাদের কর্মকাণ্ড আরও বেশি বিস্তৃত হবে।’
‘সংস্কৃতির বাজেট হওয়া উচিত ৫ শতাংশ’
নাট্যজন মাসুম রেজা মনে করেন, ‘সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দ আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত ছিল। বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে যে এটি তো আমাদের দীর্ঘদিনের না পাওয়া অপ্রাপ্তি। কারণ একটা দেশের সংস্কৃতির যেই বাজেট সেটি সমগ্র বাজেটের ৫ শতাংশ হওয়া উচিত আমি মনে করি। কারণ একটা দেশের মানুষের রুচি এবং সংস্কৃতি এগুলো গড়ে তোলার জন্য সবচাইতে বেশি শক্তিশালী অর্থনৈতিকভাবে এবং প্রশাসনিকভাবেও যে মন্ত্রণালয় হওয়া উচিত সেটা আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।‘
মাসুম রেজা বলেন, ‘শুধু বাজেট নয়, বাজেটের চাইতেও বড় যে সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও সংস্কৃতির চর্চা যাতে দেশের সংস্কৃতি কর্মীরা চালিয়ে যেতে পারে তার জন্য দরকার খুবই খুবই শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা। সেই জায়গাটাতেও আমি মনে করি হাত দেওয়া উচিত বা প্রথমেই বিবেচনায় আনা উচিত।‘

তিনি বলেন, ‘আর যারা এই বাজেটটি করেছেন তাদের কাছে মনে হয়েছে যে সংস্কৃতি মানে নাচ গান; নাচ গানের জন্য এত পয়সা দেব কেন? তারপরে যে মৌলবাদী ভাবনা এবং মৌলবাদী চাপ যেভাবে আমাদের সরকারের ওপরে চেপে বসে থাকে- সব সরকারের ক্ষেত্রে, আমি শুধুমাত্র এই বিএনপি সরকার বলছি না, বিগত সরকারগুলোতেও দেখা গেছে বিষয়গুলো চেপে বসে থাকা। তারা তো চাইবেই এটাকে নাচ গান হিসেবে প্রতিফলিত করার, নাচ গান হিসেবে চালিয়ে দেওয়া এবং তাতে যত কম টাকা দেওয়া যায়।‘
নন্দিত এ নাট্যকার আরও বলেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাজ কী, এটাই আমাদের কাছে এখনো নির্ধারিত হয়নি, বিগত ৫৪ বছরে এটাই আমরা এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আসল কাজ কী? দেশের যে ঐতিহ্য, দেশের যে লোক শিল্প, সেগুলোর সুরক্ষা ও বিকাশ করা। শিল্প চর্চার মাধ্যমে আমরা আমাদের উদ্দেশ্যটা কী? আমরা কী চাই? মানুষের ভেতরে কী পরিবর্তন চাই? একটি নাটক তো কেবলই নাটক না, সে তো মানুষের ভেতরে মানবিক গুণাবলী গড়ে দেয়, যেন সে সমাজে ভালোভাবে বসবাস করতে পারে। তো সংস্কৃতি চর্চার ভেতরের যে অন্তর্গত অর্থ, সেটা আমরা বুঝতে পারি নাই বলে বাজেটের পরিমাণ কম হয়।‘
তার ভাষায়, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি যতদিন না পরিবর্তন করব, ততদিন এই বাজেট বাড়বে না। কর্মীরা ২ শতাংশ দাবি করেছেন, এবার তো ১ শতাংশের নিচে। ফলে এই দাবিটাকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হলে আমাদের এই ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে, কেন এখানে সংস্কৃতির বাজেট বাড়াতে হবে।‘
ডিএ
