বিজ্ঞাপন

তেত্রিশ বছর কাটল, শিশুরা কি পেল সেই সাজানো বাগান?

তেত্রিশ বছর কাটল, শিশুরা কি পেল সেই সাজানো বাগান?

‘আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে, আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই’—দেশের নন্দিত ব্যান্ড ‘রেনেসাঁ’র গানের লাইন এটি। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ব্যান্ডটির ‘তৃতীয় বিশ্ব’ অ্যালবামের গান। তেত্রিশ বছর পেরিয়ে এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক গানটি। কথা ও সুরে যে সুন্দর পৃথিবীর প্রত্যাশা জানিয়েছেন শিল্পীরা, সে প্রত্যাশা আজও কি পূরণ হয়েছে?

উত্তর নিয়ে ভাবার আগে গানটির পেছনের গল্পটা জেনে নেওয়া যাক। সময়টা গত শতকের আশির দশকের শেষ দিকে। জন্মশহর চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। তবে সেখানকার একটি কলেজে শিক্ষকতা করতেন। মনের টান থেকে সপ্তাহে দুদিন চট্টগ্রামের ওই কলেজে গিয়ে ক্লাস নিতেন। এ যাত্রা ছিল ট্রেনে। যাওয়া-আসার সময় ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখতেন, কত অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠছে শিশুরা!

ঢাকার অবস্থাও খুব একটা সুখকর ছিল না। শিশুদের এমন দুর্দশা দেখে তার মনে ভাবনা এলো, এই শিশুদের তো এভাবে বেড়ে ওঠার কথা নয়। তারাও তো একটি সুন্দর পরিবেশ পাওয়ার দাবিদার। ধীরে ধীরে ভাবনাটি তার মনে দানা বাঁধে; বের হয়ে আসে বিখ্যাত সে লাইন ‘আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে…’।

আগের পরিচয়ের সূত্রে ‘রেনেসাঁ’ ব্যান্ডের পিলু খানের কাছে গীতিকবিতাটি দেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। অতঃপর পিলু তাতে সুর দেন। সবার মনেও ধরল। তবে ব্যতিক্রম ভাবনা ও কথার গান, তাই কিছুটা সংশয় তো ছিলই। তবু পৃথিবী ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে গানটি যত্নের সঙ্গে তৈরি করেন তারা। এরপর গানটি যুক্ত করা হয় ‘রেনেসাঁ’র ‘তৃতীয় বিশ্ব’ অ্যালবামে, যেটা প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। যদিও প্রথম পর্যায়ে গানটি সেভাবে ছড়ায়নি। তবে যারাই শুনেছিল, তারা এর গুরুত্ব অনুধাবন করেছিল।

দু’বছর পর ১৯৯৫ সালে বিটিভির ‘জলসা’ অনুষ্ঠানে নতুনভাবে গানটি করার পরিকল্পনা হয়। কিংবদন্তি রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী কলিম শরাফীর সঙ্গে সে গানে কন্ঠ মেলান সুবীর নন্দী, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার মতো গুণী শিল্পীরা। তারপর সময় গড়িয়েছে, ক্যালেন্ডার বদলেছে। আর প্রসঙ্গ ধরে ধরে বারবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ‘আজ যে শিশু’ গানটি। কিছুদিন আগেই যখন আছিয়া কিংবা রামিসার মতো শিশুরা নৃশংসতার শিকার হয়েছিল, তখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘জলসা’য় পরিবেশিত ভার্সনটি ভাইরাল হয়।

কিন্তু সেই ‘সাজানো বাগান’ কি আজও পেয়েছে শিশুরা? এই দেশ ও সমাজ কি শিশুদের জন্য নিরাপদ বলয় হয়ে উঠতে পেরেছে? উত্তরটা সকলেরই জানা। তবু গানটির স্রষ্টা ও শিল্পীদের কাছ থেকেই শোনা যাক, তারা কী ভাবছেন…  

প্রত্যাশার কাছাকাছিও তো নেই

শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, গীতিকার

কিছুদিন পর পর যখন শিশুদের নির্যাতনের খবর নিয়ে চর্চা হয়, তখনই গানটা নতুন করে ভাইরাল হয়। যখনই দেখি গানটা সবাই শেয়ার দিচ্ছে, কথা বলছে, তখনই বুঝতে পারি, অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে! তো সে জায়গা থেকে বললে, প্রত্যাশার কাছাকাছিও নেই। প্রায় সব উন্নত দেশে শিশু ও সিনিয়র সিটিজেনদের বিশেষ যত্ন ও গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন যেন দিন দিন বেড়ে চলেছে। আরেকটা বিষয়, এই যে ডেঙ্গুর সময় আসছে, শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাবে; কিন্তু সেখানে কি ডেঙ্গু প্রতিরোধী কোনো ব্যবস্থা আছে? তো সমাজের প্রত্যেকটা ধাপেই আমরা শিশুদের অবহেলা করছি। একটা উদাহরণ দেই; প্রথমবার আমি যখন আমেরিকায় গিয়েছিলাম, আমার ছোট ভাইয়ের বাচ্চার স্কুলে খেলা ছিল। আমি ওর সঙ্গে গেলাম। দেখলাম, সব বাচ্চার সঙ্গে ওদের বাবা-মা এসে হাজির। এরকমটা কি আমাদের দেশে দেখা যায়? এই যে পড়াশোনার সঙ্গে শিশুর মনন বিকাশের জন্য বাবা-মায়ের উপস্থিতি, এটা তো গুরুত্বপূর্ণ।

প্রায় সব উন্নত দেশে শিশু ও সিনিয়র সিটিজেনদের বিশেষ যত্ন ও গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে শিশু নির্যাতন যেন দিন দিন বেড়ে চলেছে।
শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ও শাহবাজ খান পিলু

শিশুদের সুরক্ষা, সুন্দর ভবিষ্যত—এসব নিয়ে কথা বলা উচিৎ, লেখালেখি হওয়া উচিৎ। বাবা-মা, পরিবারের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। বাচ্চারা তো ভালো-মন্দ বুঝবে না; সুতরাং তাদের বোধ হওয়ার আগ পর্যন্ত বাবা-মাকে পাশে থাকতে হবে। এসব নিয়ে টেলিভিশনে নিয়মিত অনুষ্ঠান হওয়া দরকার। গণমাধ্যমের বিরাট ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। সব চ্যানেলে শুধু রাজনীতি নিয়ে টকশো, ক্যাচাল। বাচ্চাদের নিয়ে কয়টা অনুষ্ঠান আছে? হ্যাঁ, ভালো কথা মানুষ কম শোনে, ভিউ কম হয়। কিন্তু চ্যানেলগুলোর দায়বদ্ধার কিছুই কি নেই? ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটা চ্যানেল কি শিশুদের জন্য আধা ঘণ্টাও বরাদ্দ দিতে পারে না? এতগুলো চ্যানেল দেশে। ছোট হলেও সবাই যদি একটা করে অনুষ্ঠান করে, কারো না কারোরটা তো মানুষের চোখে পড়বেই। যাইহোক, দিনশেষে আমার প্রত্যাশা তো সুন্দর। আমি চাই, বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানের সর্বোচ্চ খেয়াল রাখুন। প্রত্যেকে মিলে সামাজিকভাবে একটা সচেতনতার আন্দোলন গড়ে তুলুন। আর টেলিভিশন মিডিয়া যেন এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে, এটুকুই চাওয়া।

জীবনমান বাড়লেও শিশুদের নিরাপত্তা সেভাবে বাড়েনি

শাহবাজ খান পিলু, সুরকার ও গায়ক  

আমরা শিশুদের জন্য সুন্দর পৃথিবী চাই। তবে এই সুন্দর ব্যাপারটা চলমান প্রক্রিয়া, এর কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি নেই। ফলে ইমপ্রুভ হতে থাকুক, এটাই আমাদের চাওয়া। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তিন দশক আগের চেয়ে খুব একটা উন্নতি হয়নি। এখনো নানা যুদ্ধ-সংঘাত লেগে আছে। হ্যাঁ, মানুষের জীবনের মান বেড়েছে। কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তা সেভাবে বাড়েনি। শিশুরা একটা ভালো পরিবেশে বেড়ে উঠবে, তা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে আছি। ফলে যখনই এ গানটা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, তখন একটু খারাপও লাগে। বুঝতে পারি, শিশুরা ভালো নেই। ‘আজ যে শিশু’ আমার সুরকার-জীবনের প্রথম দিককার গান। তখন সবে ‘রেনেসাঁ’র জন্য সুর করা শুরু করেছিলাম। জঙ্গী ভাইয়ের লিরিকে দু-একটা গান সুর করেছি। এর মধ্যেই এটা দিয়েছিলেন তিনি। জঙ্গী ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। একই বিল্ডিংয়ে থাকতাম আমরা। আমাদের পাড়ার বড় ভাইয়ের মতো তিনি। সেই সুবাদে আন্তরিকতার সম্পর্ক ছিল, তিনি আমাকে গানটি দিলেন সুর করতে। তার উৎসাহেই গানটি করেছিলাম। ‘রেনেসাঁ’র দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘তৃতীয় বিশ্ব’-তে গানটি রাখা হয়। সত্যি বলতে, প্রকাশের পর তাৎক্ষণিক সাড়া আহামরি ছিল না। তবে ধীরে ধীরে গানটি ছড়িয়ে গেল। মানুষও এর গুরুত্ব বুঝতে থাকল। তো যাইহোক, এখনও ঘুরেফিরে এ গানের কথার মতই প্রত্যাশা রাখি। একদিন শিশুদের জন্য পৃথিবীটা সুন্দর ও নিরাপদ হয়ে উঠবে।

শাহবাজ খান পিলু ও নকীব খান

উন্নতি হয়েছে তবে এখনো পুরোপুরি হয়নি

নকীব খান, ‘রেনেসাঁ’ ব্যান্ডের সদস্য

আমার মতে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি হয়নি। মনে হয়, আমরা এখনো শিশুদের সেই ‘সাজানো বাগান’ দিতে পারিনি। আসলে এটা চলমান প্রক্রিয়া। তো অনেক ইম্প্রুভ করেছি, এটা ঠিক। আরো অনেক দূর যেতে হবে। গানটা যখন করা হয়েছিল, আমরা ব্যান্ডের সকলে খুব এক্সাইটেড ছিলাম। কারণ শিশুদের জন্য একটা গান হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে অনেক ধরনের গান হলেও শিশুদের জন্য সেভাবে কোনো গান ছিল না। ফলে শিশুর অধিকার, শিশুর জন্য ভালোবাসা, শান্তির জায়গা—সবকিছু মিলিয়ে এটা একটা ইউনিক গান। আর ‘রেনেসাঁ’ থেকে আমরা বরাবরই চেয়েছি ব্যতিক্রম বক্তব্যধর্মী গান করতে। সে হিসেবে এটা একটি সফল গান। এ গানের প্রেক্ষাপট ধরে যদি দেশের পরিস্থিতির কথা বলি, তাহলে আমাদের মূল সমস্যা হলো নিরাপত্তাহীনতা। এই ২০২৬ সালে এসেও আমরা কি শিশুদের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা দিতে পারছি? যে সুন্দর পরিবেশে তারা বেড়ে উঠবে, সব অধিকার পাবে, নিরাপত্তা, শিক্ষা; সেসব এখনো দিতে পারছি না। বাংলাদেশ ওই স্টেজে পৌঁছাতে পারেনি। সুতরাং এ জায়গায় অনেক কাজ করার আছে। সবাই মিলে এ বিষয়ে কাজ করা উচিৎ। সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে, আমাদের জনগণকেও মিলেমিশে কাজ করতে হবে, যেন শিশুরা একটা সুন্দর জীবন পায়।

চেষ্টা জারি রাখতে হবে

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ‘জলসা’ অনুষ্ঠানে গানটিতে কণ্ঠ মিলিয়েছেন

গানের কথায় ‘সাজানো বাগান’ চাওয়ার কথা আছে, তার মানেই তো এটা নয়, বাস্তবেই তা হবে! হ্যাঁ, গানটিতে একটা মেসেজ আছে, সেটা যেন সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছায়; এটাই তো এর মূল উদ্দেশ্য। একটা গানকে ধরে তো আর জগৎ-সংসার চলে না, অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে আশা করতে পারি, চেষ্টা করতে পারি। আর এই চেষ্টা জারি রাখতে হবে। শিশুদের জন্য ভালো একটা সমাজ দিতে হলে আগে দেশের মানুষকে ভালো হতে হবে, তাই না? মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই এ গানের কথাগুলো বাস্তব হয়ে উঠবে।

বিটিভির 'জলসা' অনুষ্ঠানে 'আজ যে শিশু' গান পরিবেশনে নন্দিত শিল্পীরা

কেআই

বিজ্ঞাপন