বিজ্ঞাপন

অভিনেত্রীরা রেহাই পাবেন কবে?

অভিনেত্রীরা রেহাই পাবেন কবে?

ইন্টারনেট পরিষেবা ও সামাজিক মাধ্যমের পরিসর বাড়তেই সাইবার বুলিং যেন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে! বিশেষ করে নারীরা এ হয়রানির শিকার হন। আর শোবিজের অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে এটা 'মহামারি' হয়ে উঠেছে। সাধারণ কোনো পোস্ট থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ খবর জানালেও সেটার নিচে কমেন্ট বক্সে চলে নেতিবাচক-আক্রমণাত্মক মন্তব্যের ঝড়। এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা বহুবার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের পক্ষেও অনেকে লেখালেখি করেছেন। কিন্তু লক্ষণীয় উন্নতি আর দেখা যাচ্ছে না। 

সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় আক্ষেপ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী সাদিয়া জাহান প্রভা। দেড় দশক আগের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ ধরে এখনো তাকে লাগাতার 'হয়রানি' করা হচ্ছে। অনেকটা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন অভিনেত্রী। নিজের মানসিক যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে এ অভিনেত্রী জানান, তাকে বুলিং করা হচ্ছে প্রায় ১৬ বছর ধরে। মানুষ তাকে বুলিং করে পৈশাচিক আনন্দ পায়, যা তিনি বুঝতে পারেন। কিন্তু ঠিক যতটুকু তাকে বুলিং করা হচ্ছে, তার অর্ধেকও যদি মূল অপরাধীকে করা হতো কিংবা ওই ব্যক্তির চেহারাটা বারবার মানুষের সামনে আনা হতো, তাহলে পরিস্থিতি এমন হতো না। 

প্রভার এমন আক্ষেপ ও বক্তব্যের পর নেটিজেনদের একাংশ তার পক্ষে সরব হয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই লিখছেন, ১৬ বছর আগের একটি ঘটনা নিয়ে এখনো প্রভাকে এমন বুলিং করে যাওয়া যেন মানসিক দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ। শুধুই কি প্রভা? না, অন্য অভিনেত্রীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। পরীমণি থেকে শুরু করে অপু বিশ্বাস, শবনম বুবলী, রাফিয়াত রশীদ মিথিলা, শবনম ফারিয়ার মতো অনেক অভিনেত্রীকেই এরকম নেতিবাচক আক্রমণের শিকার হতে হয়। তাই প্রশ্ন ওঠে, আধুনিক সভ্যতার এ যুগেও নারী তথা অভিনেত্রীরা এমন আক্রমণ থেকে নিস্তার পাবেন কবে?  

বাঁ থেকে- প্রভা, মিথিলা, ফারিয়া ও পরীমণি; প্রায়ই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন তারা

সাইবার বুলিং নিয়ে অভিনয়শিল্পী সংঘের অবস্থান 

টিভি নাটকের শিল্পীদের সংগঠন অভিনয়শিল্পী সংঘ। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অধিকার ও সুরক্ষায় কাজ করে সংগঠনটি। সাইবার বুলিং নিয়ে এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও অভিনেতা রাশেদ মামুন অপু ঢাকা পোস্টকে বলেন, 'আমাদের নারীরা অনেক আগে থেকেই বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি আমাদের জন্য কষ্টের। আমরা বরাবরের মতোই এর বিপক্ষে। আসলে আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকার কারণে আমরা ভালো কোন রেজাল্ট পাই না এবং বুলিং হতেই থাকে। যে কেউ যেভাবে ইচ্ছা চাইলেই আমাদের টার্গেট করছে, এতটাই সহজ! রাষ্ট্র যদি সাইবার এই বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কাজ না করে, তাহলে আমাদের একার পক্ষে কিংবা আলাদা করে এর বিরুদ্ধে লড়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদেরকে এই মূল্যবোধের জায়গাটা অবশ্যই আগে নিশ্চিত করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে।'

 

রাশেদ মামুন অপু

শুধু তাই নয়, সুযোগ পেলে মিডিয়াও অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবনকে পূঁজি করে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করে বলে আক্ষেপ করেন অপু। তার ভাষ্য, 'আমরা ইজি টার্গেট হওয়ায় যে কেউ চাইলেই আমাদের নিয়ে কোনো একটা নিউজ ছাপিয়ে দিতে পারে। এখন বাণিজ্যটা চলছে ডলারের। যত বেশি বুলিং করে নিউজ করা হবে, তত বেশি ক্লিক, তত বেশি ডলার। আমাদের যে অভিযোগগুলো আছে সেটার যদি দৃষ্টি দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি হয়, তবেই এটা থামানো সম্ভব।'

নেতিবাচক পরিবেশ ও পারিবারিক শিক্ষার অভাব দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

সাইবার বুলিং কিংবা অনলাইনে তারকাসহ বিভিন্নজনদেরকে নেতিবাচক মন্তব্য করার বিষয়টি যে একটি মানসিক ব্যধি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই বিশেষজ্ঞদের।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ ঢাকা পোস্টকে জানান, যারা এসব করছে, এটা তাদের পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক শিক্ষার ঘাটতিকে স্পষ্ট করে তোলে। সামাজিক মাধ্যমে কীভাবে এবং কতটা ইতিবাচক শব্দ ব্যবহার করা উচিত, সেই শিক্ষা তারা পরিবার বা সমাজ থেকে পাননি কিংবা জানেন না। দ্বিতীয়ত, যারা এ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করছে, আশেপাশের মানুষ বা নেটিজেনদের একাংশ আবার সেই মন্তব্যগুলোকেই সমর্থন করছে। এর ফলে কোনো একজন অভিনেত্রী বা সাধারণ নারী, কারও রূপ কিংবা সফলতা দেখলেই অবলীলায় অপ্রীতিকর শব্দ ব্যবহার বা কুৎসিত বাচনভঙ্গি প্রদর্শনের মতো বিষয়গুলোকে সমাজে ‘নর্মালাইজ’ বা স্বাভাবিকীকরণ করে ফেলা হচ্ছে। 

ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ

সব মিলিয়ে এই ব্যাধির পেছনে পারিবারিক শিক্ষার অভাব এবং পারিপার্শ্বিক নেতিবাচক পরিবেশকেই দায়ী করেন এই অভিজ্ঞ চিকিৎসক। আর তারকাদের অতীত নিয়ে অবিরত চর্চার বিষয়ে তিনি বলেন, তারকাদের পাবলিক লাইফ নিয়ে অতীত বিশ্লেষণের প্রসঙ্গ উঠতেই পারে, তবে সব কিছুরই একটি সুস্থ সীমা থাকা প্রয়োজন।

যা বলছে প্রশাসন

যেহেতু শিল্পীরা রাষ্ট্র কিংবা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ আশা করেছেন, তাই বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম (ডিএমপি সাউথ) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'শুধু অভিনেত্রী কিংবা নায়িকারা নয়, সাধারণ মানুষও বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তাই আমরা সাইবার ক্রাইম রোধে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি।'

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'অভিযোগ এলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। কিন্তু অনলাইন তথা সামাজিক মাধ্যমের এ জগতটা বিশাল। চ্যালেঞ্জিংয়ের বিষয় হলো, এদের অধিকাংশই দেশের বাইরে থেকে ক্রাইম করছে। এরপরও আমরা আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আর যদি বিচারের কথা বলি, এটা দেখবেন আদালত। সাইবার ক্রাইমের বিভিন্ন ধারায় বিভিন্ন মামলা হয়, যার শাস্তির বিধান রয়েছে। আমাদের কাছে অভিযোগ এলেই আমরা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে হস্তান্তর করি।'

ডিএ/কেআই