কোলাহলমুখর এই ব্যস্ত সময়ে চারপাশের ‘বাজারি’ ট্রেন্ডে যখন কান পাতাই দায়, তখনও কিছু মানুষ নিভৃতে বুনে চলেন শুদ্ধ সুরের মায়াজাল। তেমনই একজন সুরসাধক আলমগীর পারভেজ; পেশায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ থেকে শুরু করে কবি কাজী নজরুল ইসলামের আধুনিক গানের দর্শন, সবকিছুই তার যাপন আর মননে মিশে আছে। সম্প্রতি মুঠোফোনে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা পোস্টের। তার সুরময় জীবনের নানা গল্প তুলে এনেছেন ইব্রাহীম জাহিদ।
ঢাকা পোস্ট: রাজশাহীতে আজকাল গরম কেমন?
আলমগীর পারভেজ: রাজশাহীতে গরম তো আগাগোড়াই বেশ ভালো। মোটামুটি ‘ফিলস লাইক’ তো মাঝেমধ্যে ৫০ ডিগ্রির কাছাকাছি চলে যায়। বেশ ভালোই গরম।
ঢাকা পোস্ট: এই তীব্র গরমের মাঝেও আপনার গানের স্নিগ্ধতা শ্রোতাদের মনে শীতল বাতাস বইয়ে দেয়। এই প্রশংসা বা মানুষের ভালোবাসাটা আপনি কেমন উপভোগ করেন?
আলমগীর পারভেজ: আসলে আমি জানি না, কতটুকু করতে পারি। মিউজিকটাই আমার সবকিছু, আমার লাইফ। আমি সবসময় চেষ্টা করি ভালো কিছু করার। অনেকেই আছেন, যারা আমার গান খুব পছন্দ করেন, খুব পজিটিভ ফিডব্যাক দেন, এটি শুনতে আসলেই ভালো লাগে। মানুষ যে এখনো রুচিসম্মত গান শোনে এবং তা পছন্দ করে, আমার কাছে মনে হয় এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।
ঢাকা পোস্ট: এই যে আপনি নিভৃতে শুদ্ধ গানের চর্চা করে যাচ্ছেন এবং মানুষ তা সানন্দে গ্রহণ করছে; একজন শিল্পী হিসেবে এ প্রাপ্তিটাকে কীভাবে দেখেন?
আলমগীর পারভেজ: এটাই তো শিল্পী জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তার গান শ্রোতারা শুনছেন, পছন্দ করছেন এবং সুন্দর বলছেন, এর চেয়ে বড় পাওয়ার আর কিছু হতে পারে না।
ঢাকা পোস্ট: বর্তমান সময়ে চারপাশে নেতিবাচক বা ‘বাজারি’ ট্রেন্ডের ভিড় একটু বেশি। এর মাঝেই আপনার এই শুদ্ধ গান ও শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চার পেছনের রহস্যটা কী?
আলমগীর পারভেজ: আমার কাছে মনে হয় ‘শুদ্ধ’ ব্যাপারটা টোটালি আপেক্ষিক। শুদ্ধ-অশুদ্ধ নির্ধারণের বড় কোনো মাপকাঠি নেই। সারা পৃথিবীতে সুর তো মূলত সাতটিই। এই সাতটি সুর যদি কেউ ঠিকমতো চর্চা করে, তবে সেটাকে আমি শুদ্ধ সংগীত মনে করি; সেটা ব্যান্ড মিউজিক হোক, ফোক হোক কিংবা অন্য যেকোনো গানই হোক। গানটি যদি সঠিক সুর এবং লয়ে থাকে, তবেই তা শুদ্ধ।

আমি ছোটবেলা থেকেই শাস্ত্রীয় সংগীত যেমন ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি শিখে এসেছি। তাই এগুলোর সাথে এলাইনড যে ফর্মগুলো আছে, আমি মূলত সেগুলোই করার চেষ্টা করি। বাংলা গানের মধ্যে রাগপ্রধান গানগুলো করার প্রতিই আমার আগ্রহ বেশি, অন্যদিকে কখনো খুব একটা আগ্রহ জন্মায়নি। এ কারণে সবসময় এটাই করা হয়।
ঢাকা পোস্ট: আপনার শৈশব-কৈশোর কোথায় কেটেছে?
আলমগীর পারভেজ: আমার জন্ম নওগাঁ জেলার মান্দা থানার আলালপুর গ্রামে। সেখান থেকে পরে আমরা রাজশাহী শহরে চলে আসি, কারণ আমার বাবা রাজশাহী শহরে থাকতেন। তাই আমার বেড়ে ওঠা মূলত রাজশাহী শহরেই।
ঢাকা পোস্ট: আপনার ছোটবেলার দিনগুলোর কথা বলছিলেন। গানের সঙ্গে আপনার সখ্য কিভাবে?
আলমগীর পারভেজ: জন্মের পর থেকেই আমি নাকি রেডিও ছাড়তাম না, এটি আমার মা বলতেন। আমার বয়স যখন দেড়-দুই বছর, তখন রেডিও ধরলে আর ছাড়তে চাইতাম না। মা তখনই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন, সাউন্ড বা গানের প্রতি আমার একটা আলাদা আগ্রহ আছে। মা নিজে খুব শখে গাইতেন এবং বেশ ভালো গাইতেন। সেখান থেকেই মূলত গানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। সবার মতো আমারও প্রথম শেখা মায়ের কাছেই।
তবে প্রথম একটা পূর্ণাঙ্গ গান আমি শিখেছিলাম নানির কাছে। উনি আমাকে একটি রবীন্দ্রসংগীত শিখিয়েছিলেন—‘আহা আজি এ বসন্তে’। সেখান থেকেই গানের মূল জার্নিটা শুরু। এরপর আমার আত্মীয়স্বজন, মামা-চাচারা যারা গান শুনতেন, তারা সবাই বলতে শুরু করলেন যে ‘ওর গানটা মনে হয় ভালো হবে’। এই পজিটিভ ফিডব্যাকগুলো পাওয়ার পর মায়ের আগ্রহ আরও বাড়ে। নানা-নানি এবং বাবাও খুব উৎসাহিত হন।

এরপর সম্ভবত পাঁচ বছর বয়সে রাজশাহীর ওস্তাদ শেখ মুজিবুজ্জামানের কাছে আমার প্রাতিষ্ঠানিক হাতেখড়ি। উনি অবশ্য এখন পৃথিবীতে নেই। এরপর আমি ওস্তাদ কাজী সুলতান মাহমুদ মন্টু স্যারের কাছে শিখতে শুরু করি। তখনও রাগসংগীতের মূল তালিম সেভাবে শুরু হয়নি, কখনো কখনো কম্পিটিশনের জন্য অল্প বিস্তর শিখতাম। রাগসংগীতের আসল তালিম শুরু হয় আরও পরে, প্রফেসর অসিত রায় স্যারের কাছে। এরপর আমি যখন উচ্চশিক্ষার জন্য ইন্ডিয়ায় যাই, সেখানে আগ্রা ঘরানার পন্ডিত রাজেশ কেলকারের কাছে আরও বিস্তর তালিম পাই। এভাবেই ধীরে ধীরে মিউজিক্যাল ওয়ার্ল্ডটাকে এক্সপ্লোর করতে শুরু করি।
ঢাকা পোস্ট: সোশ্যাল মিডিয়ায় কলকাতার অনেকেই আপনার গানের খুব প্রশংসা করেন। সেখানকার উল্লেখযোগ্য কারও সঙ্গে কি আপনার গান নিয়ে কোনো আলাপ হয়?
আলমগীর পারভেজ: হ্যাঁ, দুই বাংলারই অনেক গুণী মানুষ আমার গান পছন্দ করেন। পশ্চিমবঙ্গের কবীর সুমন আমাকে খুবই স্নেহ করেন এবং আমার গান পছন্দ করেন। সুবর্ণকান্তি ঘোষ, যিনি নচিকেতা ঘোষের ছেলে এবং মান্না দের প্রায় ৫৬টি বিখ্যাত গানের সুরকার (যেমন: কফি হাউজের সেই আড্ডাটা, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় ইত্যাদি), উনিও আমাকে ভীষণ স্নেহ করেন। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে নয়, ওনার সাথে আমার আগে থেকেই একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। এছাড়া মৌসুমী ভৌমিকও আমাকে পছন্দ করেন।

দেশের কথা যদি বলি, বরেণ্য শিল্পী কনকচাঁপা আপা আমাকে খুব পছন্দ করেন, গান শুনে প্রশংসা করেন। এছাড়া নাশিদ কামাল আপাসহ গুণী ও জনপ্রিয় অনেকেই আমার কাজের প্রশংসা করেন।
ঢাকা পোস্ট: ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেছিলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম আধুনিক গানের পথিকৃৎ’। এই বক্তব্যের পেছনে আপনার ব্যাখ্যা বা অবজারভেশন জানতে চাই…
আলমগীর পারভেজ: ‘আধুনিক’ বলতে কিন্তু আলাদা কোনো গানের অস্তিত্ব নেই, এটি সর্বজনস্বীকৃত। যখন রবীন্দ্রনাথ গান লিখতেন ও সুর করতেন, তখন তার গানই ছিল সবচেয়ে আধুনিক। তার আগে ছিল রামনিধি গুপ্তের গান, যাকে সহজ বাংলা গানের পথিকৃৎ বলা হয়; যিনি মানুষের মনের কথা, প্রেমের কথা প্রথম লিখতে শুরু করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের জন্মের অনেক আগে মারা গেছেন। বাংলা গানে ‘স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী, আভোগ’ এই কাঠামোকে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এখান থেকেই আধুনিক গানের যাত্রা শুরু। ওই সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন—তারা সবাই রবীন্দ্র-বলয়ের মধ্যেই ছিলেন এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম এই বলয়ের বাইরে গিয়ে সুর ও বাণীর বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।

আমার অবজারভেশন হলো, বর্তমান সময়ে আমরা ফিল্মের গান বা যে কোনো বাংলা গানকে যেভাবে ‘আধুনিক গান’ হিসেবে চিনি, সেখানে কণ্ঠের যে হরেক রকম অলংকার, হরকত, টান, খটকা, মুরকি থাকে, এগুলোর একদম পারফেক্ট ও সঠিক ব্যবহার শুরু করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। যার কারণে তার গানের চেহারাটা একদম আলাদা এবং আধুনিক মনে হয়। এই যে আধুনিক গানের ট্রেন্ড, এটি কিন্তু নজরুল ইসলামের পর আর খুব বেশি চেঞ্জ হয়নি, এখনও ওই ধারাটাই চলছে।
ঢাকা পোস্ট: আপনি বলেছিলেন সংগীত আমাদের ধৈর্য, সহানুভূতি ও ঐক্য শেখায়। একটু সহজ করে যদি বলতেন…
আলমগীর পারভেজ: এটি আসলে অনেক বিশাল একটা ব্যাপার। আমি হয়তো কোনো একটা লেখায় বা কোর্সে এটি উল্লেখ করেছিলাম। যেমন ধরুন কেউ যখন ‘ধ্রুপদ’ গায় (যেটিকে আমি সবচেয়ে খাঁটি মিউজিক মনে করি), তানপুরার সুর শুনে সেই সুরের সাথে নিজের কণ্ঠকে শতভাগ ম্যাচ করানো কিন্তু অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। এর জন্য মেডিটেশনের মতো মনোযোগ দরকার। এই যে সুরের সাথে নিজের সুরকে মিলিয়ে চলার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা বা ঐক্য, এটি মানুষের যাপনপ্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলে। তখন মানুষের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটা মিলেমিশে থাকার বা ঐক্যের মানসিকতা তৈরি হয়। একইভাবে যখন আমরা লয় বা তাল শিখি, একের পর দুই বা তিন কখন আসবে, কীভাবে ঘুরে আবার ‘সম’-এ আসব, এই সার্কেলে একটুও এদিক-ওদিক হলে গানটি নষ্ট হয়ে যায়। এই ধরণের তীব্র মনোযোগ মানুষকে নেতিবাচক কাজ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে রাখে। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ সাহেব একটা দারুণ কথা বলেছিলেন ‘পৃথিবীর সমস্ত নেতাদের সংগীত শিখিয়ে দাও, ওরা আর যুদ্ধ করতে পারবে না।’
ঢাকা পোস্ট: আপনার মেয়ের নাম রেখেছেন ‘আলমনা সোহিন’। আরবি এবং সংস্কৃত দুটি ভিন্ন ভাষার এই মেলবন্ধনের পেছনের গল্পটা কী?
আলমগীর পারভেজ: ‘আলমনা’ নামটি মূলত আমার মায়ের নাম থেকে নেওয়া, আমার মায়ের নাম ছিল আলমনা ঝর্ণা। এর অর্থ দয়ালু। আর ‘সোহিন’ বা সোহিনী হচ্ছে একটি রাগের নাম, এটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ সুন্দর। দুটো নামের অর্থই আমার খুব পছন্দ দয়ালু এবং সুন্দর। আমি চাই আমার মেয়ে একজন খুব ভালো ও সুন্দর মানুষ হোক। তবে ‘সুন্দর’ বলতে আমি বাহ্যিক রূপ বুঝি না। আমি মনে করি সুন্দর হচ্ছে সেই মানুষ, যার পাশে থাকলে মন ভালো হয়ে যায়, যার পাশে থাকতে ভালো লাগে।
ঢাকা পোস্ট: একজন মানুষ হিসেবে আপনার জীবনদর্শন কী? জীবনের এই নদীটি কীভাবে পার করতে চান?
আলমগীর পারভেজ: আমার জীবনের সবকিছুই মূলত সুরকেন্দ্রিক। যেভাবে সংগীতের সাতটি সুর বা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র একসাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সুন্দর সৃষ্টি তৈরি করে, আমি মনে করি পৃথিবীর সমস্ত মানুষেরও ঠিক সেভাবেই একে অপরের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত।
ঢাকা পোস্ট: গানের পাশাপাশি আপনি শিক্ষকতাও করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে নিজের পথচলা কেমন উপভোগ করেন?
আলমগীর পারভেজ: আমি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগেরই সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছি। আমার কাছে সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, যেটা আমার নেশা, সেটাই আমার পেশা। তাই আলাদা করে অন্য কিছু ভাবতে হয় না। আমি যা সবসময় লালন করি, সেটাই আমার পেশায় কাজে লাগাতে পারছি।
ঢাকা পোস্ট: তরুণদের মধ্যে যারা সংগীতশিল্পী হতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো পরামর্শ বা উপদেশ আছে কি?
আলমগীর পারভেজ: প্রত্যেক মানুষই জন্মগতভাবে কোনো না কোনো প্রতিভা নিয়ে জন্মায়। সবার সংগীত প্রতিভা থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই যার এই প্রতিভা বা ন্যূনতম সুরের জ্ঞান আছে, তার উচিত একজন সঠিক গুরুর কাছে গিয়ে সঠিক তালিম নেওয়া এবং নিয়মিত রেওয়াজ করা। এর কোনো বিকল্প নেই। আমার মামা একজন বড় ডাক্তার, উনি একটা চমৎকার কথা বলতেন ‘কাউকে চ্যালেঞ্জ করে ডাক্তার বানিয়ে দেওয়া সম্ভব, যদি সে নির্দেশ মতো ঠিকঠাক পড়াশোনা করে। কিন্তু কাউকে চ্যালেঞ্জ করে সঙ্গীতজ্ঞ বা শিল্পী বানানো সম্ভব না।’ এর জন্য ভেতর থেকে একটা তাগিদ বা জন্মগত উপাদান নিয়ে আসতে হয়।
এমআইকে/কেআই
