ঈদে মুক্তির পর থেকে এখনো প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের আগ্রহ ধরে রেখেছে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’। ছবিতে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষির অভিনয় প্রশংসা তো পাচ্ছেই; আলাদাভাবে নজর কেড়েছেন আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ। ‘পান্না’ চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয়ে মুগ্ধ দর্শক-সমালোচকরা। তরুণ এ অভিনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন দ্বীন অর্ণব।
ঢাকা পোস্ট: মুক্তির প্রায় এক মাস পেরিয়ে ‘রইদ’-এর আঁচ এখন কেমন পাচ্ছেন?
রিয়াদ: দেখতে দেখতে প্রায় এক মাস হয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশ এবং দেশের বাইরের মানুষ এটি নিয়মিত দেখছেন এবং সিনেমাটি নিয়ে নানান রকম প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। দর্শকরা সিনেমাটিকে কীভাবে গ্রহণ করেছেন বা চরিত্রগুলো তাদের সামনে কীভাবে এসেছে, তা নিয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করছেন। নিজের কাজ নিয়ে মানুষের মধ্যে এমন প্রশ্ন তৈরি হওয়া বা সবাই যখন নিজের মতো করে এক ধরনের ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, পুরো ব্যাপারটি দেখতে আমার খুবই ভালো লাগছে।
ঢাকা পোস্ট: সিনেমায় আপনার অভিনয় আলাদা করে প্রশংসা পাচ্ছে। কেমন লাগছে?
রিয়াদ: পরিচিত কিংবা অপরিচিত সব ধরনের মানুষ যখন আলাদা করে আমার অভিনয় নিয়ে কথা বলছেন এবং ভালো বলছেন, তখন সেটা অবশ্যই ভীষণ ভালো লাগার একটা অনুভূতি তৈরি করে। তবে এই প্রশংসার পাশাপাশি আমার ভেতরে এক ধরনের ভয়ও কাজ করছে। আমার ভয় হয়, পরবর্তী কাজগুলো করার সময় আমি যেন আমার সহজাত প্রবৃত্তি ও অনুভূতির প্রতি সৎ থাকতে পারি এবং নিজের পিওর ফর্মে টিকে থাকতে পারি। গুরুজনরা আমাকে সব সময়ই বলেছেন, যেন এই প্রশংসা আমি খুব একটা গায়ে না মাখি, তাই চেষ্টা করছি এগুলোকে নিজের মাথায় না চড়িয়ে কেবল সামনের পথচলার অনুপ্রেরণা হিসেবে ধরে রাখতে।

ঢাকা পোস্ট: স্ক্রিনে যতক্ষণ ছিলেন, দর্শক আপনার অভিনয় উপভোগ করেছেন। এই যে বড় পর্দায় শুরুতেই এমন পারফর্মেন্স—ভাগ্যটা প্রসন্ন মনে হয়?
রিয়াদ: ক্যারিয়ারের শুরুতেই বড় পর্দায় এই ধরনের একটি চরিত্র করা বা এত বড় একটি সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হতে পারা আমার জন্য অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার। জীবনে ভাগ্যের বড় প্রয়োজন থাকে এবং আমার মনে হয় সেই প্রয়োজনটা আমার জীবনে একটু বেশিই ছিল, যার কারণে শুরুতেই এমন সুযোগ আমার জীবনে এসেছে।
ঢাকা পোস্ট: মুক্তির আগে ছবি বা নিজের চরিত্র নিয়ে নার্ভাসনেস ছিল? নাকি এক্সাইটমেন্ট?
রিয়াদ: মুক্তির আগে আমার মনে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি ছিল, যেখানে নার্ভাসনেস এবং এক্সাইটমেন্ট দুটিই একসঙ্গে কাজ করছিল। যেহেতু মুক্তির আগে আমি পুরো সিনেমাটি কখনো দেখিনি, শুধু ডাবিংয়ের সময় দু-একটি দৃশ্য দেখা হয়েছিল, তাই একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। মানুষ সিনেমাটি কীভাবে রিসিভ করবে বা আসলে আমি কেমন করেছি—তা নিয়ে এক ধরনের ভয় বা নার্ভাসনেস যেমন ছিল, ঠিক তেমনি নতুন কাজ পর্দায় আসার একটা এক্সাইটমেন্টও ছিল।
ঢাকা পোস্ট: এ প্রশ্নের আগে জানতে চাই, আপনার দেশের বাড়ি কিংবা বেড়ে ওঠা কোথায়? ‘রইদ’-এ সংলাপে আঞ্চলিক ভাষার যে ব্যাপারটি দেখেছি, ক্যামেরার সামনে সেটা আপনার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল?
রিয়াদ: আমার বাবার দেশের বাড়ি বরিশালে হলেও আমার জন্ম ও বড় হওয়া পুরোটা সময় রাজশাহীতেই। আমার স্কুল-কলেজ রাজশাহীতে শেষ করার পর ময়মনসিংহের ত্রিশালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে যাই। ব্যক্তিগতভাবে আঞ্চলিক ভাষা বা বিভিন্ন অঞ্চলের লোকাল অ্যাকসেন্টের প্রতি আমার আলাদা আগ্রহ ও ভালোবাসা কাজ করে। সিনেমার কথাবার্তা ফাইনাল হওয়ার পর যখন জানতে পারলাম যে, খুলনা বা বাগেরহাট অঞ্চলের টোন ধরতে হবে, তখন কিছুটা দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম। কারণ ওই অঞ্চলের ভাষা নিয়ে আমার আইডিয়া কম ছিল। শুটিংয়ের আগে গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনের কারণে আমাদের একসঙ্গে বসার সুযোগও কম ছিল। তবে শুটিংয়ের ঠিক আগে অন্য একটি কাজের জন্য খুলনায় ১০-১২ দিন থাকায় ল্যাঙ্গুয়েজটা একটু আয়ত্তে এসেছিল। এছাড়া আমাদের লাইন প্রডিউসার বাবলু বোস এবং সহশিল্পী নূর ভাই (মোস্তাফিজুর নূর ইমরান) ভাষার ক্ষেত্রে আমাকে দারুণ সাহায্য করেছেন। ক্যামেরার সামনে প্রথম প্রথম যখন নতুন অ্যাকসেন্টে পারফর্ম করতে যাচ্ছিলাম, তখন একটু নার্ভাসনেস ও চ্যালেঞ্জিং লেগেছিল। তবে প্রথম শটটি হয়ে যাওয়ার পরই ভেতরে এক ধরনের কনফিডেন্স চলে আসে, ভাষাটা বোধহয় টুকটাক আয়ত্ত করতে পেরেছি।

ঢাকা পোস্ট: মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণে অভিনয়ের স্বপ্ন দেখেন অধিকাংশ অভিনয়শিল্পী। তার দ্বিতীয় ছবিতে আপনি সুযোগ পেলেন। কিভাবে? নেপথ্যের গল্পটা কেমন?
রিয়াদ: মেজবাউর রহমান সুমন ভাইয়ের সাথে কাজ করাটা আমার জীবনের বোঝাপড়া ও বড় হওয়ার জন্য খুবই জরুরি এবং সুন্দর একটি জার্নি ছিল। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে যখন ঢাকায় আসি, তখন বন্ধুদের সঙ্গে নিজেদের কিছু করার পরিকল্পনা করছিলাম। এর মধ্যেই হঠাৎ ফেসকার্ড (সুমনের প্রতিষ্ঠান) টিম থেকে সিনেমার একটি চরিত্রের জন্য ডাক পাই। অফিসে যাওয়ার পর তারা আমাকে বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে শুধু বললেন যে, শুটিং স্পটে গিয়ে দীর্ঘ সময় যাপন করতে হবে এবং প্রায় এক বছরের মতো সময় দিতে হবে। মাত্র পড়াশোনা শেষ করে এক বছরের জন্য এভাবে ইনভল্ভ হওয়া নিয়ে প্রথমে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে সুমন ভাইয়ের সঙ্গে বসার পর যখন তিনি বললেন, এটি একটি আদিম প্রেমের সিনেমা এবং এই সিনেমার ‘পান্না’ চরিত্রটির অ্যাপিয়ারেন্স ও চেহারার সঙ্গে আমার খুব মিল রয়েছে, তখন আমি ইনস্ট্যান্টলি সিনেমাটি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
ঢাকা পোস্ট: শুটিংয়ের অনেক গল্প শুনেছি নির্মাতা-শিল্পীদের কাছে। আপনার দৃষ্টিতে কেমন ছিল? একটু গল্প শোনান...
রিয়াদ: শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা বললে—শুধু কলাকুশলীদের সাথেই নয়, ওখানকার স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গেও আমাদের এক ধরনের আত্মিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এত বড় একটা প্রোডাকশনে সবাই নিজেদের উজাড় করে চেষ্টা করছিল। প্রকৃতির এত কাছাকাছি থাকায় আমাদের নিজেদের মধ্যেও এক ধরনের রিফ্রেশমেন্ট কাজ করত। সবাই বলছিল শুটিংয়ে অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আমার শুধু সুখের স্মৃতিগুলোই মনে থাকে। যেমন শুটিং শুরু হওয়ার আগে এক দিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে নূর ভাই, তুষি এবং আমি পাহাড়ের নিচের একটা টিলার উপর দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসেছিলাম। আমরা কেউ কারও সাথে কোনো কথা বলিনি, কিন্তু পরে আলোচনা করে দেখলাম, ওই নীরবতার মাঝেই আমাদের তিনজনের মনে হচ্ছিল, আমরা একে অপরের সাথে আত্মিক কনভারসেশন করছি!
ঢাকা পোস্ট: সহশিল্পী মোস্তাফিজুর নূর ইমরান এবং অভিনেত্রী নাজিফা তুষিকে নিয়ে কিছু বলুন, পর্দায় এবং পর্দার বাইরে কেমন তারা?
রিয়াদ: নূর ভাই আর তুষি দুজনেই অত্যন্ত দুর্দান্ত ও ডেডিকেটেড অভিনেতা। তাদের অভিনয় ও একাগ্রতা দেখে আমি নিজেকে আরও ডেডিকেটেড করার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। সহশিল্পী হিসেবে তাদের সাথে এটি আমার প্রথম প্রজেক্ট হলেও যেভাবে তারা চরিত্রের সাথে জার্নি করেছেন, তা আমাকেও ওনাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে সাহায্য করেছে। পর্দায় তাদের সততা যতটা দেখা যায়, ব্যক্তিজীবনে তারা দুজন তার চেয়েও বেশি সৎ ও দারুণ মানুষ। কাজের সূত্রে তৈরি হওয়া এই সম্পর্কটি ব্যক্তিজীবনেও কন্টিনিউ করছে এবং আমাদের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। ওনাদের সাথে কাজ করে আমি যে অনন্য আনন্দ পেয়েছি, সেই কারণে চাই ওনাদের সাথে যেন আমার আবারও নানানভাবে কাজ করার সুযোগ হয়।

ঢাকা পোস্ট: নতুন কী করছেন?
রিয়াদ: বর্তমানে নতুন করে ওভাবে বড় কিছু করছি না, ঢাকা ইউনিভার্সিটির দু-একটি স্টুডেন্ট প্রোডাকশনে কাজ করেছি। কিছু নতুন কাজ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর বাইরে আমি যেহেতু একটু লেখালেখি ও মাঝে মাঝে পরিচালনা করি, তাই নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন কোনো চমৎকার চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। কাজ সুন্দর হওয়ার পেছনে সুন্দর একটা জার্নি খুব প্রয়োজন। তাই নতুন কোনো ইন্টারেস্টিং কাজ পেলে অবশ্যই সেই জার্নির মধ্য দিয়ে যেতে চাই।
ঢাকা পোস্ট: আপনার পড়াশোনা, অভিনয়ে আসার জার্নিটা শুনতে চাই...
রিয়াদ: আমি ২০২২ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের সাথে ছোট ছোট শর্ট ফিল্ম বানাতাম এবং সেগুলোতে টুকটাক অভিনয় করা হতো। এরপর কোভিডের সময় রাজশাহীতে ফিরে আমাদের ‘ফুটপ্রিন্ট ফিল্ম প্রোডাকশন’ থেকে একটি সিরিজ বানানোর পরিকল্পনা করি, যেখান থেকে ‘শাটিকাপ’-এর জন্ম হয় এবং পরিচালক তাওকীর ইসলামের জন্য আমি সেখানে অভিনয় করি। ‘শাটিকাপ’ জাতীয় পর্যায়ের প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়ার পর মানুষের প্রশংসা দেখে আমার মনে হয় যে, অভিনয়টা বোধহয় আমি করতে পারব এবং এতে আমার আরামও লাগছিল। সত্যি বলতে, আলাদা করে আমি কখনো অভিনেতা হবো ভাবিনি। মূলত একজন ফিল্মমেকার হতে চেয়েছিলাম এবং সিনেমার সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলাম। ফিল্মমেকিং জার্নির অংশ হিসেবেই আমি লেখা, পরিচালনা, প্রযোজনা ও সম্পাদনার পাশাপাশি অভিনয়টাকেও একটা কন্ট্রিবিউশন হিসেবে এক্সপ্লোর করে দেখেছি।
ডিএ/কেআই
