ব্যোমকেশ কিংবা ফেলুদা— শরবিন্দু ও সত্যজিতের সৃষ্ট, কালজয়ী এই দুই আলাদা গোয়েন্দা চরিত্র হয়ে পর্দায় নিজের জাত চিনিয়েছেন। কিশোর বয়স থেকে অভিনয়। নব্বই দশকের দর্শকরা তার অভিনয় উপভোগ করেছেন। দীর্ঘ সময়ের ক্যারিয়ার। জনপ্রিয়তা বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে কাজের পরিধি, শুধু অভিনেতাই নন, একজন ফিল্মমেকার হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে তার। বলা হচ্ছে দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেতা ও পরিচালক পরমব্রত চ্যাটার্জির কথা।
আজ ২৭ জুন, পরমব্রতের জন্মদিন। জীবনের ৪৬ বর্ষা পেরিয়ে পা রাখলেন ৪৭-এ। এপার বাংলা যেমন তার অভিনয়ে মুগ্ধ ভক্ত ছড়িয়ে আছে, ঠিক তেমনি ওপার বাংলার এই গুণী তারকাও বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও ঢাকাকে দেখেন একটু বিশেষ ও গভীর ভালোবাসার চোখে।

কলকাতার অভিনয় জগতের অন্যতম এই প্রতিভাবান অভিনেতা ও নির্মাতা বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজের স্পষ্ট ও যৌক্তিক মতামত তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং এ দেশের চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে তার কণ্ঠ ছিল বরাবরের মতোই বলিষ্ঠ।
বাংলাদেশের প্রতি পরমব্রতের এই টান শুধু মুখের কথা নয়, কাজের ক্ষেত্রেও বারবার প্রমাণিত হয়েছে। গত ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে (২৭ জুন) নিজের জন্মদিনটি তিনি কাকতালীয়ভাবে কাটিয়েছিলেন এই ঢাকা শহরেই। তার অত্যন্ত প্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা ‘আজব কারখানা’র প্রচারণায় অংশ নিতে সে সময় তিনি কলকাতায় নিজের পরিবার ফেলে ঢাকায় এসেছিলেন।
জন্মদিনের বিশেষ দিনটি ঢাকার অভিজাত ক্লাবে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে হাসিমুখে সামাল দিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ঢাকাকে তিনি নিজের শহরের মতোই মনে করেন। এই শহরের সঙ্গে তার অন্যরকম একটা সুতো বাঁধা আছে, গভীর একটা টান রয়েছে। সে কারণেই জন্মদিনের মতো ব্যক্তিগত মুহূর্তের তারিখটি তিনি কলকাতা থেকে বের করে ঢাকার জন্য উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেননি।
শুধু ঢাকা শহরের প্রতি ভালোবাসাই নয়, বাংলাদেশের মানুষের সুখ-দুঃখেও পরমব্রতকে সবসময় পাশে পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের মাটিতে ঘটে যাওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যখন ছাত্র-জনতার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন ওপার বাংলা থেকে প্রথম সারির যে কজন শিল্পী দৃঢ়ভাবে সংহতি জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে পরমব্রত অন্যতম।
শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও সামগ্রিক আন্দোলন নিয়ে নিজের নীরবতা ভেঙে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন সরকারের অন্যায় ও বর্বরোচিত আক্রমণ একচ্ছত্র ক্ষমতার মোহে অন্ধ শাসকের চরম উদাহরণ। নানা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতির কারণে জমে থাকা মানুষের ক্ষোভই এই আন্দোলনকে বৃহৎ রূপ দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত এক ঐতিহাসিক চরম পরিণতি পায়। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থান তার হৃদয়ে এক অনন্য ও আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
মাতৃভাষা বাংলার প্রতি পরমব্রতের নিখাদ শ্রদ্ধা ও আপসহীন মনোভাব বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে। বছরখানেক আগে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন দিল্লি পুলিশ একটি চিঠিতে বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলে উল্লেখ করলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় টলিপাড়ার অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে পরমব্রতও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং একটি দীর্ঘ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোস্টে এর কড়া জবাব দেন। রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেও তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দে, উপভাষা আলাদা হতে পারে কিন্তু ভাষাটা একটাই— আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। তিনি দেশভাগের উদাহরণ টেনে পাঞ্জাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং প্রশ্ন তোলেন, পাকিস্তানের বহু মানুষ পাঞ্জাবিতে কথা বললেও পাঞ্জাবিকে যেমন ‘পাকিস্তানি ভাষা’ বলা হয় না, তেমনি বাংলাকেও কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় আটকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলা ভুল। নোবেলজয়ী এই ভাষার গৌরব দুই বাংলার মানুষের সমান অধিকার।

টলিউডের এই অদম্য প্রতিভার ধমনিতে বইছে সৃজনশীলতার রক্ত। তিনি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের নাতি এবং বিখ্যাত লেখিকা ও কর্মী মহাশ্বেতা দেবীর ভাগনে। তবে এই পারিবারিক পরিচয়কে ছাপিয়ে নিজের অভিনয় দক্ষতা ও মেধা দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ২০০৩ সালে ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ চলচ্চিত্রে তোপসে চরিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করে পরবর্তীতে বিদ্যা বালানের বিপরীতে ‘কাহানি’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডেও নিজের শুরুটা দেখান।
কলকাতার পাঠ ভবন থেকে স্কুলজীবন শেষ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স এবং পরবর্তীতে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিল্ম এবং টেলিভিশন প্রযোজনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা এই অভিনেতা কেবল অভিনয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি, ‘রোডশো ফিল্মস’ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে চলচ্চিত্র নির্মাণেও সফল হয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে ২০২৩ সালে পিয়া চক্রবর্তীকে বিয়ে করা পরমব্রত ২০২৫ সালে এক পুত্র সন্তানের পিতা হন। অভিনয়, বুদ্ধিমত্তা ও দুই বাংলার প্রতি গভীর মমত্ববোধে পরমব্রত চ্যাটার্জি আজ অনন্য এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
ডিএ
