বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

‘পিতৃপুরুষের শিকড় বাংলাদেশে, সুযোগ পেলে সেখানে কাজ করতে চাই’

‘পিতৃপুরুষের শিকড় বাংলাদেশে, সুযোগ পেলে সেখানে কাজ করতে চাই’

অভিনয়টা হয়তো রক্তে নেই, কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করেছেন দেবাশিস মণ্ডল। বহুল আলোচিত সিরিজ ‘মন্দার’ কিংবা ‘আবার প্রলয় ২’-এ অনবদ্য অভিনয়ে মুগ্ধ করেছেন তিনি। অভিনয় করেছেন বলিউডে, ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ সিরিজেও। পশ্চিমবঙ্গের এই তুখোড় অভিনেতার ক্যারিয়ার ও জীবনের নানা গল্প জানার চেষ্টা করেছে ঢাকা পোস্ট। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দ্বীন অর্ণব। 

ঢাকা পোস্ট : থিয়েটারে আসার আগে আপনার শৈশব কেমন ছিল? 

দেবাশিস মণ্ডল : আমার বেড়ে ওঠা একেবারেই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। অন্যসব মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই পড়াশোনা করে চাকরি করার গতানুগতিক একটা তাগিদ ছিল আমাদেরও। তবে আমার স্বাধীনতা ছিল নিজের পছন্দের বিষয়টি বেছে নেওয়ার। কাঁচরাপাড়ায় বড় হওয়ার সুবাদে উচ্চ মাধ্যমিকের পরই সেখানকার লোকাল থিয়েটার গ্রুপ ‘আলোর পরশ’-এ যুক্ত হই। সেখানে কাজ করতে করতেই অভিনয়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি হয়।

ঢাকা পোস্ট : বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন, এরপর দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা (এনএসডি)-তে পড়লেন। শুনলাম পিএইচডিও করেছেন… 

দেবাশিস মণ্ডল : থিয়েটারকে সময় দেওয়ার জন্যই মূলত আমি পাস কোর্সে বিএসসি করি। গ্র্যাজুয়েশনের পর যখন চাকরির চাপ আসতে থাকে, তখন সিদ্ধান্ত নিই থিয়েটারকেই পেশা হিসেবে নেব। কিন্তু কলকাতায় সেই সুযোগ তখনো তৈরি হয়নি। এরপর স্কলারশিপ নিয়ে এনএসডিতে যাই। সেখানকার তিন বছরের পড়াশোনা আমাকে অনেকটা আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। এরপর গুরগাঁওয়ে ‘কিংডম অব ড্রিমস’-এ কাজ করি। পাশাপাশি নেট (NET) ও জেআরএফ (JRF) কোয়ালিফাই করি। তবে অনেকে ভাবেন আমি পিএইচডি করেছি, তবে নানা কারণে সেটা আর করা হয়ে ওঠেনি।

অভিনেতা দেবাশিস মণ্ডল। ছবি- ফেসবুক।

ঢাকা পোস্ট : যতদূর জানলাম, মঞ্চে আপনি আড়াই হাজারের বেশি শো করেছেন। এই বিশাল অভিজ্ঞতা ক্যামেরার সামনে আপনাকে কতটা আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে? 

দেবাশিস মণ্ডল : আড়াই হাজার না হলেও অন্তত দুই হাজারেরও বেশি শো করেছি। এত বছরের এই অভিজ্ঞতা অবশ্যই বড় একটা ভিত্তি তৈরি করে দেয়। এনএসডির পড়াশোনা একজন অভিনেতাকে এমনভাবে তৈরি করে, সে পৃথিবীর যে কোনো ফর্মে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। আমি সবসময় চ্যালেঞ্জিং চরিত্র করতে পছন্দ করি। যখন কোনো চরিত্র দেখে মনে হয়, এটা কীভাবে করব? ঠিক তখনই নিজের ভেতর কাজ করার সবচেয়ে বেশি এনার্জি অনুভব করি।

ঢাকা পোস্ট : ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত ‘চিলড্রেন অব ওয়ার’ সিনেমা দিয়ে আপনার অভিষেক। সেখানে রাজাকারের মতো নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? 

দেবাশিস মণ্ডল : এটি দারুণ একটি অভিজ্ঞতা। ফারুক শেখের মতো প্রখ্যাত অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। চরিত্রটি ছোট হলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই চরিত্রে অভিনয়ের আগে রাজাকারদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে কাজ করাটা আমার জন্য অন্যরকম অনুভূতির ছিল।

ঢাকা পোস্ট : বাংলাদেশের সঙ্গে আপনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে? 

দেবাশিস মণ্ডল : আসলে আমার পিতৃপুরুষের শিকড় বাংলাদেশে। আমার ঠাকুরদা-ঠাকুমা থেকে শুরু করে বাবার দিকের পুরো পরিবার বাংলাদেশেই বড় হয়েছেন। দেশভাগের সময় তারা যে মানসিক ও শারীরিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তা এক বিশাল অধ্যায়। তাই বাংলাদেশের প্রতি আমার সবসময় আলাদা একটা আবেগ কাজ করে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে আরও কিছু গল্পের অংশ হতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে।

ঢাকা পোস্ট : ‘মন্দার’ সিরিজটি আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এই চরিত্রের জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করেছিলেন? 

দেবাশিস মণ্ডল : ‘মন্দার’ সত্যিই আমার ক্যারিয়ারের বড় একটি টার্নিং পয়েন্ট। পূর্ব মেদিনীপুরের প্রান্তিক মানুষের মতো দেখতে লাগার বিষয়টা আমার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ আমি দীর্ঘদিন দিল্লি ও গুরগাঁওয়ে ছিলাম। এই সিরিজের জন্য অনেকে আমার প্রশংসা করেছেন; পরিচিতি অনেকে বলেছেন, এমন কাজের জন্য একজন অভিনেতা বহুদিন অপেক্ষা করে থাকে। কাজটির প্রস্তাব যখন পাই, জানতে পারি যেটা ‘ম্যাকবেথ’ (উইলিয়াম শেকসপিয়ারের লেখা নাটক) থেকে গল্পটা নেওয়া হয়েছে। কাজটি হয়েছিল মেদিনীপুরের প্রান্তিক জায়গায়। চরিত্রটি এক জেলের। তো, আমিও চেষ্টা করেছি জেলের মতো লুক আনতে। সিরিজটা রিলিজের পর মানুষের কাছ থেকে যে ফিডব্যাক পেয়েছি, তাতে বুঝেছি আমার কাজ সার্থক।

ঢাকা পোস্ট : ওই সিরিজে আপনার সঙ্গে আছেন সোহিনী সরকার। তাকে নিয়ে কিছু বলুন… 

দেবাশিস মণ্ডল : সোহিনী সরকার অত্যন্ত অভিজ্ঞ একজন অভিনেত্রী। ‘মন্দার’ সিরিজে আমার স্ত্রী ‘লাইলি’ চরিত্রে রয়েছেন। এনএসডির শিক্ষা অনুযায়ী আমরা সবসময় সিনকে আরও ভালো করার চেষ্টা করি, আর কো-অ্যাক্টর যদি সোহিনীর মতো অভিজ্ঞ হন, তখন সেই কাজটা অনেক সহজ ও আনন্দদায়ক হয়।

রাফ অ্যান্ড টাফ লুকে 'মন্দার' দেবাশিস মণ্ডল (বামে),পাশে অভিনেতার সঙ্গে অভিনেত্রী সোহিনী সরকার ও অনির্বাণ ভট্টাচার্যের কোলাজ

ঢাকা পোস্ট : অভিনেতা ও নির্মাতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? 

দেবাশিস মণ্ডল : দারুণ। লকডাউনের সময় গুরগাঁওয়ে বসে অনির্বাণের কাছ থেকে আমি কাজের প্রস্তাবটি পাই। তিনি আমাদের প্রত্যেক অভিনেতাকে স্ক্রিপ্টের পাশাপাশি ডায়ালেক্টের (আঞ্চলিক ভাষা) অডিও রেকর্ডিং পাঠাতেন। এতে মেদিনীপুরের ওই প্রান্তিক সুর ও মিটার ধরতে অনেক সুবিধা হয়েছিল। চরিত্রটির মানসিকতা বুঝতে এবং ম্যাকবেথের নির্যাসটুকু সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে তার নির্দেশনাই সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে।

ঢাকা পোস্ট : রাগী পুলিশ বা গোয়েন্দা চরিত্রে আপনাকে বেশি দেখা যায়। টাইপকাস্ট হয়ে যাওয়ার কোনো ভয় কি কাজ করে? 

দেবাশিস মণ্ডল : টাইপকাস্ট হতে কোনো অভিনেতাই চায় না। হয়তো আমার লুক বা শারীরিক কাঠামোর কারণে দর্শক আমাকে এ ধরনের চরিত্রে পছন্দ করেন। তবে আমি চেষ্টা করি প্রতিটি চরিত্রকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করতে। স্ক্রিপ্টে ডিটেইলিং কম থাকলে একটা ভয় কাজ করে। তখন আমি নিজের মতো করে চরিত্রের আচরণ ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো দিয়ে ভিন্নতা আনার চেষ্টা করি, যেন আগের কাজের কোনো প্রভাব নতুন চরিত্রে না পড়ে।

'আবার প্রলয় ২'-এ পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে দেবাশিস মণ্ডল। ছবি- ফেসবুক।

ঢাকা পোস্ট : আপনি বাংলা ও হিন্দি দুই মাধ্যমেই কাজ করেছেন। আপনার দৃষ্টিতে বলিউড এবং টলিউডের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী? 

দেবাশিস মণ্ডল : বলিউডের প্রোডাকশন স্কেল বড় হওয়ায় কাজের মান ধরে রাখতে তারা প্রচুর সময় ও রিসোর্স দেয়, যা একজন অভিনেতাকে দারুণ ক্রিয়েটিভ স্যাটিসফ্যাকশন দেয়। অন্যদিকে আমাদের কলকাতায় বাজেট ও সময় খুব কম থাকে। তাই কম রিসোর্সে দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ সবার ওপরই পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে কাজের মানের ওপর প্রভাব ফেলে।

ঢাকা পোস্ট : বাংলাদেশে কাজ করার ইচ্ছে আছে? 

দেবাশিস মণ্ডল : অবশ্যই। আমি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নাটক ও সিনেমা দেখে আসছি। সেখানকার অনেক নির্মাতার কাজ আমার ভীষণ পছন্দ। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে। সুযোগ পেলে আমি অবশ্যই বাংলাদেশে গিয়ে সেখানকার মানুষদের জন্য কাজ করতে চাই। তার আগে আমি তাদের জীবনযাপন ও মানসিকতা আরও ভালোভাবে বুঝতে চাই।

ঢাকা পোস্ট : বাংলাদেশের দর্শক এবং ঢাকা পোস্টের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কী বার্তা দেবেন? 

দেবাশিস মণ্ডল : আপনারা আমার কাজ দেখছেন, পছন্দ করছেন, এ জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। আপনাদের ভালোবাসা আমাকে আরও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়। ঢাকা পোস্ট এবং অর্ণবকে অনেক ভালোবাসা। আগামী দিনেও আপনারা আমার পাশে থাকবেন, আমার কাজ দেখবেন এবং ফিডব্যাক জানাবেন। খুব তাড়াতাড়ি হয়তো বাংলাদেশে এসে আপনাদের জন্য কাজ করার সুযোগ পাব।

ডিএ/কেআই