বাংলাদেশের টেলিভিশন মাধ্যমের নন্দিত মানুষ ও পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার কেবল একজন খাঁটি শিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন একাত্তরের স্বাধীনতাকামী এক সাহসী রূপকার। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক দমনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে টেলিভিশন মাধ্যমকে প্রতিরোধের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন তিনি।
বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তানি দিবস’-এ টেলিভিশনের পর্দায় পাকিস্তানি পতাকা না দেখানোর যে ঐতিহাসিক ও দূরদর্শী কৌশল তিনি অবলম্বন করেছিলেন, তা দেশের গণমাধ্যম ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রেষারেষি একাত্তরের মার্চে এসে চরমে উঠলে তিনি এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে এক সাক্ষাৎকারে মুস্তাফা মনোয়ার জানিয়েছিলেন, সাধারণত রাত ১০টায় অনুষ্ঠান শেষ করে জাতীয় (তৎকালীন পাকিস্তান) পতাকা দেখিয়ে সম্প্রচারের সমাপ্তি টানা হতো।
কিন্তু ২৩ মার্চ কোনোভাবেই ঢাকার টিভিতে পাকিস্তানের পতাকা দেখাবেন না বলে মনে মনে ঠিক করেন মুস্তাফা মনোয়ার। কৌশল হিসেবে রাত ১০টার আগেই সম্প্রচার ও জরুরি দায়িত্ব পালনকারী লোকজন ছাড়া বাকি বাড়তি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে দেন তিনি। তখন ডিআইটির টিভি কেন্দ্রটির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তানের এক মেজর এবং তার অধীনে ছিল প্রায় ৫০ জন সৈন্য।
মুস্তাফা মনোয়ার ও তার সহকর্মীরা সিদ্ধান্ত নেন, নির্ধারিত সময়ের পরিবর্তে অনুষ্ঠান রাত ১২টা পর্যন্ত চালাবেন। যথাসময়ে সম্প্রচার শেষ না হওয়ায় দায়িত্বরত পাকিস্তানি মেজর এসে কারণ জানতে চাইলে চতুরতার সাথে মুস্তাফা মনোয়ার উত্তর দেন, ‘আজ পাকিস্তান দিবস, তাই বাড়তি অনুষ্ঠান চালানো হচ্ছে।’
এই বাড়তি সময়ে তারা একের পর এক বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান প্রচার করতে থাকেন। সমস্ত মানসিক চাপ উপেক্ষা করে তাদের বুদ্ধিমত্তায় ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা পার হলে অর্থাৎ ২৩ মার্চ অতিবাহিত হওয়ার পর পাকিস্তানের পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা হয়। ওই ঘটনার পরদিন থেকে মুস্তাফা মনোয়ার আর টেলিভিশনে যাননি।
এর আগে ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে চারুকলার শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। মূলত তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ‘ভিন্ন সংস্কৃতি’র মোড়কে বাঙালি সংস্কৃতিকে চেপে রাখার নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে টেলিভিশন মাধ্যমে নিজের সংস্কৃতিকে স্বমহিমায় তুলে ধরাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেন।
আজ সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ৯০ বছর বয়সী এই গুণী ব্যক্তিত্ব। এই চিরবিদায়ের দিনে তার এমন অসংখ্য সাহসী, ঐতিহাসিক ও গৌরবময় অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন গণমাধ্যম ও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষেরা। মুক্তিসংগ্রাম ও শিল্পকলার ইতিহাসে তার এই আপসহীন ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ডিএ
