জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ডা. ফাতেমা তুয যাহরা ঐশী। চরকির ওয়েব ছবি ‘লাইফলাইন’-এ তার কণ্ঠে এসেছে নতুন গান ‘আমারে নাও’। প্রকাশের পর থেকে গানটি প্রশংসিত হচ্ছে। ওদিকে গানের পাশাপাশি সামলাচ্ছেন চিকিৎসা পেশাও। দুই ভুবনের নানা বিষয়ে ঐশীর সঙ্গে কথা বলেছেন ইব্রাহীম জাহিদ।
ঢাকা পোস্ট: কেমন আছেন? গান নিয়ে ব্যস্ততা কেমন যাচ্ছে?
ঐশী: ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। আসলে বর্তমানে গান এবং চিকিৎসা দুই প্রফেশন নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছি। দুই দিকেই সমান ব্যস্ততা।
ঢাকা পোস্ট: ওয়েব ছবি ‘লাইফলাইন’-এ আপনার কণ্ঠে ‘আমারে নাও’ গানটি অনেকেই পছন্দ করছেন। এ গানের পেছনের গল্পটা শুনতে চাই...
ঐশী: পেছনের গল্পটা বেশ দারুণ। সংগীত পরিচালক নিরব ভাইয়ের সাথে মিউজিক্যালি আমার খুব ভালো একটা কানেকশন, তাকে আমার ‘মিউজিক্যাল ফ্রেন্ড’ বলা যায়। সেই জায়গা থেকে একদিন ভাইকে বলেছিলাম—‘ভাইয়া, আমরা তো মানুষকে খুশি করার জন্য অনেক কাজ করি, চলেন এবার নিজেদের জন্য সোলফুল (আত্মিক) কিছু একটা করি।’ বিষয়টা ভাইয়ের মাথায় ছিল। কাজী আসাদ ভাইয়ের ‘লাইফলাইন’-এ প্রথমে আসলে একটা গান থাকার কথা ছিল। পরে গল্প ও উপস্থাপনার খাতিরে সেখানে আরও একটি গানের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন কাজী আসাদ ভাই ও নিরব ভাই মিলে গানটি লিখলেন। তবে লেখার সময়ও তারা জানতেন না, গানটি কে গাইবে।

পরবর্তীতে আমার সাথে আলাপ। আমি তো এই ধরনের গান করি, বিশেষ করে যে ‘মায়া রে’ গানের জন্য আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলাম, সেটাও এরকম মেজাজের। তো সবকিছু মিলিয়ে নিরব ভাইয়ের মনে হয়েছে, গানটির জন্য আমিই উপযুক্ত। তিনি আমাকে স্টুডিওতে ডাকলেন। আমার চোখের সামনেই লিরিক্স আর সুরের মেলবন্ধনে গানটি তৈরি হলো। যখন লিরিসিস্ট, সুরকার, মিউজিক প্রডিউসার এবং শিল্পী একসাথে বসে কোনো সৃষ্টিতে অংশ নেন, তখন কাজটা একদম খাপে খাপ হয়। এই গানটির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। শুরু থেকেই গানটিকে নিজের ভেতরে লালন করতে পেরেছি বলেই হয়তো শ্রোতারা এত আপন করে নিয়েছেন।
ঢাকা পোস্ট: ঠাণ্ডা মেজাজের গান এটি। আপনার জনপ্রিয় গানগুলোর চেয়ে কিছুটা আলাদা। অথচ এরকম ঠাণ্ডা মেজাজের গান আপনার গলায় দারুণ শোনায়। এরকম গান নিয়ে আপনার ভাবনা কেমন?
ঐশী: সংগীতজীবনের শুরু থেকেই সব ধরনের গান শেখার ও গাওয়ার চেষ্টা করেছি। নিজেকে যে কোনো ধারার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা আমার সবসময়ই থাকে। তবে বিষয় হলো, কোনো শিল্পীর একটা নির্দিষ্ট ধারার গান যখন শ্রোতারা বেশি গ্রহণ করেন, তখন তাদের মাথায় সেটাই সেট হয়ে যায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে মানুষ যেমন কমার্শিয়াল গান পছন্দ করেছে, একইভাবে ‘মায়া রে’ কিংবা ‘না থাকলে সংসারে’র মতো ভিন্ন ধাঁচের গানগুলোও গ্রহণ করেছে। এক কথায় বললে, নিজের ভয়েস আর নতুন নতুন গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। নিরব ভাইও আমার এই টেস্ট জানেন। একজন মিউজিক কম্পোজারের বড় দায়িত্ব হলো শিল্পীর ভেতরের ভ্যারিয়েশনটা বের করে আনা। ভাইয়া আমার ভেতরের সেই ভিন্ন রূপটি বের করতে পেরেছেন বলেই ‘আমারে নাও’ গানটি একটু আলাদাভাবে মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

ঢাকা পোস্ট: কিছুদিন আগে ব্ল্যাক জ্যাংয়ের সঙ্গে ‘নোয়াখাইল্লা মাইয়া’ শিরোনামে ব্যতিক্রম ধাঁচের একটি আঞ্চলিক গান করলেন। সেটার রেসপন্স কেমন পেলেন?
ঐশী: এ গান থেকে আশাতীত রেসপন্স পেয়েছি! একদম নতুন ও এক্সপেরিমেন্টাল একটা কাজ থেকে এত সাড়া পাব ভাবিনি। যে কোনো নতুন কাজের প্রতি মানুষের একেকরকম প্রতিক্রিয়া থাকে, আলোচনা-সমালোচনা থাকে। আর সেটাই কাজকে আরও নিখুঁত করে তোলে। এ গানটির ক্ষেত্রে মেজরিটি অডিয়েন্স খুবই পজিটিভ রেসপন্স দিয়েছেন। একটা আঞ্চলিক ভাষার গানকে এত মডার্ন রিপ্রেজেন্টেশনে তুলে ধরাকে তারা পছন্দ করেছেন। অনেকে মন্তব্য করেছেন যে, গানটি শুনে প্রথমে তাদের বিদেশি কোনো গান মনে হয়েছিল, পরে লিরিক্স শুনে বুঝেছেন এটা আমাদের দেশের গান। নোয়াখালী বা চট্টগ্রামের জেনুইন আঞ্চলিক ভাষা কিন্তু সবার জন্য সহজে বোধগম্য নয়। তাই আমরা গানটিতে এমন একটা উপস্থাপনা ও ইংরেজি ভাষার মিশ্রণ রেখেছিলাম, যাতে আন্তর্জাতিক একটা ভাইব আসে। দর্শক-শ্রোতাদের মন্তব্য দেখে বুঝলাম আমাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।
ঢাকা পোস্ট: গানের কাজ তো চলছেই। এর ফাঁকে ডা. ঐশীর ব্যস্ততা কেমন?
ঐশী: ডাক্তার হিসেবে এখন বেশ ব্যস্ত সময় কাটছে। আমি পাবলিক হেলথ ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করছি, যার একদম শেষ পর্যায়ে আছি। শেষ সময় হওয়ার কারণে এখন পড়াশোনা ও ইন্টার্নশিপে অনেক বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে। তাই দুটো দিক সামলাতে বেশ ভালোই ধকল যাচ্ছে। এর মাঝেই একটা সুখবর দিয়ে রাখি—‘আমারে নাও’ গানটির প্রতি শ্রোতাদের ভালোবাসা এবং নিজের টানের জায়গা থেকে আমরা হুট করে একটা প্ল্যান করেছি। খুব শিগগিরই গানটির একটি ‘লাইভ পিয়ানো ভার্সন’ রিলিজ করব।

ঢাকা পোস্ট: চিকিৎসার সময়ে গানের জন্য কেমন প্রতিক্রিয়া পান? মানে রোগ সারাতে এসে গান নিয়েও নিশ্চয়ই কথা বলেন রোগীরা?
ঐশী: হ্যাঁ, এই প্রতিক্রিয়াগুলো সত্যিই দারুণ এবং আমার জন্য অনেক বেশি ইন্সপায়ারিং। আমি সবসময় দেখেছি, গানের জগতে আমার ‘ডাক্তার’ পরিচয়টা যেমন একটা আলাদা সম্মান ও ভালোবাসার জায়গা তৈরি করে; ঠিক তেমনি যখন ডাক্তার হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করি, সেখানে আমার ‘গায়িকা’ পরিচয়টা রোগী বা সাধারণ মানুষের কাছে অন্যরকম একটা ভালো লাগা তৈরি করে। মানুষ যখন চিনে ফেলে এবং ভালোবাসা প্রকাশ করে, তখন কাজের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা ও পরিশ্রম করার ইচ্ছা আরও বেড়ে যায়।
ঢাকা পোস্ট: সংগীতে জাতীয় পুরস্কার জয় এবং পেশাগত জীবনে চিকিৎসক—এত কম বয়সে বড় দুটি লক্ষ্য পূরণ করে ফেলেছেন। এর পরের বড় স্বপ্ন বা পরিকল্পনা কী?
ঐশী: পরিকল্পনা একটাই—নিজেকে আরও ভাঙতে চাই। আমার কণ্ঠের সাথে যায়, এমন আরও ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার গান গাইতে চাই। এমন কিছু ভালো গান করতে চাই, যা মানুষের মনে সারাজীবনের জন্য জায়গা করে নেবে।
ঢাকা পোস্ট: আপনার জীবনসঙ্গী আরেফিন জিলানী অভিনয় করেন। ইদানীং তার কাজ দারুণ প্রশংসা পাচ্ছে। আপনার কেমন লাগে? কাজ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা হয়?
ঐশী: অবশ্যই কথা হয়। ওর কাজগুলো যখন প্রশংসিত হয়, আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমি ওর জন্য দারুণ প্রাউড ফিল করি। আমার বিশ্বাস, নিজের সততা আর মেধা দিয়ে ও সামনে আরো অনেক বড় বড় সফলতা অর্জন করবে।
এমআইকে/কেআই
