সিরিয়ার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটিতে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। আর সেই নতুন সিরিয়া পুনর্গঠনের অগ্রযাত্রায় এবার আইনপ্রণেতা হিসেবে যুক্ত হলেন দেশটির জনপ্রিয় মডেল, অভিনেত্রী ও টেলিভিশন সেলিব্রেটি রোজিনা লাজকানি ।
দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা গঠিত প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্টে (পিপলস অ্যাসেম্বলি) তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তবে কোনো নির্বাচনী লড়াই বা জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, স্বয়ং প্রেসিডেন্টের বিশেষ কোটায় সরাসরি নিয়োগ পেয়ে এমপি হয়েছেন ‘আল হায়বা’ খ্যাত এই অভিনেত্রী।
ক্ষমতায় আসার পর সিরিয়ার নতুন রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ২১০ আসনের একটি নতুন পার্লামেন্টারি সিস্টেম বা সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করেছেন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। এই ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন স্থানীয় প্রতিনিধিদের এক জটিল সিলেকশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৭০ জন সদস্যকে সরাসরি নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্টের মনোনীত সেই ৭০ জন বিশিষ্ট নাগরিক ও সংস্কৃতিকর্মীর তালিকাতেই জায়গা করে নিয়েছেন ১৯৯০ সালে দামেস্কে জন্ম নেওয়া এই গ্ল্যামার কন্যা।

সিরিয়ার ‘হায়ার কমিটি ফর পিপলস অ্যাসেম্বলি ইলেকশনস’-এর প্রধান মোহাম্মদ তাহা আল-আহমদ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের মনোনীত এই ৭০ জনের তালিকায় রোজিনার মতো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি ঠাঁই পেয়েছেন ১৫ জন নারী, গৃহযুদ্ধে নিহতদের স্বজন, সাবেক রাজনৈতিক বন্দী এবং রাসায়নিক হামলার শিকার হওয়া সারভাইভাররা। এ ছাড়া আয়েশা আল-দিবসের মতো প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মীরাও এই তালিকায় রয়েছেন। সব মিলিয়ে নতুন এই সংসদে নারী সদস্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে।
দামেস্কের এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্ম নেওয়া রোজিনা বরাবরই পরিবারের পূর্ণ সমর্থন পেয়ে এসেছেন। দামেস্কের ‘হায়ার ইনস্টিটিউট অব ড্রামাটিক আর্টস’ থেকে সিনোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করা রোজিনা অভিনয় জগতে পা রাখেন ২০১৪ সালের দিকে। তবে অভিনয়ের পাশাপাশি নাচ, গান এবং বিভিন্ন উপভাষায় কথা বলার দক্ষতাকে একজন প্রকৃত অভিনেতার গুণ মনে করেন তিনি।

২০১৩ সালের ‘ওয়েটিং’ নাটকে অভিনয়ের পর থেকেই নির্মাতা ও প্রযোজকদের নজরে আসেন তিনি। এরপর ‘ইনটেনসিভ কেয়ার’ (২০১৫), ‘শৌক’ (২০১৭), ‘মা ফিয়ি’ (২০১৯) এবং ‘আল-হায়বা: দ্য পেব্যাক’ (২০২০)-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। ২০২৫ সালে তার অভিনীত ‘তাহত এল আরদ’ (আন্ডার গ্রাউন্ড) সিরিজটিও বেশ প্রশংসিত হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পেছনে যে সিরীয় বিপ্লব, তার প্রকাশ্য সমর্থক ছিলেন রোজিনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি শুরু থেকেই আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিপ্লবের পক্ষে নিজের কণ্ঠস্বর জোরালো করেছিলেন। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর আসাদ শাসনের অবসানের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে বাঁধভাঙা উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন এই অভিনেত্রী। সম্ভবত সেই নির্ভীক অবস্থানের কারণেই নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তার এই মূল্যায়ন।

সংসদ সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দায়িত্ব গ্রহণের কথা জানান রোজিনা লাজকানি। সিরিয়ার জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়ে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দেশ পুনর্গঠন, উদ্বাস্তুদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন এবং জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সংস্কৃতি ও শিল্পের প্রচারের জন্য আমি সর্বদা কাজ করে যাব।’
এমআইকে
