টিকিট বিক্রি শেষ, সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন—এমন অবস্থায় একদম শেষ মুহূর্তে এসে স্থগিত হলো কলকাতার জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী অনুপম রায়ের কনসার্ট। এ ঘটনার পর আবারও সংশয়ে পড়ছেন কনসার্ট আয়োজক ও শ্রোতারা। কেননা গত এক-দেড় বছরে এরকম অনেক কনসার্ট বাতিল হয়েছে। ফলে ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য পাকিস্তানের জনপ্রিয় তারকা আতিফ আসলামের কনসার্ট নিয়েও নতুন করে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
যেখানে বাংলাদেশের শিল্পীরা নিয়মিত ও নির্বিঘ্নে বিদেশে গিয়ে বড় বড় শো করে আসছেন, সেখানে ঢাকার মঞ্চে আন্তর্জাতিক শিল্পীদের পরিবেশনা নিয়ে এই লাগাতার অনিশ্চয়তা দেশের কনসার্ট সংস্কৃতিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে।
২৬ জুন ঢাকার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ‘ওয়ান ট্রু সাউন্ড’ কনসার্ট। এতে অনুপম রায়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যান্ড ‘বেঙ্গল সিম্ফনি’রও পারফর্ম করার কথা ছিল। কিন্তু মাত্র এক দিন আগে ২৫ জুন আকস্মিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কনসার্টটি স্থগিত করেন আয়োজকরা।
শতভাগ প্রস্তুতি নিয়ে স্পন্সর সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক শিল্পীদের চড়া মূল্যে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করার পর একদম শেষ মুহূর্তে যখন নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ছাড়পত্র বাতিল করা হয়, তখন আয়োজকরা একরকম আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়েন। তাদের মধ্যে দেখা দেয় স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ।
অনুপম রায়ের কনসার্টের সহ-আয়োজক 'ইয়ামাহা মিউজিক'-এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে জানান, শেষ মুহূর্তে এসে কনসার্ট স্থগিত হওয়াটা তাদের জন্য বিশাল ক্ষতির। কারণ একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের আগে ভেন্যু বুকিং ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ ছাড়াও সংশ্লিষ্ট শিল্পীকে আনতে অন্তত অর্ধেক টাকা অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়। কনসার্টটি শেষ পর্যন্ত সফলভাবে আয়োজন করা সম্ভব না হলে এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, 'অগ্রিম খরচ ও রিফান্ড প্রসেসের খরচের কারণে আমাদের বড় আর্থিক লোকসান থাকে; সেটার পরিমাণ ঠিক কত, তা পুরো আয়োজন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। এছাড়া স্থগিত হওয়া কনসার্টটি পুনরায় আয়োজন করার পরিকল্পনা থাকলেও শিল্পীদের শিডিউল ম্যাপিং বা ফাঁকা স্লট পাওয়ার ওপর সবকিছু নির্ভর করায় সেটাও এখন সম্ভব হচ্ছে না।'
আয়োজকদের একাংশের মতে, সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলের সঙ্গে কনসার্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের বড় ঘাটতি রয়েছে। শতভাগ প্রস্তুতি সত্ত্বেও রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ না করে শুধু ‘অদৃশ্য নির্দেশনায়’ কনসার্ট বন্ধের এই প্রবণতা বন্ধ না হলে দেশের সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা। ভবিষ্যতেও বিশ্বমানের কোনো শিল্পীর বাংলাদেশ সফরে আসার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।

কনসার্ট আয়োজনে আমাদের কোনো গাফিলতি থাকে না। সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে এবং সব নিয়ম মেনেই শোয়ের পরিকল্পনা করি আমরা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে আপত্তি জানানো হয়।
সদ্য স্থগিত হওয়া অনুপম রায়ের কনসার্টের আয়োজক প্রতিষ্ঠান ট্রিপল টাইমস কমিউনিকেশন্স-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রীতম দে ঢাকা পোস্টকে বলেন, 'কনসার্ট আয়োজনে আমাদের কোনো গাফিলতি থাকে না। সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে এবং সব নিয়ম মেনেই শোয়ের পরিকল্পনা করি আমরা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে আপত্তি জানানো হয়। বিদেশি কোনো শিল্পী এলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা নিরাপত্তা সংস্থাগুলো স্বাভাবিকভাবেই তৎপর থাকে। তবে তাদের কোনো সংশয় থাকলে বা ঝুঁকির আশঙ্কা মনে হলে তারা শেষ মুহূর্তে তা বন্ধ করে দেয়। আমাদের দাবি হলো, এই শো বাতিলের বিষয়টি যেন একেবারে শেষ মুহূর্তে না হয়। বিদেশি শিল্পীদের অগ্রিম পেমেন্ট, সরকারকে ট্যাক্স—সব দেওয়ার পর যখন শো বাতিল হয়, তখন আমাদের আর করার কিছু থাকে না।'
টিকিট রিফান্ড প্রসঙ্গে প্রীতম দে জানান, অন্যান্য আয়োজকদের ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশনে সময় লাগলেও তাদের নিজস্ব সিস্টেম জেনারেটেড রিফান্ড প্রসেস থাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দর্শকদের টাকা ফেরত দিতে পেরেছেন। তবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত স্থগিতাদেশ কর্পোরেট বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা বলে মনে করেন তিনি।
প্রীতম উল্লেখ করেন, ইয়ামাহা মিউজিক 'ওয়ান ট্রু সাউন্ড' নামে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল, যার অধীনে বছরে তিন-চারটি আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার কথা। কিন্তু প্রথম ইভেন্টেই এমন ধাক্কা খাওয়ায় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবে।

শিল্পীদের সম্মানহানি ও সরকারি নীতি প্রসঙ্গে এই আয়োজক আরও যুক্ত করেন, 'একটি শো বাতিল হলে তা আয়োজক ও শিল্পী উভয়ের জন্যই চরম বিব্রতকর। শিল্পীকে দেখে মানুষ টিকিট কাটে, তাই শো না হলে শিল্পীরও সম্মানহানি হয়। আমরা চাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক শিল্পী আনার এই জটিল প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ ও আয়োজকবান্ধব করুক। আমরা যখন আবেদন করি, তখনই যদি প্রশাসন আমাদের কোনো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা বা ঝুঁকির কথা আগে থেকে জানিয়ে দেয়, তবে আয়োজকদের জন্য কাজ করা অনেক সহজ হয়।'
অনুপমের এই কনসার্ট স্থগিতের ঘটনাটি সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এ মাসের বহুল প্রতীক্ষিত ‘মেইন স্টেজ শো ফিচারিং আতিফ আসলাম’ আয়োজনের ওপর। এটিও আগে একবার স্থগিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার পূর্বাচলে হওয়ার কথা ছিল আয়োজনটি। তখনও নিরাপত্তাজনিত ছাড়পত্র না পাওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়। এখন পুনরায় ২৪ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়োজক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক কাজী রাফসান আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই তারা দর্শকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আতিফের শো শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ দর্শক ও সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে গভীর সংশয় ও রহস্য দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে যারা নতুন করে টিকিট কাটতে চাচ্ছেন, তারা কার্যত আগ্রহ হারাচ্ছেন। আতিফ আসলামের এই কনসার্টের খবরে নেটিজেনদের অনেকে শঙ্কা প্রকাশ করেন, কেউ কেউ স্ক্যাম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় কনসার্ট স্থগিতের আশঙ্কা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কনসার্ট স্থগিতের এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাটি মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সুনির্দিষ্ট সিকিউরিটি গাইডলাইনের অভাব থেকে তৈরি হচ্ছে। একের পর এক কনসার্ট স্থগিতের পেছনে বারবারই নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আসছে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া বিভাগের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, 'নিরাপত্তাজনিত কারণে কনসার্ট স্থগিত' এ ধরনের কোনো নির্দেশনা পুলিশ দেয়নি। যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ধরণের নির্দেশনা দিয়ে থাকে, তাহলে সেটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত।
তবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত এ জটিলতার কারণ জানতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি।
ডিএ/কেআই
