বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

অভিনয় না করাই হলো আসল অভিনয়: শরাফ আহমেদ জীবন

অভিনয় না করাই হলো আসল অভিনয়: শরাফ আহমেদ জীবন

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই উন্মাদনা, তর্ক-বিতর্ক আর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মজার সব লড়াই। এই আমেজের মধ্যেই সদ্য মুক্তি পেয়েছে মহিদুল মহিমের নাটক ‘আমাদের বিশ্বকাপ’। এতে আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক চরিত্রে অভিনয় করেছেন শরাফ আহমেদ জীবন। এই নাটক এবং তার অন্যান্য কাজ নিয়ে নির্মাতা-অভিনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন দ্বীন অর্ণব

ঢাকা পোস্ট: ‘আমাদের বিশ্বকাপ’ নাটকে আপনার অভিনয় প্রশংসা পাচ্ছে। ফুটবলের প্রতি আপনার ভালোবাসা এবং এই নাটকে অভিনয়ের পেছনের গল্পটা কেমন?

জীবন : আমি ছোটবেলা থেকেই ফুটবলপ্রেমী। আমাদের গ্রামের মানুষ বেশ সংস্কৃতিমনা ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিল। জন্মের পর থেকেই বাড়ির পাশের স্কুল মাঠে ফুটবল খেলা দেখে বড় হয়েছি। এখনও ঢাকায় নিয়মিত টার্ফে ফুটবল খেলি। নির্মাতা মহিমও আমাদের সঙ্গে টার্ফে খেলে। এভাবেই মূলত নাটকটিতে যুক্ত হওয়া। আর ফুটবলের প্রতি প্রেমের কথা বললে, ম্যারাডোনা-বাতিস্তুতার যুগ থেকে শুরু করে এখন মেসির খেলা দেখছি। আর্জেন্টিনার প্রতি আমার শুরু থেকেই অন্যরকম একটা আবেগ কাজ করে। মজার ব্যাপার হলো, এবার আমার কাছে আরও দুটি নাটকের প্রস্তাব এসেছিল, যেখানে আমাকে ব্রাজিল সমর্থক চরিত্রে অভিনয় করতে বলা হয়। কিন্তু আমি সরাসরি ‘না’ করে দিয়েছি। নির্মাতারা বলেছিলেন—‘আপনি তো শুধু অভিনয় করবেন, তাহলে সমস্যা কোথায়?’ আমি তাদের বলেছিলাম, ব্যক্তিগতভাবে আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করি এবং আমার এই ইমোশনটা ধরে রাখতে চাই। আমি আমার নাটকের চরিত্র আর ব্যক্তিগত পছন্দকে আলাদা করতে পারছিলাম না।

ঢাকা পোস্ট: শুটিং সেটে তো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থন নিয়ে আপনাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে?

জীবন : না। এমন কোনো ঘটনা বা দ্বন্দ্ব একদমই ঘটেনি। নাটকে পাভেলের (ব্রাজিল সমর্থক) সঙ্গে আমার কোনো দৃশ্য ছিল না। আমার দৃশ্যগুলো ছিল মূলত ইরফান সাজ্জাদের সঙ্গে। আর বাস্তবে সাজ্জাদও কিন্তু আর্জেন্টিনার সমর্থক! ফলে আমাদের দুজনের বোঝাপড়াটা দারুণ ছিল। এছাড়াও ৭ জুলাই থেকে ‘ব্রাজেন্টিনা’ সিরিজ আসছে। এই সিরিজে আমি অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছি। সেখানে জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া যেমন অভিনয় করেছেন, তেমনি আমিও আছি। মজার বিষয় হলো, এই সিরিজেও আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবেই পর্দায় আসছি!

শরাফ আহমেদ জীবন

ঢাকা পোস্ট: বঙ্গর ড্রামা সিরিজ ‘জ্ঞানী গনি’তে আপনার অভিনয় দারুণ প্রশংসিত। এ প্রজেক্ট নিয়ে নতুন কোনো খবর আছে?

জীবন : ‘জ্ঞানী গনি’ নিয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। তবে এটুকু বলব, অমির নাটকে আমি যে কয়টি চরিত্র করেছি, প্রতিটি করেই আনন্দ পেয়েছি। আমাকে কোনো চাপ নিয়ে অভিনয় করতে হয়নি। মনে হয়েছে চরিত্রগুলো যেন আমার জন্যই তৈরি। দর্শকরা তো আগে এর পাঁচটি খণ্ড বা ঘটনা দেখেছেন। এবার দর্শক একটি লম্বা জার্নির মধ্য দিয়ে যাবেন। আমরা একটু বড় পরিসরে এটি দর্শকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। বাকি আপডেট ধীরে ধীরে সবাই জানতে পারবেন।

ঢাকা পোস্ট: আপনি একইসঙ্গে নির্মাতা ও অভিনেতা। কোন কাজে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য পান?

জীবন : সবসময় বলি, আমি নির্মাতা হিসেবে ফুল-টাইম, কিন্তু অভিনেতা হিসেবে পার্ট-টাইম। আমি আসলে কখনো অভিনেতা হতে চাইনি। অভিনয় তো করছি মাত্র কয়েক বছর। ছয় শতাধিক বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছি এবং নির্মাণে আছি প্রায় দুই যুগ ধরে। এই বিপুল সংখ্যক বিজ্ঞাপনের চরিত্রগুলোকে ডেমোনস্ট্রেট করতে গিয়ে আমি অভিনয়ের প্যাটার্ন নিয়ে অনেক সময় দিয়েছি। সেই সুবাদে অভিনয় রপ্ত হয়ে গেছে।

ঢাকা পোস্ট: ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এর বোরহান, ‘অসময়’-এর ক্রাইম রিপোর্টার হালিম কিংবা ‘ফিমেল’-এর লাবু কমিশনার—এই চরিত্রগুলো দর্শকমহলে দারুণ সাড়া ফেলেছে। দর্শক যখন আপনাকে এই নামে ডাকে, তখন কেমন লাগে?

জীবন : কেউ প্রশংসা করলে বা ভালোবাসলে অবশ্যই ভালো লাগে। এটা এক ধরণের অনুপ্রেরণা। মানুষ হয়তো আমার বিনোদনের বিনিময়ে আমাকে ভালোবাসে, অথবা আমাকে ভালো লাগে বলেই ভালোবাসে।

শরাফ আহমেদ জীবন

ঢাকা পোস্ট: পর্দায় আপনার যে সাবলীল অভিনয় ও সিম্প্লিসিটি দেখা যায়, বাস্তবেও আপনি মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যান। বাস্তবের স্বভাব কি পর্দায়ও উঠে আসে?

জীবন : ব্যক্তিগত জীবনে আমি খুবই সাধারণ মানুষ, আমার কোনো মাস্কিং বা ফিল্টারিং নেই। আমি বিশ্বাস করি ‘স্বাভাবিক অভিনয়’ কোনো গ্রামারে পাওয়া যায় না। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে উত্তম কুমারের সাবলীল অভিনয় আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করেছিল। কারণ সেই সময়টা ছিল যাত্রাপালার মতো ওভার-অ্যাক্টিংয়ের। আমার মনে হয়েছিল অভিনয় এমন হওয়া উচিত, যেটা দেখে মানুষ বুঝবে না যে আমি অভিনয় করছি! অভিনয় না করাই হলো আসল অভিনয়; যদিও আমি কখনো অভিনেতা হতে চাইনি।

ব্যক্তিগত জীবনে আমি খুবই সাধারণ মানুষ, আমার কোনো মাস্কিং বা ফিল্টারিং নেই। আমি বিশ্বাস করি ‘স্বাভাবিক অভিনয়’ কোনো গ্রামারে পাওয়া যায় না। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে উত্তম কুমারের সাবলীল অভিনয় আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করেছিল।

ঢাকা পোস্ট: এই যে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেন, এর জন্য কি আলাদা করে চর্চা বা গবেষণা করতে হয়?

জীবন : সবসময় যে অনেক গবেষণা করি তা না; তবে আমি চারপাশটা বেশি পর্যবেক্ষণ করি। ‘হালিম’ চরিত্রটি করার সময় আমার আশেপাশে থাকা সাংবাদিক বন্ধুদের পর্যবেক্ষণ করেছি। সাংবাদিকদের কাছে অনেক ইনফরমেশন থাকে এবং তাদের সাথে আড্ডা দিলে অনেক কিছু জানা যায়। আবার কাজল আরেফিন অমির ‘হোটেল রিল্যাক্স’ সিরিজে ময়মনসিংহের এক ব্যবসায়ীর চরিত্র করার সময় অমির সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসে আলোচনা করেছি। কারণ, সেখানে যদি বেশি অভিনয় দেখান, সেটা হয়ে যাবে আর্টফিল্ম; আর যদি কম দেখান তাহলে এটা আবার হয়ে যাবে মার্জিত।

ঢাকা পোস্ট: নির্মাতা হিসেবে নতুন কী করছেন?

জীবন : ২০২৫ সালে ‘চক্কর’ নিয়ে ব্যস্ততা ছিল, এ বছর আমি দ্বিতীয় সিনেমা নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। অনেকগুলো গল্প নিয়ে প্রডিউসার ও ইনভেস্টরদের সঙ্গে কথা বলছি, যেন প্রথম ছবির ভুলগুলো না হয়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ছোট, হল সংখ্যা কম, তাই সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আগামী বছর ছবি বানাব এটা নিশ্চিত।

শরাফ আহমেদ জীবন

ঢাকা পোস্ট: অনেক সময় ইনভেস্টর বা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের অভাবে ভালো প্রজেক্ট বের করা সম্ভব হয় না। এছাড়া সিনেমা হলের সংকটও রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

জীবন : সমস্যাটা হলো আমাদের দর্শক, নির্মাতা এবং ইনভেস্টর আছে কিন্তু পর্যাপ্ত সিনেমা হল নাই। এই গ্যাপ দূর করার দায়িত্ব সরকারের। ভারতের কেরালায় যেমন আলাদা ফিল্ম মিনিস্ট্রি আছে, আমাদের দেশেও সিনেমার জন্য আলাদা পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার। বড় বড় কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে সিনেপ্লেক্স রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত। সরকার যদি অনুদানের ব্যবস্থাও করে, এবং চার-পাঁচ বছরের প্রপার প্ল্যান করে, তবেই এই ইন্ডাস্ট্রি লাভজনক হবে। কেরালায় ৬-৭ কোটি টাকার ছবি ১০০-১৫০ কোটি টাকা প্রফিট করে, কারণ সেখানে সুযোগ আছে।

ভারতের কেরালায় যেমন আলাদা ফিল্ম মিনিস্ট্রি আছে, আমাদের দেশেও সিনেমার জন্য আলাদা পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার। বড় বড় কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে সিনেপ্লেক্স রাখা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

ঢাকা পোস্ট: জেলা শহরগুলো থেকে সিনেমা হল প্রায় হারিয়েই যাচ্ছে। নিশ্চয়ই আপনার নজরেও পড়ে এসব খবর?

জীবন : হ্যাঁ। এটা আসলে সংস্কৃতির আগ্রাসন; আমরা সামনের দিকে না গিয়ে পেছনের দিকে যাচ্ছি। একটা গোষ্ঠী চায় না, সিনেমা হোক বা মানুষ সংস্কৃতিমনা হোক, কারণ সংস্কৃতি চর্চা কমলে কুসংস্কার ও মৌলবাদ বাড়বে। চলচ্চিত্র হলো একমাত্র মাধ্যম যা সব সংস্কৃতির মূল জায়গা। যদি কোনো দেশের চলচ্চিত্রই না থাকে, তবে তার সংস্কৃতি থাকলেই কী আর না থাকলেই কী! সুতরাং চলচ্চিত্রকে বাঁচানো সরকারের দায়িত্ব।

ডিএ/কেআই