বিজ্ঞাপন

সাক্ষাৎকার

উন্নত বিশ্বেও অনেকে যৌথ পরিবারে ফিরতে চাইছে : শামীম জামান

উন্নত বিশ্বেও অনেকে যৌথ পরিবারে ফিরতে চাইছে : শামীম জামান

অভিনয় ও নির্মাণের যুগলবন্দীতে দর্শকহৃদয় জয় করেছেন শামীম জামান। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক। এবার নিয়ে আসছেন নতুন ধারাবাহিক নাটক ‘এক পাতিলের সংসার’। এর সূত্র ধরে তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইব্রাহীম জাহিদ

 

ঢাকা পোস্ট : ‘এক পাতিলের সংসার’ আসলে কেমন? মানে ধারাবাহিক নাটকটির প্রেক্ষাপট কী নিয়ে?

শামীম জামান : ‘এক পাতিলের সংসার’ বলতে মূলত যেটা বোঝায়, তা হলো একটা যৌথ পরিবারের সুখ দুঃখের গল্প। বাড়ির কর্তা দাদা; সে চায় কোনো অবস্থাতেই যেন তার যৌথ পরিবারটা না ভাঙে; সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে থাকুক। এই পরিবারে চাচা, চাচি, চাচাতো ভাই বোন সবাই আছে। কিন্তু এই সংসারটা ভাঙার জন্য মূলত বাড়ির মেজো ছেলে (মোশাররফ করিম) প্রথম চেষ্টা করে; ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় সংসারটা ভেঙে চলে যেতে চায়। দাদা এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এখান থেকেই নাটকের মূল দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর ভেতরে আরও অনেক পারিবারিক গল্প আছে, যা একটি যৌথ পরিবারে সচরাচর ঘটে থাকে। এলাকার কিছু মানুষ, যারা এই পরিবারের শত্রু, তাদের সঙ্গে ছেলে-মেয়েদের প্রেম হয়। এই সব নিয়েই ‘একট পাতিলের সংসার’।

ঢাকা পোস্ট : শুটিং করলেন কোথায়?

শামীম জামান : গাজীপুরের পূবাইলে, ভাদুন গ্রামে। ১২ জুলাই থেকে রবি-বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৩০ মিনিটে মাছরাঙা টেলিভিশনে এটি দেখা যাবে।

ঢাকা পোস্ট : কত পর্বের ধারাবাহিক হতে যাচ্ছে এটি?

শামীম জামান : প্রথম স্লটে ১০৪ পর্ব হবে। পরবর্তীতে দর্শকদের পছন্দ এবং রেসপন্সের ওপর ভিত্তি করে এটি আরও ১০৪ পর্ব বাড়িয়ে ২০৮ পর্ব, এমনকি তার চেয়েও বেশি হতে পারে। সবকিছুই দর্শকের পছন্দের ওপর নির্ভর করবে।

একজন পরিচালক ও শিল্পীর মধ্যে যে সুইট রসায়ন থাকা দরকার, মোশাররফ ও হাসানের সঙ্গে আমার সেই রসায়নটা আছে। সময়ের সাথে সাথে আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছি।

ঢাকা পোস্ট : নাটকে মোশাররফ করিম ও আ খ ম হাসানও আছেন। আপনারা তিনজনই খুব ভালো বন্ধু। পর্দায়ও আপনাদের বন্ধুত্ব ভালোবেসেছে দর্শক। আপনাদের একসঙ্গে পথচলা কীভাবে শুরু হয়েছিল? এখনো সেই বন্ধন অটুট থাকার রহস্য কী?

শামীম জামান : আমাদের পথচলা শুরু হয়েছিল মূলত মঞ্চ নাটক দিয়ে। ১৯৯০ সালের দিকে আমরা সবাই অভিনয়ের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়ে মঞ্চে এসেছিলাম এবং সেখান থেকেই আমাদের সম্পর্কের শুরু। ওই সময়েই আ খ ম হাসানের সঙ্গে দেখা হয়, জয়রাজের সঙ্গে দেখা হয়। চঞ্চল (চঞ্চল চৌধুরী), মোশাররদের সঙ্গেও ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। আর আমার নাটকে ওদের থাকা প্রসঙ্গে বলব, মিডিয়াতে আসলে সবার গ্রহণযোগ্যতা সমান থাকে না, যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে তাদের নিয়েই কাজ করি। আমরা তো অনেক পুরনো বন্ধু, ছোটবেলা (ক্যারিয়ারের) থেকে একসাথেই বড় হয়েছি এবং একসঙ্গে প্রচুর কাজ করেছি। এর ফলে আমাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুবই সুন্দর। একজন পরিচালক ও শিল্পীর মধ্যে যে সুইট রসায়ন থাকা দরকার, মোশাররফ ও হাসানের সঙ্গে আমার সেই রসায়নটা আছে। সময়ের সাথে সাথে আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। ওরা দুজনেই অত্যন্ত গুণী অভিনেতা। ভালো কাজের জন্য গুণী অভিনেতা- অভিনেত্রী প্রয়োজন, আর এই বোঝাপড়ার কারণেই আমরা একসাথে কাজ করি।

একসঙ্গে বহু নাটকে অভিনয় করেছেন আ খ ম হাসান, শামীম জামান ও মোশাররফ করিম

ঢাকা পোস্ট : গল্পের বাইরে বাস্তব জীবনে আপনি যৌথ পরিবারকে কীভাবে দেখেন?

শামীম জামান : আমি যৌথ পরিবারকে ভীষণ ইতিবাচকভাবে দেখি। এর অনেক ভালো দিক আছে। আমারও একটি যৌথ পরিবার রয়েছে। আমার মা, ছোট ভাইয়েরা সবাই মিলে আমরা এখনও পর্যন্ত একসাথেই আছি। যৌথ পরিবারে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালেবাসার একটা সুন্দর জায়গা থাকে এবং সবাই সবাইকে প্রয়োজনে পাশে পায়। অনেকে মনে করতে পারেন যে, যৌথ পরিবারে প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিছুটা কম থাকে। কিন্তু একটা পর্যায়ে মানুষের জীবনে প্রাইভেসিটা মূল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায় না। মানুষের আসল প্রয়োজন হলো পারস্পরিক সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং বিপদে-আপদে একে অপরকে কাছে পাওয়া। একসময় সারা বিশ্বে যৌথ পরিবার ভাঙার একটা প্রবণতা ছিল। কিন্তু এখন উন্নত বিশ্বেও অনেকে যৌথ পরিবারে ফিরতে চাইছে। তাই আমি এটাকে পুরোপুরি পজিটিভলি দেখি।

ঢাকা পোস্ট : ‘এক পাতিলের সংসার’ নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি আপনি পরিচালনাও করছেন। দুটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো কতটা কঠিন মনে হয়?

শামীম জামান : দীর্ঘ দিন ধরে অভিনয় করে আসছি; পরে এর পাশাপাশি পরিচাললনা শুরু করি। এই দুটি কাজ একসঙ্গে করতে করতে আমিও অভ্যস্ত হয়ে গেছি; তাই এখন আর এটি আমার কাছে কঠিন মনে হয় না। অভিনয়ের জায়গায় অভিনয় করি আর পরিচালনার জায়গায় পরিচালনা। যেমন—যখন আমার নিজের কোনো শট থাকে, তখন শট দিয়ে মনিটরে টেনে টেনে দেখি যে অভিনয় ঠিকঠাক হয়েছে কিনা। ঠিক না থাকলে আবার করি। তাই এটি আমার কাছে জটিল কিছু নয়। আসলে একজন পরিচালকের কাছে পুরো নাটকের অ্যারেঞ্জমেন্ট, স্ক্রিপ্ট এবং আর্টিস্টদের সামলানোটা অনেক বড় কাজ। তবে যদি একটি স্ট্রং বা শক্তিশালী টিম থাকে, তাহলে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

ঢাকা পোস্ট : পরিচালক হিসেবে আপনি কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন?

শামীম জামান : পরিচালক হিসেবে আমি অবশ্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই একটি ভালো স্ক্রিপ্ট বা চিত্রনাট্যকে। একটি ভালো গল্পের ওপর আমার প্রধান নজর থাকে। গল্প চূড়ান্ত হওয়ার পর পরবর্তী গুরুত্ব পায় আর্টিস্ট বা অভিনেতা নির্বাচন।

শামীম জামান

ঢাকা পোস্ট : বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অনেক নাটকের গল্পই মানসম্মত হচ্ছে না। এ বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শামীম জামান : যারা মানহীন গল্প নিয়ে কাজ করছেন, তাদের আসলে সচেতন হওয়া উচিত। মিডিয়াতে যদি সবসময় ভালো গল্প নিয়ে কাজ করা হতো, তবে নাটকের মান এবং দর্শক সবকিছুই আরও অনেক উন্নত হতো। তবে আমি মনে করি, অনেক ভালো ভালো গল্প নিয়েও কিন্তু নাটক হচ্ছে। তাই আমি আশাবাদী।

মানুষ নাটক বা সিনেমা দেখেই অনেক কিছু শেখে এবং তাদের চিন্তা চেতনার পরিবর্তন ঘটে। একটি ভালো গল্প মানুষের মূল্যবোধের জায়গায় পরিবর্তন আনতে পারে।

ঢাকা পোস্ট : সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য ভালো গল্প কেমন ভূমিকা রাখে বলে আপনি মনে করেন?

শামীম জামান : দেখুন, নাটক তো মুলত বিনোদন। তারপরও আমি মনে করি, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভালো গল্পের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষ নাটক বা সিনেমা দেখেই অনেক কিছু শেখে এবং তাদের চিন্তা চেতনার পরিবর্তন ঘটে। একটি ভালো গল্প মানুষের মূল্যবোধের জায়গায় পরিবর্তন আনতে পারে। নাটকের মাধ্যমে যদি মানুষের শিষ্টাচার, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়গুলো সঠিকভাবে তুলে ধরা যায়, তবে মানুষ কোনটা করা উচিত আর কোনটা উচিত না—তা শিখতে পারে। এক কথায়, নাটক বা সিনেমা সমাজকে অবক্ষয় থেকে মুক্তি দিতে পারে।

‘এক পাতিলের সংসার’ ধারাবাহিক নাটকের পোস্টারে শিল্পীরা

ঢাকা পোস্ট : সিনেমা নির্মাণ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে?

শামীম জামান : সিনেমা তৈরির ইচ্ছা অবশ্যই আছে এবং এর জন্য আমার গল্পও রেডি হচ্ছে। অনেকদিন যাবৎ আমি সিনেমা বানানোর চেষ্টা করছি। তবে ঠিক কবে নাগাদ কাজ শুরু করব, তা এখনই নিশ্চিত করে বলছি না। সময় হলে আনুষ্ঠানিকভাবেই সিনেমার ঘোষণা দেব। কিন্তু এটুকু বলতে পারি, একসময় আমি সিনেমা বানাব।

এমআইকে/কেআই