জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী সৃষ্টিকর্ম, গান ও সাম্যবাদী-মানবতাবাদী দর্শনকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পী ও গবেষকরা। নজরুলের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে প্রথাগত পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা ও প্রকাশনার পাশাপাশি আধুনিক ও নতুন নতুন মাধ্যম ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তারা। বিশিষ্টজনদের পরামর্শ- বাস, ট্রেন, বিমান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি জনসমাগম স্থলে কবির সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার জীবনদর্শনকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত করতে হবে।
রোববার (১২ জুলাই) সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে এ উপলক্ষে এক বিশেষ সম্মিলন ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ উদযাপনের অংশ হিসেবে এই বর্ণাঢ্য সভার আয়োজন করা হয়। কীভাবে কবির দর্শনকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, তা নিয়ে সংলাপে বসেন বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের চার শতাধিক তারকা, চিন্তাবিদ ও নজরুল গবেষক।
মতবিনিময় সভায় বিশিষ্টজনরা নজরুল চর্চাকে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে দেশের প্রতিটি জেলা, বিভাগীয় এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি জানান। তৃণমূল পর্যায় থেকে নজরুল প্রতিভা অন্বেষণ, নিয়মিত কর্মশালা ও গবেষণা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশে ‘নজরুল কালচারাল সেন্টার’ স্থাপনের দূরদর্শী প্রস্তাব উঠে আসে এই সভায়।

বক্তারা বলেন, শুধু নাচ, গান বা কবিতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে যন্ত্রসংগীত, আন্তর্জাতিক সেমিনার ও উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুদ্ধ বাণী ও সুরে নজরুল চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এজন্য প্রাথমিক স্তর থেকেই উচ্চশিক্ষা এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমিসমূহে নজরুলের সৃষ্টিকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়। এছাড়া, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কবির সৃষ্টিকর্মের ব্যাপক সম্প্রসারণ, পাবলিক প্লেসে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, নজরুল কালচারাল মিউজিয়াম স্থাপন এবং নজরুল বর্ষ উপলক্ষে একটি বিশেষ ‘থিম সং’ নির্মাণের প্রস্তাবও দেন আলোচকরা।
এই জমকালো সম্মিলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিশিষ্টজনদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত শোনেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব নিতাই রায় চৌধুরী এমপি। নতুন প্রজন্মকে নজরুলের আলোয় আলোকিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘দেশকে মাদক মুক্ত এবং মৌলবাদ ও উগ্রবাদ নির্মূল করে উন্নত সমাজ গঠন করার একমাত্র হাতিয়ার হলো সংস্কৃতি বিষয়ক জ্ঞান এবং শিক্ষা। আমরা উন্নত মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চাই। আমাদের লালন, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী জীবনের কথা বলে। এসব শিক্ষায় নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে।’ এছাড়া প্রাইমারী স্কুল থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান কবিতা লেখনী নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর আহ্বায়ক জনাব হেলাল খান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মানিত সচিব জনাব কানিজ মওলা এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব জনাব মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ নানান আঙ্গিকে উদযাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বছরব্যাপী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনাগুলো কীভাবে আরো সুন্দর পরিসরে ও সকলের অংশগ্রহণে কীভাবে ফলপ্রসূ এবং জনমুখী করা যায় সেই লক্ষ্যে আজকের এই বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের শিল্পীদের নিয়ে সম্মিলন ও মতবিনিময় এর আয়োজন করা হয়েছে। সকলের অভিমত এবং পরামর্শ অনুযায়ী এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।’
দিনব্যাপী প্রাণবন্ত এই সম্মিলনে দেশের চার শতাধিক কণ্ঠশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তিশিল্পী ও নজরুল গবেষক অংশ নেন। এই মহতী সংলাপে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল, ইয়াকুব আলী খান, গাজী আব্দুল হাকিম, সীমা ইসলাম, লুবনা মারিয়াম, খায়রুল আনাম শাকিল, সাদিয়া আফরীন মল্লিক, এ এফ এম হায়াত উল্লাহ, সাজু আহমেদ, ফেরদৌস আরা, অধ্যাপক প্রিয়াংকা গোপ, মাহমুদুল হাসান, কল্পনা আনাম, ফাতেমা তুজ জোহরা ও সুজিত মোস্তফাসহ সংস্কৃতির নানা অঙ্গনের গুণী ব্যক্তিবর্গ।
এমআইকে
