বিজ্ঞাপন

শিল্পী দম্পতির জীবন যুদ্ধ

ইবরার টিপু যখন ক্যানসারে, বিন্দু তখন প্রসব ব্যথায় কাতর

ইবরার টিপু যখন ক্যানসারে, বিন্দু তখন প্রসব ব্যথায় কাতর

ক্যানসারে আক্রান্ত একসময়ের জনপ্রিয় সুরকার-সংগীত পরিচালক ইবরার টিপু। তাও প্রায় দুই বছর ধরে। সম্প্রতি খবরটি সামনে এনেছেন তার স্ত্রী সংগীতশিল্পী বিন্দু কণা। এও জানিয়েছেন, ইবরার টিপুর অবস্থা ক্রমশ উন্নতির দিকে। তিনি ক্যানসার থেকে সেরে উঠছেন।

এদিকে বুধবার একটি ভিডিও বার্তায় জীবনের এই কঠিনতম সময়ের কিছু স্মৃতি শেয়ার করেছেন গায়িকা। বিন্দু জানান, যে সময়ে তার স্বামী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে কেমো থেরাপি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি অন্য হাসপাতালে কাতরাচ্ছিলেন প্রসব বেদনায়। দূর আমেরিকায় এমনই দুঃসহ সময় পার করেছেন তারা।

বিন্দু কণা বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গেছে ইবরার টিপুর কিডনি ক্যানসার ধরা পড়ার। আমরা প্রথমে বুঝতে পারিনি। চিকিৎসক তখন বলেছিলেন গ্যাস্ট্রিকজনিত সমস্যা। কিন্তু এক মাস চিকিৎসা নেওয়ার পরও সুস্থ হচ্ছিল না। তখন টিপু চায়নিজ এক চিকিৎসকের কাছে যায়। তিনি জানান সামথিং ইজ রং। আমি তখন সাড়ে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওরা অনেক টেস্ট করাল। সিটি স্ক্যান, ক্লোনোস্কপি, এন্ডোস্কোপি— যেগুলো করে আরকি। কিন্তু কিছুই ধরা পড়ল না। পরদিন সকালে চিকিৎসক জানাল তারা আরও একটি পরীক্ষা করবে। এটাকে পিইটি স্ক্যান বলে মনে হয়। ওটার রিপোর্ট এলে ডাক্তার জানায় খারাপ খবর।’

ইবরার টিপু ও বিন্দু কণা

প্রথম দিকে এসবের কিছুই জানতেন না বিন্দু কণা। গোপনে ইবরার টিপু একাই লড়ছিলেন ঘাতক ব্যাধির সঙ্গে। স্ত্রী যাতে ভেঙে না পড়েন, তাই গোপন রাখছিলেন। বিন্দু কণা বলেন, ‘আমি শুধু জানতাম, ওর একটি কিডনি ফেলে দিতে হবে। ট্রমাটাইজ হবো বলে ইবরার জানায়নি। শুরুতে সার্জারির সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নিউক্লিয়ার টেস্ট করে দেখে বিষয়টি সার্জারির পর্যায়ে নেই। তখন কেমো থেরাপির সিদ্ধান্ত হয়। যদিও আমি তখনও জানতাম না। আমাকে ইবরার জানায় কোরবানির ঈদের আগে। ২০ মার্চ (গত বছরের) শপিং করে দিয়ে আমার হাত ধরে বলে, ছোট একটা সমস্যা হয়েছে। চিন্তা করো না। ২৬ মার্চ আমার কেমো শুরু হবে। ও যখন কেমো বলেছে তখন আমি পৃথিবীতে নেই।’

এরপর ইবরারের শারীরিক অবস্থা জানার চেষ্টা করেন বিন্দু কণা। তার ভাষ্য, ‘আমার এক কাজিন চিকিৎসক। তাকে টিপুর রিপোর্টগুলো পাঠিয়ে জানতে পারি এটা একটা সারকোমা ক্যানসার। টিউমারটা ফুটবলের আঁকার। ১৯ সেন্টিমিটার। ১১ ইঞ্চি। মাল্টি অর্গানের সঙ্গে রিলেটেড ছিল। সেজন্য সার্জারির পর্যায়ে ছিল না। তাছাড়া ও স্বাস্থবান ছিল। কোনদিন কোনো ব্যথা অনুভব করেনি। সেই মানুষ হঠাৎ করে এরকম পরিস্থিতিতে পড়বে! চিন্তার বাইরে ছিল। শত্রুরও যেন ওরকম সিচুয়েশন যেন না হয়।’

ইবরার টিপুর যেদিন কেমো শুরু হলো, সেদিন তাদের ঘরে এসেছিল সন্তান। দুই হাসপাতালে দুজন লড়ছিলেন জীবনের জন্য। সেই দুঃসময়ে তেমন কেউই ছিল না তাদের পাশে। বিন্দু বলেন, ‘২৬ মার্চ ইবরারের কেমো শুরু হয়। ডক্টর বলছিলেন কেমো যদি নিতে পারে তাহলে আমরা নেক্সট স্টেপগুলো বলতে পারব। ২৬-২৭-২৮ মার্চ তিনটি কেমো দেওয়া হয়। আনফরচুনেটলি ২৬ মার্চ আমার সন্তানের জন্ম হয়। আমার হাজব্যান্ড এক হাসপাতালে কেমো নেয়। আরেক হাসপাতালে আমার বাচ্চা হয়। আমার প্রথম সন্তান বাংলাদেশে থাকাকালীন জন্ম নেয়। সেসময় মা-শাশুড়িসহ ২৫ জন লোক ওটির সামনে দাঁড়ানো ছিল। আর এখানে আমি সম্পূর্ণ একা। সন্তান প্রসবের আগে ডাক্তারকে বলি, আমি আমার স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে চাই। ফোন করে দেখি আমার হাজব্যান্ড আমাকে চেনে না। প্রথম কেমোতেই তার সব স্মৃতি চলে গেছে। কী যে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলতে পারব না! আমার সার্জারি শুরু হয় ৮টা ৩০ মিনিটে। শেষ হয় ১০টার টার দিকে। আমি যখন রিকভারি রুমে, তখন ডাক্তার ফোন করে বলেন, আপনার হাজব্যান্ডকে কেমো দেওয়া হয়েছে। বাসায় গেলে তাকে ১০ মিনিট পরপর লিকুইড খাওয়াবেন। এটাই তার চিকিৎসা। ডাক্তার তো জানে না, আমার এরকম সার্জারি হয়েছে। ওখানে শুয়ে ভাবছিলাম—আমার কী করা উচিত, আমি কি কান্না করব, নাকি বাচ্চার মুখ দেখব, নাকি আমার হাজব্যান্ড বাঁচবে কি না সেটা ভাবব, নাকি সারভাইভ করব?’

কথাগুলো বলতে বলতে গলা ধরে আসে বিন্দু কণার। এরপর আবার বলতে শুরু করেন, ‘কোনোভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করি। নিজেকে বোঝাই আমাকে শক্ত থাকতে হবে। ২৭ তারিখ তৃতীয় কেমো নিয়ে টিপু বাসায় এলে ডক্টর আমাকে বলে তার শরীরের তাপমাত্রা যদি ১০১ হয় হাসপাতালে এমারজেন্সিতে পাঠাতে হবে। ওই সময় আমার বাসার নিচে এক আপা থাকতেন। ওনাকে বলে রেখেছিলাম খেয়াল রাখতে। ওই ভদ্রমহিলা জানান, ইবরারের তাপমাত্রা ১০২। রাতটা কাটিয়ে পরদিন ২৮ মার্চ বন্ডসই দিয়ে এসে দেখি টিপু কাউকে চেনে না। সঙ্গে সঙ্গে জরুরি নাম্বারে কল দিয়ে হাসপাতালে পাঠাই। সে ২৮ মার্চ হাসপাতালে যায়। ফেরে ১৮ এপ্রিল। এর মধ্যে সে কিছু জানে না। এটা একটা ভয়াবহ জার্নি। পাঁচ মাস তাকে কেমো দেওয়া হয়। তারপর ইউনোথেরাপি, রেডিয়েশন। তারপর ২৫-২৬ ডিসেম্বর পেটের সার্জারি। ১১ ঘণ্টার অপারেশন ছিল। আমরা যে কীভাবে কী করেছি, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এরপর জানুয়ারিতে নয় ঘণ্টার আরও একটি সার্জারি হয়। এখন সে আল্লাহর রহমতে ভালো আছে।’

বর্তমান ও অতীতের ইবরার টিপু

ভিনদেশে জীবনের এই সংকটময় সময় নিয়ে বিন্দু কণা বলেন, ‘জীবন-মরণ সব ফেলে আজ বিদেশের মাটিতে। আমাদের এখানে কেউ নেই। আমি, আমার বাচ্চা আর হাজব্যান্ড। এই হচ্ছে আমাদের জীবন। আজ এই শহরটাতে থাকতে হচ্ছে শুধু চিকিৎসার জন্য। প্রথমে শেয়ার করিনি, কারণ বুঝতে পারিনি অনেক বড় একটা সমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো অল্পেই মিটে যাবে। তাই ইবরারকে বলেছিলাম কাউকে বলার দরকার নেই। কিন্তু এটা যে এত বীভৎস, যে এর মধ্যে দিয়ে না গেছে, সে বুঝবে না।’ 

সবশেষে ইবরার টিপুর সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছেন বিন্দু। জানান, স্বামী সুস্থ হলেই দেশে ফিরে আসবেন তারা।

কেআই

বিজ্ঞাপন