একজন সুরের ইন্দ্রজালে মোহাবিষ্ট করেছিলেন, অন্যজন মুগ্ধ করেছিলেন কণ্ঠের জাদুতে। নিজ নিজ কর্মজীবনে তারা হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি। আর ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। কিংবদন্তি সেই শিল্পী দম্পতি কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগমের জন্মদিন আজ।
১৯১২ সালের ২৮ জুলাই যশোরে জন্ম নেন কমল দাশগুপ্ত এবং ১৯৩০ সালের একই দিনে ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন ফিরোজা বেগম।
বাংলা গানের স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ সুরকার-সংগীত পরিচালকদের একজন কমল দাশগুপ্ত। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গানের বাইরে আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগের ভিতটা গড়ে উঠেছিল তার মাধ্যমেই। সৃষ্টি করেছেন অনন্য সব গান। আর ফিরোজা বেগম তো বাংলার শ্রেষ্ঠ নারী শিল্পীদের মধ্যেই অনন্য। নজরুলসংগীতের যে বিস্তার, তার অনেকখানি অবদান তার। এমনকি খোদ কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও প্রিয় শিল্পী ছিলেন তিনি।
কমল দাশগুপ্তের বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। সংগীতের হাতেখড়ি হয়েছিল মূলত বড় ভাই বিমল দাশগুপ্তের কাছেই। অতঃপর দিলীপ রায়, কৃষ্ণচন্দ্র দে ও ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খাঁর কাছে দীক্ষা নিয়েছেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক গানে সুরারোপ করেছেন কমল দাশগুপ্ত। জানা যায়, তার সুরারোপিত নজরুলগীতির সংখ্যা প্রায় তিনশ। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান হিজ মাস্টার্স ভয়েস-এর সঙ্গে। কাজ করেছেন কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানিতেও। এছাড়া তিনিই প্রথম বাঙালি, যিনি উর্দুতে কাওয়ালি গান পরিবেশন করেছিলেন।
নিজ সময়ে অন্যতম সেরা সংগীত পরিচালক ছিলেন কমল দাশগুপ্ত। রেকর্ডসংখ্যক গানে সুর করার সুবাদে ১৯৫৮ সালে বিখ্যাত এইচএমভিতে তার সিলভার জুবিলি উদযাপিত হয়েছিল। চলচ্চিত্রের সুরকার হিসেবেও কমল দাশগুপ্তের সাফল্য কম নয়। প্রায় ৮০টি ছবির সংগীত পরিচালনা করেছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই মারা গেছেন এ শিল্পী।

ফিরোজা বেগমের জন্ম জমিদার পরিবারে। শৈশবেই সংগীতের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। যিনি যখন মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী, তখনই কন্ঠ দিয়েছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে। ১৯৪২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি থেকে ইসলামী গান নিয়ে তার প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পর আসে উর্দু গানের রেকর্ড, যেটার তত্ত্বাবধানে ছিলেন কমল দাশগুপ্ত।
ফিরোজা বেগম সরাসরি কাজী নজরুল ইসলামের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছিলেন। অতঃপর ১৯৪৯ সালে নজরুলগীতি নিয়ে প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করেন শিল্পী। কাজী নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর তার গানের শুদ্ধ স্বরলিপি ও সুর সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন ফিরোজা বেগম। নজরুলগীতি ছাড়াও তিনি আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাত-সহ বিভিন্ন ধরনের সংগীতে নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় তার ১২টি এলপি, ৪টি ইপি, ৬টি সিডি ও ২০টিরও বেশি অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়েছে।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন ফিরোজা বেগম। দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদকসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মারা গেছেন নন্দিত এই শিল্পী।
উল্লেখ্য, কমল দাশগুপ্ত ও ফিরোজা বেগম বিয়ে করেছিলেন ১৯৫৬ সালে। তাদের তিন সন্তান তাহসিন আহমেদ, হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ। এর মধ্যে হামিন ও শাফিন বাংলা ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম সফল দুই তারকা। ‘মাইলস’ ব্যান্ড দিয়ে তারা উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা অসামান্য জনপ্রিয়তা পেয়েছেন।
কেআই
