ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর আজ। প্রায় এক মাসের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের আজকের দিনে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। ছাত্রদের সেই আন্দোলনে সামিল হয়েছিল দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শোবিজের তারকারাও। ৫ আগস্ট বিজয়র দিনে আনন্দ-উল্লাসে রাজপথে নেমে এসেছিলেন অনেকে।
তারকার অভিজ্ঞতায় সেই ৫ আগস্ট কেমন ছিল? ঢাকা পোস্টের বিশেষ আয়োজনে স্মৃতিচারণ করেছেন তারকারা। এ পর্বে রইল লেখক ও গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলীর স্মৃতি…
৫ই আগস্ট আসলে আমার জন্য শুরু হয়েছিল ৪ আগস্ট রাত থেকেই। ৪ আগস্ট সারারাত আমরা কেউ ঘুমাতে পারিনি। পরের দিন শাহবাগে জমায়েতের ঘোষণা ছিল। যে কোনো মূল্যে শাহবাগে জমায়েত হব, এমন পরিকল্পনা ছিল আমাদের, যা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। চারদিকে গোলাগুলি, অসংখ্য লাশ পড়ছে, আর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে এমন একটি সময়ে শাহবাগে জমায়েত হওয়ার চিন্তাটা ছিল খুবই দুঃসাহসিক।
সেই রাতে আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম ‘হাসবুনাল্লাহি ওয়া নেয়ামাল ওয়াকিল, ডু অর ডাই, আগামীকাল শাহবাগে থাকব।’ সারারাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ছিল যেন ৫ আগস্টের সকালটা আমাদের জন্য কল্যাণময় হয়।

সকালে যখন শাহবাগের আজিজ মার্কেট ও পিজি হাসপাতালের মাঝখানের গলিতে পৌঁছলাম, তখন দেখি মাত্র ১০-১২ জন লোক ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে। আমি সবাইকে মোটিভেট করার চেষ্টা করছিলাম আরে, এবার না হলে পরের বার হবে, আজ না হলে কাল হবে, কিন্তু হাসিনার পতন হবেই।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোক আসতে শুরু করল। ৯টা বা ১০টার দিকে যখন প্রায় ২-৩ শ লোক জড়ো হলো, তখন আমরা একটা বিপজ্জনক পরিকল্পনা করলাম। মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে এগোতে লাগলাম, যাতে অন্য গলির মানুষও উৎসাহিত হয়। কিন্তু ১০০-২০০ ফুট এগোনোর পরেই শাহবাগের দিক থেকে আর্মিরা মাইকে ধমকের সুরে বলল, ‘মিছিল থামবে, সামনে আগাবে না!’ এবং সবার দিকে বন্দুক তাক করা ছিল। আমরা কৌশলগত কারণে আবার গলির ভেতর ঢুকে গেলাম। জোহরের আজানের পর যখন গলির ভেতরে প্রায় ৪-৫ হাজার মানুষ জমে গেছে, আজান শেষ হতেই আমরা সবাই একযোগে মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

এবার যখন শাহবাগের দিকে এগোচ্ছি, দেখলাম আর্মিরা আমাদের পথ করে দিল, আর কোনো বাধা দিল না। আমি গর্ব করে বলি, শাহবাগ দখলের প্রথম দলটির সঙ্গে আমি ছিলাম। এর পরপরই খবর পেলাম সেনাপ্রধান ভাষণ দেবেন এবং জানতে পারলাম হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এভাবেই আমরা ৫ই আগস্টের ঐতিহাসিক বিজয়ের সাক্ষী হয়েছিলাম।
শাহবাগ থেকে যখন জনতা গণভবনের দিকে রওনা দিল, তখন হাঁটতে হাঁটতে পান্থপথের মোড়ে এসে আমি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ি। পরে আমাদের অফিসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আবার শহর দেখতে বের হই। গিয়ে দেখি ৩২ নম্বরে হাসিনার বাড়ি পোড়ানো হচ্ছে এবং সারা শহরের মানুষ জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করছে। আমার জীবনে দুটি বিজয় দেখেছি, একটি এরশাদ সরকারের পতনের দিন, আর একটি ৫ আগস্ট হাসিনার পতন।
এমআইকে/কেআই
