জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আয়োজন করা হয়েছিল ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শিরোনামের ওপেন কনসার্ট। কিন্তু সেখানে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। গান করছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী হাসান। এমন সময় ছুঁড়ে এলো বোতল; সরাসরি আঘাত করল হাসানের মাথায়।
পরিস্থিতি সামলে তখনই আবার গানের সুরে ফিরে যান এই গুণী তারকা। কিন্তু, শ্রোতাদের ক্যামেরায় তা ততক্ষণে ধরা পড়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ল অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে। অতঃপর, ঘটনাটিকে দেশের সংগীত ইতিহাসে অন্যতম ন্যাক্কারজনক ঘটনা হিসেবে দেখলেন নেটিজেনরা। তৈরি হলো ক্ষোভ, সমালোচনা। পাশাপাশি, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ্যের কনসার্ট আয়োজনও হয়ে উঠল বিতর্কিত।
সংগীতাঙ্গনে এ ঘটনায় যখন অস্থিরতা চলছে, এমতাবস্থায় যেন বিতর্ক বাড়াতে চাইলেন না হাসান। বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতেই দেখতে চান তিনি। তবে আহ্বান করলেন, শিল্পীদের রাজনৈতিক পরিচয়ে বিচার না করার।

শুক্রবার দিবাগত রাতে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া তার এক পোস্টে হাসান নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ‘ঘটনাটি আমার কাছে খুবই অপ্রত্যাশিত। দীর্ঘ সংগীতজীবনে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি কখনো হইনি। বহু বছর ধরে বাংলা ব্যান্ড সংগীত করছি। এই সময়ে বিচিত্র অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু মঞ্চে একজন শিল্পীর দিকে বোতল ছুড়ে মারা হতে পারে, এমনটা কখনো দেখিনি বা ভাবিনি। তারপরও আমি বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে চাই। আমি বিশ্বাস করতে চাই, যে এমনটি করেছে, সে হয়তো না বুঝেই করেছে।’
দেশের শিল্পীদের নিরাপত্তা ও সম্মানের বিষয়টি জোর দিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘আমার একটাই অনুরোধ, ভবিষ্যতে আমার দেশের কোনো শিল্পীই যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন। কনসার্টে আসা মানুষের মনে রাখা উচিত, শিল্পীরা এই দেশের, শিল্পীরা সবার। তারা এ দেশের মানুষের জন্যই গান করেন। বিনিময়ে তারা শুধু মানুষের ভালোবাসা চান। কোনো শিল্পীকে এভাবে অসম্মান করা বা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করা উচিত নয়।’

শিল্পীদের দলীয় পরিচয়ে বিচার না করার আকুল আবেদন জানিয়ে আর্ক ব্যান্ডের এই শিল্পী লেখেন, ‘আমাদের দেশে অনেক সময় শিল্পীদের রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করা হয়, এটা ঠিক নয়। একজন শিল্পী পাঁচ বা দশ বছরের জন্য শিল্পী নন, তিনি আজীবনের জন্যই শিল্পী। বিভিন্ন সময়ে সরকারি, বেসরকারি কিংবা রাজনৈতিক নানা আয়োজনে শিল্পীদের গান গাইতে হয়। তাই বলে তাকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ে ফেলে বিচার করা উচিত নয়। শিল্পীরা মানুষকে ভালোবেসে গান শোনান। তাই তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সবার দায়িত্ব।’
হাসানের এই স্ট্যাটাসের মন্তব্যের ঘরে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভক্ত থেকে শুরু করে সংগীতাঙ্গনের ছোট-বড় অনেক শিল্পী। তরুণ সংগীতশিল্পী তাসরিফ খান আক্ষেপ করে মন্তব্যে লেখেন, ‘আমরা এরকমই অশিক্ষিত এবং গন্ড মূর্খ। আমরা গুণীর কদর করতে জানি না ভাইয়া। ক্ষমা করবেন!’ একইভাবে অসংখ্য ভক্ত ও নেটিজেন মন্তব্যে লজ্জিত প্রকাশ করে গুণী এই শিল্পীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
এই কনসার্টে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কে বা কারা এটি করেছে, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে সংগীত ও অভিনয় অঙ্গনের তারকারা এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ফ্রি কনসার্টের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি প্রিন্স মাহমুদ, মীর মাসুম, মিশা সওদাগর, রবি চৌধুরী, লুৎফর হাসান ও তানভীর তারেকের মতো শিল্পীরা ঘটনার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
ডিএ
