বিজ্ঞাপন

প্রসঙ্গ সালমান শাহর রহস্যমৃত্যু

রাজসাক্ষী রিজভীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শাবনূর, দিলেন বিশদ ব্যাখ্যা

রাজসাক্ষী রিজভীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ শাবনূর, দিলেন বিশদ ব্যাখ্যা

তিন দশক ধরে দেশের চলচ্চিত্রে সবচেয়ে আলোচিত ও রহস্যময় ঘটনা হয়ে আছে সালমান শাহর মৃত্যু। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাসায় তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। সেই থেকে এই ঘটনা এখনো চর্চার কেন্দ্রে। মামলাও রয়েছে চলমান।

সালমান শাহর মৃত্যুর পর এক মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ। সে সময় রাজসাক্ষী হয়ে ‘সালমান শাহ’কে হত্যাকাণ্ডে কয়েকজনের সঙ্গে নিজেও দায়ী বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি একাধিক সাক্ষাৎকারে সালমান শাহ প্রসঙ্গে বারবার শাবনূরের নাম টেনে এনেছেন রিজভী। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী। শনিবার দীর্ঘ এক ফেসবুক বার্তায় দিয়েছেন বিশদ ব্যাখ্যা।

‘রিজভীর গালগল্প ও অসত্য বয়ান’ শীর্ষক ওই বার্তায় শাবনূর লেখেন, “সালমান শাহর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে যে ব্যক্তি রাজসাক্ষী হয়েছিল, তার নাম রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ। এই ব্যক্তি অন্য একটি মামলায়, সালমান শাহর ছোট ভাই শাহরান চৌধুরী (বিল্টু)-কে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে রাজসাক্ষী হয়েছিল। ওই জবানবন্দিতে সে দাবি করে যে, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আরও কয়েকজনের সঙ্গে সে জড়িত ছিল। তখন সে প্রায় ৯ মাস কারাগারে বন্দী ছিল। তার নিজের ভাষ্যমতে, কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার কিছুদিন পরই সে যুক্তরাজ্যে দেশান্তরিত হয়। পরবর্তীতে সেখানে অবস্থানকালে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় সে আবারও সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। কিন্তু ২০১৯ সালে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সময় টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়ে দাবি করে, সে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় এবং সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিল। আশ্চর্যের বিষয়, সালমানের মৃত্যুর দীর্ঘ ২৯ বছর পর অল্প কিছুদিন আগে ‘আরজে নীরব’ ও ‘সময় টিভি’কে দেওয়া দুটি পৃথক সাক্ষাৎকারেও সে আবার একই দাবি করে যে, সালমান শাহর মৃত্যু হত্যা নয়, বরং আত্মহত্যা। শুধু তাই নয়, সে ওই আত্মহত্যার জন্য সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীকে দায়ী করে। পাশাপাশি, প্রথমবারের মতো আমার বিরুদ্ধেও মিথ্যা অভিযোগ তোলে এবং আমাকেও ওই ঘটনার জন্য বারবার দায়ী করে কথা বলে।”

সিনেমার দৃশ্যে সালমান শাহ ও শাবনূর

এরপর শাবনূর প্রশ্ন ছোড়েন, তাহলে রিজভীর কোন বক্তব্য সঠিক? শাবনূর লেখেন, “একই ব্যক্তি যখন সময়ে সময়ে একই ঘটনার বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেয়, তখন তার সর্বশেষ দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত তার দেওয়া দুটি সাক্ষাৎকারে সে বিভিন্ন বিষয়ে আরও অনেক অসঙ্গগতিপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও অসত্য বক্তব্য দিয়েছে। তার বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করলে সবার কাছেই সেগুলো সাংঘর্ষিক, বানোয়াট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হবে। অতি সম্প্রতি ‘আরজে নীরব’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিজভী আহমেদ বলেছে, আমার প্রতি তার ভালোবাসার কথা সে কোনো দিন প্রকাশ করতে পারেনি। তবে মনে মনে নাকি আমাকে এতটাই ভালোবাসতো যে আমাকে বিয়ে পর্যন্ত করতে চেয়েছিল, এবং এখনও চায়! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় একই সময়ে ‘সময় টিভি’কে দেওয়া আরেকটি সাক্ষাৎকারে সে আবার দাবি করেছে, আমি নাকি তার এক্স-গার্লফ্রেন্ড ছিলাম। শুধু তাই নয়, সে আরও দাবি করেছে যে ২০১৬ সালে আমার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল এবং ২০১৮ সালে আমাদের ডিভোর্স হয়েছে! এখন প্রশ্ন হলো, সে তো ১৯৯৯ সাল থেকেই প্রায় ২৬-২৭ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছে এবং তার নিজের দাবি অনুযায়ী, ওই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশেই আসেনি। অন্যদিকে, আমি ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কখনোই যুক্তরাজ্যে যাইনি। তাহলে আমার সঙ্গে তার বিয়েটা কোথায় হলো? কীভাবে হলো? এর প্রমাণই বা কী? আরও মজার বিষয় হলো, সে যে সময়ের কথা বলছে, তার অনেক আগ থেকেই আমি বিবাহিত ছিলাম। তার সঙ্গে সম্পর্ক তো দূরের কথা, তাকে আমি কখনো দেখেছি বলেও মনে পড়ে না, আমি তাকে চিনিই না। তার এসব কথা শুনে মনে হচ্ছে, আমার সঙ্গে তার বাস্তবে কোনো বিয়ে নয়, হয়তো শুধু ‘স্বপ্নের বাসর’-ই হয়েছিল!”

শাবনূর জানান, রিজভীকে তিনি আগে থেকে চিনতেন না। সালমান শাহর মৃত্যুর পর রাজসাক্ষী হওয়ার ঘটনায় এই ব্যক্তির নাম শোনেন অভিনেত্রী। শাবনূর তার বক্তব্যে লিখেছেন, ‘রিজভী আহমেদ প্রবল বিদ্বেষের সঙ্গে দাবি করেছে যে আমি নাকি সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেইল করতাম, এবং তার আত্মহত্যার জন্য আমাকে দায়ী করেছে। অথচ রিজভীর নাম আমি প্রথম শুনেছি সালমান শাহর মৃত্যুর পর, যখন সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার ঘটনায় রাজসাক্ষী হয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন হলো, সে কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে দাবি করছে যে আমি সালমান শাহকে ব্ল্যাকমেইল করতাম? রিজভী দাবি করছে, আমি নাকি কূটনামী করতাম বা সালমান ও তার স্ত্রীর একের কথা অন্যের কানে লাগাতাম। এমন ভিত্তিহীন গুজব আরও কিছু অসৎ ব্যক্তি ছড়িয়েছে বলে শুনেছি। এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ ধরনের আচরণ কখনোই আমার স্বভাবের মধ্যে ছিল না। আমার পরিবারও আমাকে এমন শিক্ষা দেয়নি। আর এসব করার সময়ও আমার ছিল না। চলচ্চিত্র অঙ্গনের কেউই কোনোদিন বলতে পারবেন না যে আমি কারও সঙ্গে এমন কূটনামী করেছি।’

শাবনূর স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, ‘রিজভী আহমেদের সঙ্গে আমার কখনো কোনো যোগাযোগ ছিল না, এখনও নেই। সে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো করেছে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং অত‍্যন্ত মানহানিকর।’  

শাবনূর ও সালমান শাহ

ভিসা ও পাসপোর্ট ছাড়া যুক্তরাজ্যে যাওয়া, সেখানে বাড়ি কেনা কিংবা সালমান খান ও শাহরুখ খানদের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়াসহ বিভিন্ন দাবি করেছেন রিজভী; সেগুলোকেও বিশ্বাসের কাঠগড়ায় রেখেছেন শাবনূর।

অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী (আন্টি) তার ছেলের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে পুনরায় মামলা করার পর, ওই মামলায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। মামলার মুড় ঘুরে যাওয়ার কারণে অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই আমার ধারণা, তাদের প্ররোচনায় বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে, এমনকি আর্থিক প্রলোভনে পড়েও রিজভী আহমেদ আমার ও নীলা আন্টির বিরুদ্ধে এসব ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে। নিজেদের রক্ষা করা এবং প্রকৃত সত্যকে আড়াল করাই হয়তো তাদের উদ্দেশ্য। আমি বরাবরের মতোই স্পষ্ট করে বলতে চাই, সালমান শাহর মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র কোনো সংযোগ ছিল না। তিনি কীভাবে মারা গেছেন, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। সালমান শাহ শুধু একজন জনপ্রিয় নায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমার অত্যন্ত প্রিয় সহশিল্পী এবং বড় ভাইয়ের মতো একজন মানুষ। তার অকাল মৃত্যু আজও আমাকে ব্যথিত করে।’

সবশেষে ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়ে শাবনূর লেখেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে চাই, একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হোক এবং এই ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

কেআই