চার দেয়ালে ঘেরা নিজের প্রিয় ঘরটিই যদি হঠাৎ অবরুদ্ধ কারাগারে পরিণত হয়? চারপাশের জানা পৃথিবীটা যদি নিমেষেই ঢেকে যায় রহস্য আর এক অজানা আতঙ্কে? এমন এক দমবন্ধ করা গল্প নিয়ে সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে নতুন সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘দ্য লাস্ট হাউস’। মুক্তির পর থেকেই চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে সিনেমাটি নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল কৌতূহল ও আলোচনা।
স্ক্রিনরাইটার ম্যাথিউ রবিনসনের চিত্রনাট্য এবং ‘ফাস্ট এক্স’ খ্যাত পরিচালক লুই লেটেরিয়ারের পরিচালনায় এই সিনেমাটি দর্শকদের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক রোমাঞ্চের মুখোমুখি করে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আন (গ্রেটা লি) এবং জেসন (ওয়াগনার মৌরা)। দুই সন্তান গ্রাহাম ও রুথকে নিয়ে তাদের সুখী পরিবারটি হুট করেই এক চরম বিপদের মুখে পড়ে।
গল্পের সূচনা এক অস্বাভাবিক বৃষ্টির দিন থেকে। পরিবারের সদস্যরা দেখে, তাদের ঘরের সব দরজা-জানালা এক রহস্যময় জলীয় শক্তিতে শক্তভাবে আটকে গেছে। কাচ ভেঙে বা কোনো উপায়েই বাইরে বের হওয়ার পথ নেই। ঘরে জমানো খাবার থাকায় প্রথম কয়েক সপ্তাহ তারা টিকে থাকলেও সময়ের সাথে সাথে আতঙ্ক বাড়তে থাকে। একে একে পানির নিচে হারিয়ে যায় স্বাভাবিক জীবন, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক। প্রতিবেশীদের অসহায় চিৎকার ঘরের ভেতর থেকেই শুনতে পায় তারা।
একদিন রক্ত হিম করা এক দৃশ্য দেখে পরিবারটি। বাইরে থেকে দৌড়ে আসা এক নারী তাদের জানালায় আঘাত করে চিৎকার করে বলতে থাকেন, “সবাই মারা গেছে,” “ওদের আপনাকে দেখতে দেবেন না।” এবং “ওরা এসে পড়েছে, কোনো সাহায্যই আসবে না।” মুহূর্তের মধ্যেই জলজ এক হিংস্র সত্তা টেনে নিয়ে যায় সেই নারীকে। পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারে, বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক অদ্ভুত জলজ দানব, যারা একটু শব্দ বা আলোর সংকেত পেলেই আক্রমণ করে।
খাবারের সংকট, গৃহপালিত কুকুরের মৃত্যু এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ৩ বছর কেটে যায় ঘরের ভেতরেই। চার দেয়ালকে ফার্মহাউসে রূপান্তর করে সবজি চাষ করে বাঁচতে শেখে তারা। তবে বাড়ির ভিত্তি ধসে যাওয়া এবং বিষাক্ত লোনা জলের প্রভাবে পানির সংকট দেখা দিলে নতুন বিপদের সম্মুখীন হতে হয় তাদের। ছোট মেয়ে রুথ অসুস্থ হয়ে পড়লে জেসন ড্রেনের সুয়ারেজ লাইন দিয়ে পাশের চিকিৎসকের ঘর থেকে ওষুধ নিয়ে আসার পরিকল্পনা করে।
অবশেষে শক্তিশালী সাইক্লোন আর অস্বাভাবিক বন্যায় পুরো ঘর প্লাবিত হয়। হিংস্র জলজ প্রাণীর সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামতে হয় জেসন ও আনকে। কিন্তু একপর্যায়ে ঘরটি ভাঙনের মুখে পড়লে, জেসন আটকে পড়া একটি দানবীয় প্রাণীকে সাহায্য করে মুক্ত করে দেয়। জেসনের এই মানবিক আচরণের প্রতিদান হিসেবে প্রাণীটি তাদের কোনো ক্ষতি না করে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ দেয়।
ধসে পড়া বাড়ি থেকে রক্ষা পেয়ে তারা দেখে পানির নিচে তলিয়ে গেছে পুরো সিয়াটল শহর। শহরের পরিচিত 'স্পেস নিডল' ল্যান্ডমার্কটিও প্রায় পানির নিচে। মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে যখন পরিবারটি নৌকায় নতুন জীবনের দিকে এগোয়, তখন রুথের কণ্ঠে একটি কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হয়: “আমরা তাদের আর কখনোই দেখিনি, তবে আমাদের মনে হয় তারা এখনও এখানেই আছে। সর্বোপরি, এটি তো এখন তাদেরও ঘর।”
ছবির শেষ দৃশ্যে রেডিওর মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ওপাশ থেকে ভেসে আসে আশা জাগানিয়া উত্তর “হ্যালো?” কূলহীন জলরাশির বুকে বেঁচে থাকা এক নতুন সভ্যতার বার্তা দিয়ে শেষ হয় সিনেমাটির গল্প। গল্প জুড়ে চরম রহস্য, সম্পর্কের গভীরতা এবং প্রকৃতির পরিবর্তনের অদ্ভুত চিত্রায়নের কারণেই বিশ্বজুড়ে সিনেমাপ্রেমীদের মন জয় করে নিচ্ছে ‘দ্য লাস্ট হাউস’।
এমআইকে
