তিনি গাইতেন, গাইতো যেন তার গিটারও। লিখতেন, সুর করতেন, আর স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন তাকে যতদূর নিয়ে গেছে, তার চেয়ে বেশি এগিয়ে দিয়েছে বাংলার ব্যান্ড সংগীতকে। আজ সেই নন্দিত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে হয়তো সতীর্থদের সঙ্গে দিনটি কাটত। কিন্তু তিনি না থাকলেও তাকে ঘিরে নানা আয়োজন তো চলছেই।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে ঢাকা পোস্ট এবার বিশেষ আয়োজন সাজিয়েছে। তার পরবর্তী প্রজন্মের বিভিন্ন ব্যান্ড তারকার কাছ থেকে শুনেছে ‘এবি’র কথা। তাদের স্মৃতি, জীবন ও গানে কতটা মিশে আছেন ‘এলআরবি’র জনক?
এ পর্বে বলেছেন ‘মেকানিক্স’ ব্যান্ডের ভোকাল আফতাবুজ্জামান ত্রিদিব :
বাচ্চু ভাই আমার ক্ষেত্রে দুইরকম রোল প্লে করছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার মিউজিক ক্যারিয়ারে এবং মেকানিক্সের পথচলায়। ১৯৯০-র দশকের প্রথম দিকে, আমি তখন খুবই ছোট; ৭-৮ বছর বয়স। তখন আসলে ওনার ওই গানগুলো শুধু আমাদেরই না, পুরো বাংলাদেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে গান-বাজনা করার জন্য, অনেকের ক্ষেত্রে হয়তো বা জীবনের ফিলোসফিক্যাল দিক থেকে প্রভাবিত করেছে। কারণ ওনার লিরিকগুলো অনেক স্ট্রেট ফরওয়ার্ড ছিল এবং উনি সবার জন্য গান করেছেন। হকারের জন্য ওনার গান আছে, আবার ওনার ‘মাধবীর মতো গানও আছে। এরকম একটা আর্টিস্টকে সবাই রিলেট করতে পারে। সো, বাচ্চু ভাই ওয়াজ ভেরি রিলেটেবল ইন নাইন্টিজ।

২০০০ সালের পর থেকে যখন আমরা মিউজিক শুরু করলাম, বাচ্চু ভাই ওয়াজ লাইক আ কোচ, হি ওয়াজ লাইক আ মেন্টর। ডেকে ডেকে বলেছেন, ‘এই তুই কতটুকু প্র্যাকটিস করিস? এই তোদের গিটারিস্টটা ভালো বাজায়নি, তোরা এভাবে এভাবে গান বানা, এদিকটা ফোকাস করে গান বানা বা তোদের ড্রামার ভালো বাজায়।’ নতুন সব ব্যান্ডকেই তিনি এভাবে উৎসাহ পরামর্শ দিতেন।
বাট বাচ্চু ভাই সবসময় আমাদের আলাদাভাবে দেখলেও বলতেন, ‘তোর এই গান গাওয়াটা আরও ঠিক কর’ বা ‘তুই এই গানটা আরও সুন্দর করে গা’ বা ‘তোদের এ গানটা খুব ভালো হয়েছে’। মানে যেটাকে বলে যে গাইড করা, সেটা তিনি বরাবরই করেছেন। বাচ্চু ভাইয়ের মতো মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা শুনলে তখন অন্যরকম খুশি লাগতো। মনে হতো, উই হ্যাভ অ্যাচিভড সামথিং। এবং বাচ্চু ভাই ওই জিনিসটাকেই প্রেইজ করতেন, যেটা আসলে প্রেইজ পাওয়ার মতো।

বাচ্চু ভাই বলতেন, আমরা যেন কখনো মিউজিকটা বন্ধ না করি। আমাদের গিটারিস্ট মারা যাবার পর বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। একসঙ্গে ১৫ বছর মিউজিক করার পর জেহীন আহমেদকে হারালাম। ওর বাবা, মানাম আহমেদও (সংগীতশিল্পী) আমাদের অনেক সাপোর্ট দিয়েছেন। বাচ্চু ভাইয়ের যে কথাটা আমার সবসময় মনে পড়ে, ‘তুই কিন্তু কোনোদিন মিউজিক বন্ধ করতে পারবি না। তোরা যতদিন গান-বাজনা করবি, জেহীন বেঁচে থাকবে।’ পুনরায় মেকানিক্সের জার্নি কন্টিনিউ হওয়ার পেছনে এটা আমাদের জন্য অনেক বড় উৎসাহ ছিল।
কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার, এক বছর পর বাচ্চু ভাইকেই আমরা হারিয়ে ফেললাম। আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে ধাক্কা ছিল, বাচ্চু ভাই-জেহীন দুজনকেই খুব কাছাকাছি সময়ে হারিয়ে ফেলা। জীবনে একটা শখ ছিল, ২০১৪ সালের দিকে বাচ্চু ভাইকে নিয়ে একটা শো করব। সেটার জন্য আমরা প্র্যাকটিসও করেছিলাম। কিন্তু কোনো কারণে আর হয়ে ওঠেনি। সেই শো আমরা ২০২৫-এ এসে করলাম মেকানিক্সের ২০ বছর উপলক্ষে। অনেকেই ছিলেন, কেবল বাচ্চু ভাই ছিলেন না। এই দুঃখবোধ হয়তো সারাজীবন থেকে যাবে। বাচ্চু ভাই ওয়াজ অ্যান অ্যামেজিং মিউজিশিয়ান। তিনি শিখিয়ে গেছেন, প্রফেশনালি কীভাবে মিউজিক করতে হয়।
লালনের গান এখনো চর্চা হয় দেখে লালন কিন্তু এখনো বেঁচে আছেন। আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু উনারা হচ্ছেন আমাদের পথপ্রদর্শক। কেবল বাংলাদেশে না, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় তারা কিংবদন্তি। সো, তাদের গানগুলো আসলে চর্চা করা দরকার, প্র্যাকটিস করা দরকার, রিসার্চ করা দরকার। বাচ্চু ভাইয়ের গানগুলো যাতে চর্চা করার জন্য প্রপার ইন্সটিটিউশন করা হয়, এটা আমার চাওয়া। নতুন আর্টিস্টদেরকে উৎসাহ দিতে হবে, তারা যেন উনার গানগুলো প্র্যাকটিস করে।
ডিএ/কেআই
