তিনি গাইতেন, গাইতো যেন তার গিটারও। লিখতেন, সুর করতেন, আর স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন তাকে যতদূর নিয়ে গেছে, তার চেয়ে বেশি এগিয়ে দিয়েছে বাংলার ব্যান্ড সংগীতকে। আজ সেই নন্দিত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে হয়তো সতীর্থদের সঙ্গে দিনটি কাটত। কিন্তু তিনি না থাকলেও তাকে ঘিরে নানা আয়োজন তো চলছেই।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে ঢাকা পোস্ট এবার বিশেষ আয়োজন সাজিয়েছে। তার পরবর্তী প্রজন্মের বিভিন্ন ব্যান্ড তারকার কাছ থেকে শুনেছে ‘এবি’র কথা। তাদের স্মৃতি, জীবন ও গানে কতটা মিশে আছেন ‘এলআরবি’র জনক?
এ পর্বে বলেছেন ‘ওয়ারফেজ’-এর ভোকাল পলাশ নূর :
বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। উনি আমাকে খুব আদর করতেন। ওনার জীবনের শেষ টিভি শো আমার সঙ্গেই করেছিলেন। যমুনা টিভিতে ‘ছুটির রাতের লাইভ’ নামে একটা মিউজিক্যাল শো উপস্থাপনা করি আমি, এটা এখনো প্রচারিত হয় প্রতি শুক্রবার রাত ১১টায়। ওই পর্বটা আমরা বাচ্চু ভাইকে নিয়ে এক্সক্লুসিভ করেছিলাম। সেদিন বাচ্চু ভাই আমাকে অনেক আদর করেছেন। এমন কিছু আবেগঘন কথা বলেছিলেন, যা আসলে আমাকে বলার কথা নয়। আমি খুব অবাক হচ্ছিলাম, উনি আমাকে এত আদর করছেন এবং এত আবেগঘন কথা বলছেন! অনুষ্ঠানে গানের বিরতির এক মুহূর্তে উনি আমাকে বললেন, “আজ ‘সেই তুমি’ গানটা আমি গাইব না, তুমি গাইবে।” আমি তো অবাক হয়ে গেলাম! অনুষ্ঠানটা ইউটিউবেও আছে। এরপর উনি নিজে গিটার বাজালেন আর আমি গানটা গাইলাম। ওই স্মৃতি আমি জীবনেও ভুলব না।
শো-এর পরের একটা কথা বলি। শোটি ছিল বাচ্চু ভাইয়ের জন্মদিনের ঠিক পরের দিন। আমি একটা কেক নিয়ে গিয়েছিলাম। শো শেষে যখন ব্রেক ছিল, তখন ব্যান্ডের অন্যান্য মেম্বারদের পাশাপাশি শামীম ভাই ও মাসুদ ভাইও ছিলেন। কিন্তু বাচ্চু ভাই কাউকে কেকটা খাইয়ে না দিয়ে সবার প্রথমে কেক কেটে আমার মুখে তুলে দেন! এটা আমি কখনো ভুলব না।
এরপর উনি আমার বুকে হাত রেখে বলতে থাকেন, ‘তুমি অনেক বড় হবে। তুমি জাস্ট তোমার মতো করে যেভাবে আগাচ্ছ, সেভাবেই এগিয়ে যাও। অনেকেই অনেক কথা বলবে, অনেকে পা ধরে টেনে নামাতে চাইবে, তোমাকে উঠতে দেবে না। কিন্তু তোমার মধ্যে যে শক্তি আছে, এটা আমি দেখেছি।’ একজন সিনিয়র মিউজিশিয়ান নিজে থেকেই আমাকে ডেকে এই কথাগুলো বলছিলেন!

বাংলাদেশে আমরা যারা ব্যান্ড মিউজিক করি বা করতে চাই, আমাদের সবার ভেতরে একটা করে ‘আইয়ুব বাচ্চু’ বাস করেন। উনি ডিরেক্টলি হোক বা ইনডিরেক্টলি, আমাদের সবাইকে প্রতিদিন ইন্সপায়ার করেন। মিউজিক এবং আইয়ুব বাচ্চুকে আলাদা করা যাবে না, এই দুটো আসলে এক আত্মা। কারণ বাচ্চু ভাইয়ের গিটার প্লেয়িং এবং উনার উপহার দেওয়া গানগুলো নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে থাকবে, বাংলা গানে থাকবে।
‘ওয়ারফেজ’ এবং আইয়ুব বাচ্চু উভয়েই সম্মাননা পেয়েছেন (একুশে পদক)। বাচ্চু ভাই যদি বেঁচে থাকতে এটা পেতেন, তবে আরও অনেক বেশি খুশি হতেন এবং ভালো লাগত। তবুও উনাকে এটি দেওয়া হয়েছে, এতেই বোঝা যায় উনাকে আমরা কতটা শ্রদ্ধা করি, অ্যাডমায়ার করি, ভালোবাসি এবং অনুসরণ করি।
বাচ্চু ভাই নতুন মিউজিশিয়ানদের ভীষণ পছন্দ করতেন, নতুনদের খুব ইন্সপায়ার করতেন। বাংলাদেশের খুব কম সিনিয়র মিউজিশিয়ানদের মধ্যে এই গুণটা দেখা যায়। তরুণদের উদ্দেশে বাচ্চু ভাই সেদিন বলেছিলেন, ‘তুমি যেটা জানো, হয়তো তুমি গিটার বাজাতে পারো, সেটাই বাজাতে থাকো। তুমি যে ফিল্ডে এক্সপার্ট, সেটার পেছনেই লেগে থাকো। ফোকাসটা ঠিক রাখো, অন্য কোনো দিকে দেখার দরকার নেই। তোমার যদি মনে হয় গানটাই তোমাকে দিয়ে হবে, তবে গানটাই মন দিয়ে করে যাও।’ এই ফোকাস ঠিক রাখা আর একনিষ্ঠভাবে লেগে থাকা এটাই আমাদের জন্য অনেক বড় ইন্সপিরেশন হতে পারে।
বাচ্চু ভাই সামনে থাকা মানেই আমাদের জন্য আনন্দের। কনসার্টে বা দেখা হলে আমি সবসময় উনাকে কদমবুসি করতাম, সালাম করতাম। আজ যদি উনি বেঁচে থাকতেন, তবে উনার কাছে গিয়ে বলতাম, ‘বাচ্চু ভাই, আমার নতুন এই গানটা রিলিজ হয়েছে, গানটা কেমন হয়েছে একটু বলেন। আপনার ফিডব্যাকটা দিন।’ উনার কাছে আসলে গানের ফিডব্যাক নিতাম। উনার প্রতিটি কথা অত্যন্ত মূল্যবান ছিল, যা আমাদের সফলতার পেছনে বড় কারণ হতে পারত।

একটি অদ্ভুত বিষয় বলি, যা শুনলে আপনারা অবাক হবেন। বাচ্চু ভাই যখন ইন্তেকাল করেন, আমি উনার লাশের চেহারা দেখিনি। এর কারণ হলো আমার বাবা যখন মারা যান, আমি বাবার মৃত মুখ দেখেছিলাম। কিন্তু মা যখন মারা যান, মায়ের শেষ চেহারা আমি দেখিনি। বাবা মারা যাওয়ার পর উনার সেই ডেথ চেহারাটাই চোখ বন্ধ করলে বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠত। কিন্তু মায়ের হাসোজ্জ্বল মুখটা আমার মনে থেকে গেছে। সেই কারণেই বাচ্চু ভাইয়ের লাশের কাছে গিয়েও চেহারা দেখিনি। আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই বাচ্চু ভাই হাসছেন, কথা বলছেন। উনার মৃত চেহারা দেখলে আমার মনের যন্ত্রণাটা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেত। কারণ বাচ্চু ভাই নেই, এই সত্যটা মেনে নেওয়া এখনো আমাদের জন্য ভীষণ কষ্টের।
এমআইকে/কেআই
