তিনি গাইতেন, গাইতো যেন তার গিটারও। লিখতেন, সুর করতেন, আর স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন তাকে যতদূর নিয়ে গেছে, তার চেয়ে বেশি এগিয়ে দিয়েছে বাংলার ব্যান্ড সংগীতকে। আজ সেই নন্দিত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে হয়তো সতীর্থদের সঙ্গে দিনটি কাটত। কিন্তু তিনি না থাকলেও তাকে ঘিরে নানা আয়োজন তো চলছেই।
আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে ঢাকা পোস্ট এবার বিশেষ আয়োজন সাজিয়েছে। তার পরবর্তী প্রজন্মের বিভিন্ন ব্যান্ড তারকার কাছ থেকে শুনেছে ‘এবি’র কথা। তাদের স্মৃতি, জীবন ও গানে কতটা মিশে আছেন ‘এলআরবি’র জনক?
এ পর্বে বলেছেন ‘সোনার বাংলা সার্কাস’-এর প্রাণভোমরা প্রবর রিপন :
নব্বইয়ের দশকে গান শোনা এবং গাওয়া দিয়ে আমার যাত্রা শুরু। ফলে পুরো নব্বই দশকই আমার ওপর অনেক প্রভাব ফেলেছিল। যখন গ্রামে ছিলাম, সেখানে বাচ্চু ভাই ছিলেন, জেমস ভাই ছিলেন, মাইলস, ফিডব্যাক, ওয়ারফেজ এবং আজম খান ছিলেন। ছোটবেলায় বাচ্চু ভাই ব্যাপক একটা বিষয় ছিলেন। ছোটবেলায় আমার তো সব ধরনের মিউজিকের প্রতিই অনেক ভালোবাসা ছিল; তবে রক মিউজিকের প্রতি ভালোবাসার মূল কারণই ছিলেন বাচ্চু ভাই ও জেমস ভাই।
ব্যক্তিগত স্মৃতি বলতে, আমার বরং একটা আক্ষেপ রয়েছে। বাচ্চু ভাই তো মূলত ব্লুজ ঘরানার মিউজিশিয়ান ছিলেন এবং এই ঘরানা ওনার অনেক পছন্দের ছিল। আমার নিজেরও এই ঘরানার প্রতি অনেক আসক্তি রয়েছে। আমি যখন প্রথম ব্যান্ড ‘মনোসরণি’র প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করি, তখন অ্যালবামটি ওনাকে উপহার দেওয়ার জন্য বাসায় গিয়েছিলাম। আগে থেকে যোগাযোগও করা হয়েছিল। কিন্তু আমি যখন সেখানে যাই, তখন কোনো একটা কারণে হয়তো অসুস্থতা বা অন্য কোনো প্রয়োজনে উনি বাসার বাইরে ছিলেন। ফলে উনার সাথে আমার আসলে ওইভাবে কখনো দেখাই হয়নি। তাই স্মরণীয় স্মৃতি বলতে কনসার্টেই ওনাকে দেখেছি; কিন্তু সামনাসামনি কথা বলা বা অ্যালবামটি হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ হয়নি।

আমাদের ‘হায়েনা এক্সপ্রেস’ অ্যালবামটি উনি নিশ্চিতভাবেই পছন্দ করতেন। কিন্তু ‘সোনার বাংলা সার্কাস’-এর গান যে উনি শুনে যেতে পারলেন না এবং আমরাও উনাকে শোনাতে পারলাম না, যেটগা উনি নিশ্চিতভাবেই অনেক পছন্দ করতেন, সেই স্মৃতিটা যে তৈরি হলো না, এটাই আমার জন্য আক্ষেপের বিষয়।
আইয়ুব বাচ্চু ভাই যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে উনাকে বলতাম যে, ওনাদের কারণেই আজ আমাদের জন্ম হয়েছে। আর উনি আমাদের গান শুনলে উনিও বুঝতেন যে, আমাদের জন্ম আসলে কোথা থেকে হয়েছে। ওনাকে শুধু বলতাম, আপনাকে অনেক ভালোবাসি।
নতুন প্রজন্মের বিষয়ে বলব, বর্তমান সময়ের নতুনরা অনেক বেশি চিন্তিত থাকে, মানুষ কী গান শুনছে, মানুষ গানগুলো কীভাবে নিচ্ছে, কিংবা মানুষ গানটা বুঝছে কিনা। গান শোনা না-শোনা নিয়ে মানুষকে ছোট করা বা বড় করার যে বিষয়গুলো, ওনারা কিন্তু কখনো এসব করতেন না। ওনাদের প্রতি সব ধরনের মানুষের ভালোবাসা ছিল। একটি গান কতখানি চলল বা চলল না, তা ভাবার মতো সময় ওনাদের পুরো ক্যারিয়ারে ছিল না। ওনারা প্রত্যেকেই ক্যারিয়ারে পাঁচ-ছয়শত করে গান রেকর্ড করে গেছেন; বাচ্চু ভাই বলুন বা অন্য যার কথাই বলুন না কেন। ওনারা নন-স্টপ নতুন নতুন সৃষ্টির ভেতর ব্যস্ত থাকতেন।
ওনারা আমাদের মতো ছিলেন না যে, বছরে একটি গান রেকর্ড করে সেটি মানুষ গ্রহণ করল কিনা এমন আশা-হতাশা কিংবা নানা হিসাব-নিকাশের ভেতর নিজেকে নিমজ্জিত করবেন। তাই নতুন শিল্পীদের এখান থেকে বড় শিক্ষা হলো, মানুষের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজে টানা কাজ করে যেতে পারছি কিনা। আর শ্রোতাদের ছোট-বড় করা উচিত নয়, শ্রোতারা সবাই সমান। কেউ হয়তো আমার গান ভালোবাসবে, কেউ বাসবে না। কিন্তু এ কারণে শ্রোতাদের ছোট-বড় করার কিছু নেই।

ওনাদের কাছ থেকে শেখার আরেকটা বড় বিষয় হলো, ওনারা শুধু মিউজিককেই ভালোবেসে গেছেন। গানের পাশাপাশি অন্য কিছু করেননি বলেই ওনারা মিউজিক্যালি এত বেশি সফল হতে পেরেছেন। ওনারা নিজেদের জীবন নিয়ে বাজি ধরেছিলেন, হয় মিউজিক দিয়ে কিছু হবে, না হয় হবে না। দুই নৌকায় পা দিয়ে তারা চলেননি। তারা কেবল এক নৌকায় পা দিয়ে ভেবেছেন ‘আমি মিউজিক করব, এটা দিয়েই কিছু একটা হবে।’
এবারের জন্মদিন উপলক্ষে বাচ্চু ভাইয়ের কিছু গান নিয়ে একটা প্রজেক্ট হয়েছে। এখানে আমিও একটি গান গেয়েছি। বাচ্চু ভাইয়ের ফ্যামিলি থেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওনার ব্যবহৃত গিটারগুলো সংরক্ষণ করে ‘গিটার মিউজিয়াম’ করার তহবিল সংগ্রহের জন্য একটা ডাবল অ্যালবাম তৈরি করছেন। এটি সিডি ও ভিনাইল আকারে প্রকাশ করা হবে। তারা আমাদের কাছে জানতে চান, এতে অংশ নিতে আগ্রহী কিনা। আমরা নির্দ্বিধায় রাজি হয়ে গেলাম।
এমআইকে/কেআই
