বিজ্ঞাপন

স্মৃতিতে স্মরণে আইয়ুব বাচ্চু

শেষ দিকে ওনার দুঃখ ছিল, অভিমান ছিল : জুনায়েদ ইভান

শেষ দিকে ওনার দুঃখ ছিল, অভিমান ছিল : জুনায়েদ ইভান

তিনি গাইতেন, গাইতো যেন তার গিটারও। লিখতেন, সুর করতেন, আর স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন তাকে যতদূর নিয়ে গেছে, তার চেয়ে বেশি এগিয়ে দিয়েছে বাংলার ব্যান্ড সংগীতকে। আজ সেই নন্দিত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে হয়তো সতীর্থদের সঙ্গে দিনটি কাটত। কিন্তু তিনি না থাকলেও তাকে ঘিরে নানা আয়োজন তো চলছেই। 

আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে ঢাকা পোস্ট এবার বিশেষ আয়োজন সাজিয়েছে। তার পরবর্তী প্রজন্মের বিভিন্ন ব্যান্ড তারকার কাছ থেকে শুনেছে ‘এবি’র কথা। তাদের স্মৃতি, জীবন ও গানে কতটা মিশে আছেন ‘এলআরবি’র জনক?

এ পর্বে বলেছেন ‘অ্যাশেজ’ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট জুনায়েদ ইভান

বাচ্চু ভাই যে কত বড় মাপের একজন মানুষ ছিলেন, তার উদাহরণ দিচ্ছি। আমরা যে বলি গণমানুষের গায়ক, হ্যাঁ? আমাদের দেশে ব্যান্ড মিউজিকটা আসছে, তখন এটা ছিল ওয়েস্টের একটা সাউন্ড। সো ওয়েস্টের সাউন্ডকে আমরা মডিফাই করেছি, আমাদের মতো করে ফিউশন করেছি। মানে এটা ওয়েস্ট ইনফ্লুয়েন্সড সাউন্ড; আমাদের এই লোকাল সাউন্ডের সাথে ফিউশন হয়ে এটা আমাদের মতো করে এই মিউজিকটাকে এগিয়েছি। যারা একদম প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ, যারা এই ধরনের ডিস্টরশন সাউন্ডগুলা নিতে পারতো না, বুঝতে পারতো না কিংবা তাদের বোধগম্য ভাষাটা আরেকটু সহজ, তাদের জন্য কিন্তু উনি গান করতেন। উনি একদিকে যখন ‘মাধবী’ কিংবা ‘গতকাল রাতে’-এর মতো গান করতেন, একইসাথে একদম প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের জন্যও গান করতেন। যেমন সিনেমায় তিনি ‘আম্মাজান’ করেছেন, যেটা সারা বাংলাদেশের মানুষ শুনেছে। দেশের সব মানুষকে, সব বয়সের মানুষকে এই যে এক সুতোয় গেঁথে ফেলার ব্যাপারটা তার মাঝে ছিল; যেটা বাংলাদেশে গুটি কয়েক মানুষ করতে পেরেছেন।

আপনি যদি এখনো ‘সেই তুমি’ কিংবা বাচ্চু ভাইয়ের যে কোনো একটা গানের দিকে তাকান, এগুলো কিন্তু ৩০ বছর, ৩৫ বছর, কিছু কিছু গান ৪ দশক ধরে বাজছে। এখনো প্রাসঙ্গিক।

বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। ওই সুবাদে ওনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ। আমি সারা দিন-রাত বাচ্চু ভাইয়ের গান শুনতাম। যখন গান শিখেছি, গিটারে হাত রেখেছি, এখানে-ওখানে গেয়েছি, ওনার পারফর্মেন্স অনুপ্রেরণার মতো কাজ করতো মনে। কিন্তু বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে যখন আমার ঘনিষ্ঠতা হয়, তখন আসলে বেশি সময় ওভাবে ওনাকে পাইনি। উনি চলে যাওয়ার শেষ চার-পাঁচ বছর আগে বেশি সখ্য গড়ে উঠেছিল। উনি আমাদের কনসার্টে আসতেন, আমার বাসায় আসতেন, আমাকে বিভিন্ন জায়গায় ডাকতেন। অনেক দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। 

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে জুনায়েদ ইভান

একদিন একটা রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার সময় দেখি, ওদের দেয়ালে বাচ্চু ভাইয়ের একটা পেইন্টিং, সুন্দর করে আঁকা একটা ছবি। ওটার ছবি তুলে বাচ্চু ভাইকে পাঠিয়েছিলাম। পাঠিয়ে বললাম যে, বাচ্চু ভাই দেখেন, আপনার কত সুন্দর একটা ছবি ওরা টানিয়ে রেখেছে। বাচ্চু ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি খুব খুশি হয়েছি, থ্যাঙ্ক ইউ। ওদেরকে বলিস, আমাদের দেশে আরো যাদের অবদান আছে, তাদের ছবিও যেন এখানে থাকে।’ উনি নাম মেনশন করেননি, হয়তো আজম খানের কথা, জেমস ভাইয়ের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। তো বাচ্চু ভাই ছিলেন এমন ব্যক্তিত্বের একজন মানুষ। 

আরেকটা বিষয়, বাচ্চু ভাই খুবই অভিমানী ছিলেন। ওনার সঙ্গে অনেক সময় কেটেছে। আমি ওনাকে যতটুকু চিনি, কাছ থেকে; প্রচণ্ড অভিমানী। উনি নিজের কথা খুব বেশি বলতে পছন্দ করতেন না। শেষ দিকে ওনার অনেক দুঃখ ছিল, অভিমান ছিল। মানে কাউকে কিছু বলতে চাইতেন না। উনি একা জীবনযাপন করতেন, নিঃসঙ্গতাকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন। আমাকে বলতেন, ‘আমি ১৬ কোটি মানুষকে গান শোনাই, আমার দায়বদ্ধতাটা অনেক বেশি। আমি ইমোশনালি কোনো কথা বা একটা মুভমেন্ট করতে পারি না।’ এই কথাগুলো উনি বলেছিলেন চলে যাওয়ার কয়েক বছর আগে।

বাচ্চু ভাইয়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। মানুষের জায়গা হচ্ছিল না মাঠে। তো আমরা পাশে একটা রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। সেখানে এক নারী আমাদের ডাক দেন। গেলাম। উনি আমাদেরকে একগুচ্ছ ফুল দিলেন। উনি অন্য ধর্মের। ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী যেহেতু কাছে গিয়ে দিতে পারবেন না, তাই আমাদেরকে ফুলগুলো দিয়েছিলেন; যেন আমরা তার পক্ষ থেকে সেগুলো দিয়ে আসতে পারি। তো এই যে দৃশ্যটা, এই যে গল্পটা—একজন নারী, অন্য ধর্মের এবং যিনি একা দাঁড়িয়ে আছেন! এ ঘটনাটি প্রমাণ করে, বাচ্চু ভাইয়ের ব্যাপ্তি কত বিশাল।

বাচ্চু ভাই জেনুইনলি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। অনেক মা-পাগল ছিলেন। আলাপের ফাঁকে উনি কখনো না কখনো মায়ের কথা বলতেনই। আমি ওনার গোরস্থানেও গিয়েছি, মানে অনেকবারই গেছি। উনি বলতেন—কবরটা যেন তার মায়ের পাশে হয়। এবং ঠিকই তার মায়ের পাশেই কবরটা হয়েছে। এটা কিন্তু পারিবারিক গোরস্থান না। এখানে তো খালি জায়গা পাওয়া সহজ নয়; মানে স্বয়ং আল্লাহ সাহায্য করে না দিলে এটা হয় না।

‘অ্যাশেজ’ ব্যান্ডের ভোকালিস্ট জুনায়েদ ইভান

 

বাচ্চু ভাইয়ের গান সারা বাংলাদেশের মানুষের মুখস্থ। সো আমরা সবাই উনার গান শুনব, জানব—এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু উনি যেই বয়সে এবং যেই জায়গায় ছিলেন, ওই জায়গা থেকে উনি আমাদের খোঁজখবর রাখা কিংবা আমাদের গানের খোঁজখবর রাখা, সেটা তো বিশাল ব্যাপার। আমি একবার ওনাকে আমার একটা গান শোনাচ্ছিলাম। তো উনি একটুখানি শুনে বলেছিলেন, ‘এটা শুনব না, এটা আমি শুনেছি।’ তারপর আরেকটা গান শোনাচ্ছিলাম, বলেছিলেন ‘এটাও আমি শুনেছি।’ এরপর ওনাকে একটা কনসার্টের ভিডিও দেখাচ্ছিলাম; বললেন, সেটাও দেখেছেন। আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম সে দিন। উনি তখন আমাকে বলেন, ‘এগুলা সব শোনা হয়েছে, সব দেখা হয়েছে।’ তখন আর আমার আর কী বলার বাকি থাকে! এটা আমাদের সাফল্য বা কৃতিত্ব নয়, ব্রং উনার বড় ব্যক্তিত্বের পরিচয়। উনি নতুনদেরকে সব সময় আগলে রাখতেন, জেনুইনলি ভালোবাসতেন এবং মন থেকে কথা বলতেন। 

আমাদের দেশে এই রকস্টারিজম, তারুণ্যের যে জোয়ার, উন্মাদনা—এটা যাদের হাত দিয়ে শুরু হয়েছে, তাদেরকে নিয়ে তো চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি, নাটক, উপন্যাস, বই, গল্প, প্রবন্ধ—অনেক কিছুই হতে পারে। ছবি আঁকা হতে পারে, লেখালেখি হতে পারে। তাদের গানের কাভার হতে পারে। এসব নিয়ে সবার প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, সবসময়।

ডিএ/কেআই

বিজ্ঞাপন